| আলোচনা

জুম’আর খুৎবা: আমাদের নফস বা মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে

ডেস্ক রিপোর্ট:
পঠিত হয়েছে ৩১১ বার। প্রকাশ: ০৪ মে ২০১৮ । আপডেট: ০৪ মে ২০১৮ ।

[বগুড়া কেন্দ্রীয় বড় জামে মসজিদের খতিব হযরত মাওলানা মোঃ আজগর আলী জুম’আর নামাজের আগে বাংলা খুৎবার শুরুতে পবিত্র কোরআনের এক বা একাধিক আয়াত পাঠ করেন। তারপর তার বাংলা অনুবাদ এবং তাফসির বা ব্যাখ্যা মুসল্লীদের সামনে তুলে ধরেন। পরবর্তীতে আরবী খুৎবার প্রথম অংশেও তিনি বাংলায় আলোচিত অংশটুকু আরবীতে শোনান। এরপর জুম’আর নামাজেও তিনি সেই আয়াত পাঠ করেন-এটাই তাঁর বৈশিষ্ট্য। সাধারণত তিনি জুম’আর আজান শেষ হওয়ার পর থেকেই আলোচনা শুরু করেন এবং ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট আলোচনা করেন।
মাওলানা আজগর আলী বড় রংপুর কারামতিয়া মাদ্রাসার প্রধান মুফাসসির হিসেবে কর্মরত। পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ বেতার রংপুর কেন্দ্রের নিয়মিত তাফসিরকারক হিসেবে নিয়োজিত রয়েছেন। ‘পুণ্ড্রকথা’র
 পাঠকদের জন্য তাঁর আলোচনার উল্লেখযোগ্য দিকগুলো নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো। ]
আজকে (৪ঠা মে) জুম’আর নামাজের পূর্বে বাংলা খুৎবা বা আলোচনার শুরুতে মাওলানা আজগর আলী সূরা ইউসুফের ৫৩ নম্বর আয়াত পাঠ করেন। যার অর্থঃ ‘আর আমি আমার নিজেকে নির্দোষ বলছি না। প্রত্যেকের মন মূলতঃ মন্দকর্মপ্রবণ। তবে যাকে আমার প্রভু দয়া করেন তার কথা ভিন্ন। নিশ্চয় আমার প্রতিপালক ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।’
মূলত মানুষের ‘নফ্স’ বা ‘মন’ সম্পর্কে আলোচনার জন্যই মাওলানা আজগর আলী আলোচনার শুরুতে পবিত্র কোরআনের ওই আয়াত পাঠ করেন। আয়াতের তাফসির বা ব্যাখ্যায় যাওয়ার পূর্বে ‘নফস’ বা ‘মন’-এর সংজ্ঞা খোঁজার চেষ্টা করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি ইংরেজ এক দার্শনিকের (নামটা তিনি বলেছেন। কিন্তু রেকর্ডে সেটি স্পষ্ট শুনতে না পারার কারণে উল্লেখ করা হলো না) উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “তার মতে মন হলো-‘সুন্দর চাকর (বিউটি সার্ভেন্ট) অথবা ‘গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক’ (সিরিয়াস মাস্টার)। অর্থাৎ ওই দার্শনিকের মতে মনকে যদি চাকরের মত না রাখা যায় তাহলে সে শিক্ষক হয়ে আমাকেই নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবে।”

