| প্রচ্ছদ

ওসি মোয়াজ্জেমকে ভৎর্সনা করলেন আদালত

পুণ্ড্রকথা ডেস্ক
পঠিত হয়েছে ৪৪ বার। প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০১৯ ।

ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা মামলার রায় ঘোষণার সময় এ ঘটনায় দায়িত্ব পালনে গাফিলতির জন্য ওই উপজেলার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনকে ভৎর্সনা করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ তাকে তিরস্কার করেন। খবর সমকাল অনলাইন 

আদালত বলেন, এ ঘটনায় সোনাগাজীর তৎকালীন ওসির এমন করা উচিত হয়নি। তার গাফিলতি ছিল। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটতে পারে সেজন্য সবাইকে সতর্ক করেন বিচারক।

বৃহস্পতিবার সকালে নুসরাত হত্যা মামলার রায়ে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলাসহ ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে প্রত্যেক আসামির এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। এই টাকা আদায় করে নুসরাতের পরিবারকে দেওয়ার আদেশ দেন বিচারক।

এদিন সকালেই আসামিদের আদালতের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। রায় শোনার পর আসামিরা চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করেন এবং কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

এদিকে রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে নুসরাতের বাবা এ কে এম মুসা বলেন, রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। রায় যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়। তাহলে নুসরাতের আত্মা শান্তি পাবে। একই সঙ্গে তার পরিবারের নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তিনি।

এর আগে সকাল থেকেই আদালত এলাকায় তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়। সকালে ফেনীর পুলিশ সুপার খন্দকার নুরুন্নবী জানান, সবাইকে তল্লাশি করে আদালত প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে। সরকারি গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো যানবাহনকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না আদালত এলাকায়।

সকাল থেকে আদালত চত্বরে ভিড় করে আছেন বিপুল সংখ্যক সংবাদকর্মী। এসেছেন নুসরাতের সহপাঠী, বন্ধু, স্বজনরাও।

গত ২৭ মার্চ নুসরাতকে শ্লীলতাহানি করেন অধ্যক্ষ সিরাজ। এ ঘটনায় নুসরাত মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ জানাতে সোনাগাজী থানায় যান। থানার তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন সে সময় নুসরাতকে আপত্তিকর প্রশ্ন করে বিব্রত করেন এবং তা ভিডিও করে ছড়িয়ে দেন।

নুসরাতের ঘটনায় পরে ওসি মোয়াজ্জেমকে বরখাস্ত করা হয়। একই সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা হলে আদালতের নির্দেশে সেটি তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গত ২৭ মে পিবিআই আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিলে ওই দিনই মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। এরপর গা ঢাকা দেন মোয়াজ্জেম। এক পর্যায়ে ১৬ জুন সকালে তিনি হাইকোর্টে যান। ওইদিন বিকেলে হাইকোর্টের কদম ফোয়ারার কাছে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এদিকে নুসরাতের মায়ের করা মামলায় ২৮ মার্চ আদালতের মাধ্যমে সিরাজকে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিন ও কাউন্সিলর মাকসুদের তত্ত্বাবধানে অধ্যক্ষের পক্ষে মানববন্ধন হয়। একই দিন কাউন্সিলর মামুনের নেতৃত্বে অধ্যক্ষের বিপক্ষেও মানববন্ধন হয়। পরদিন ফেনীর জেলখানায় গিয়ে সিরাজের সঙ্গে দেখা করেন এ মামলার আসামি নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, আবদুল কাদের, জাবেদ, রানা, অধ্যক্ষের স্ত্রীসহ সাতজন।

এরপর ১ এপ্রিল জেলখানায় অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করে শামীম, নূর উদ্দিনসহ পাঁচজন। ওই দিন ডিসি ও এসপির কাছে অধ্যক্ষের পক্ষে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। ৩ এপ্রিল আবার ফেনীর জেলখানায় সিরাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ১৫ জন। ৪ এপ্রিল বিকেলে মাদ্রাসার দক্ষিণ পাশের টিনশেড ভবনের পাশে অধ্যক্ষের পক্ষে প্রথম বৈঠক হয়। সেখানে নূর উদ্দিন, জোবায়েরহ ছয়জন উপস্থিত ছিল। দ্বিতীয় বৈঠক হয় সন্ধ্যা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত। ওই বৈঠকে ২০ সদস্যের মুক্তি পরিষদ গঠন হয়। দ্বিতীয় দফার বৈঠকে উপস্থিত ছিল ১৬ জন।

৪ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত মাদ্রাসার পশ্চিম পাশের তৃতীয় তলার ছাত্র হোস্টেলে তৃতীয় দফায় বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা হয়। সেখানে উপস্থিত ছিল নূর উদ্দিন, শামীম, জোবায়ের, কাদেরসহ ১০ জন। হত্যায় ব্যবহৃত সরঞ্জাম কেনায় অর্থ দেয় কাউন্সিলর মাকসুদ আলম। কেরোসিন কেনে শামীম, বোরকা ও হাতমোজা কিনেছে কামরুন্নাহার মনি। এর আগে উম্মে সুলতানা পপির মাধ্যমে শামীমের কাছ থেকে দুই হাজার টাকা পায় মনি। 

৬ এপ্রিল বান্ধবী নিশাতকে মারধর করা হচ্ছে বলে ছাদে নুসরাতকে ডেকে নিয়ে গায়ে আগুন দেওয়া হয়। একটি গ্রুপ এ কাজে নিয়োজিত ছিল। আরেকটি গ্রুপ মাদ্রাসার সাইক্লোন শেল্টার ও গেট পাহারায় ছিল। ১০ এপ্রিল চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢামেক বার্ন ইউনিটে মারা যান নুসরাত।

গত ২৯ মে ১৬ জনকে আসামি করে নুসরাত হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিল করে পিবিআই। ১০