মুসলিম মাত্রই আমরা জানি পবিত্র কোরআনে সুরা ইউসুফ-এ ‘জুলেখা’ নামে অপরূপ সুন্দরী এক নারীর বর্ণনা এসেছে। তিনি নবী হযরত ইউসুফকে (আঃ) প্রেম নিবেদন করেছিলেন। কিন্তু হযরত ইউসুফ (আঃ) তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। হযরত ইউসুফ (আঃ) সেটা কিভাবে করতে পেরেছিলেন সেটার ইঙ্গিত ওই সুরার ৫৩ নম্বর আয়াতে রয়েছে। ইউসুফ (আঃ) এক জায়গায় বলছেন, ‘প্রত্যেকের (মানুষ) মন মূলতঃ মন্দকর্মপ্রবণ’। সুরা ইউসুফের ৫৩ নম্বর আয়াতে বর্ণিত এই চারটি শব্দের ব্যাখ্যায় মাওলানা আজগর আলী বলেছেন, মানুষের ‘নফ্স’ বা ‘মন’ তিন প্রকার। একটা হলো ‘নফ্স-এ আম্মারা’, দ্বিতীয়টি ‘নফ্স-এ লাউয়্যামা’এবং তৃতীয়টি হলো ‘নফ্স-এ মুতমাইন্না’। এই তিনটির মধ্যে ‘নফ্স-এ আম্মারা’ আমাদের অর্থাৎ মানুষকে কুপ্রবৃত্তির দিকে টানে। সুরা ইউসুফের ৫৩ নম্বর আয়াতে নফস-এ আম্মারার প্রসঙ্গই এসেছে। [পাঠকদের জন্য অপর দু’টি নফ্স-এর অর্থ যুক্ত করা হলো। (১) নফ্স-এ লাউয়্যামা এমন যা নিজেকে খারাপ কাজের জন্য ধিক্কার দেয়। পবিত্র কোরআনে সূরা আল কিয়ামাহ্-তে এর উল্লেখ রয়েছে। (২) নফস-এ মুতমাইন্নাহ্ হলো সেই মন যা খারাপ কাজ থেকে দূরে রাখার মাধ্যমে প্রশান্ত রাখে। পবিত্র কোরআনের সূরা ফজর-এ এর উল্লেখ রয়েছে।]
আলোচনায় মাওলানা আজগর আলী নারী-পুরুষের উভয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বলেন, নারী এবং পুরুষের উভয়েরই প্রয়োজন রয়েছে। যে কারণে রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে জোড়া জোড়া সৃষ্টি করেছেন। তিনি এ সম্পর্কিত পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতের আরবী উচ্চারণসহ বাংলা অনুবাদ করতে গিয়ে বলেন, আল্লাহ্ বলেছেন, ‘এই পৃথিবীর মানুষগুলোকে আমি জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি। রাতকে তাদের জন্য করেছি ক্লান্তি দূরকারী। রাতে তারা সম্মিলন করবে, ক্লান্তি দূর করবে। দিনের বেলায় তারা জীবিকা অন্বেষণ করবে।’ মাওলানা আজগর আলী বলেন, এই আয়াতের মাধ্যমে আমরা বুঝলাম এখানে নারী-পুরুষকে আলাদা করা হয়নি। বোঝার সুবিধাতে তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা একটি কবিতার লাইনের ‘এ বিশ্বের যা কিছু চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’ উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, নারী এবং পুরুষ অর্ধেক অর্ধেক। দুই অর্ধেকে এক হয়। রাসুলের (সাঃ) নবুয়তী মিশনের পূর্ণতা যেটা এসেছে তার অর্ধেক করেছে পুরুষ, অর্ধেক করেছে নারী। এবং সর্বপ্রথম যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন তিনিও নারী। তিনি হলেন হযরত খাদিজাতুল কুবরা (রাঃ)। ইসলাম গ্রহণেরও আগে ইসলামের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করার জন্য টাকা-পয়সা, অর্থ সম্পদ মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছেন হযরত খাদিজাতুল কুবরা (রাঃ)। শুধু কি তাই! বোখারী শরীফের প্রথম পৃষ্ঠায় দুইটা হাদিসের বর্ণনাকারীও হলেন নারী- হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ)। এসবের মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে ইসলাম নারীকে কত মর্যাদা দিয়েছে। আর সে কারণেই আমরা বলি নারীর উর্বর জমিনটা যদি পূত ও পবিত্র হয়, তাহলে ওই জমিন থেকে আল্লাহ্্র ওলি বের হয়ে আসবে।
আলোচনায় মাওলানা আজগর আলী আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ ‘নফস্’ বা ‘মন’-কে নিয়ন্ত্রণের আহবান জানিয়েছেন। আমরা যেন কুপ্রবৃত্তির গোলাম না হয়ে যাই সেদিকে সতর্ক থাকার অনুরোধ করেছেন। আর এ জন্য আল্লাহর ইবাদত করতে হবে এবং তাঁর সাহায্যও চাইতে হবে।

মন্তব্য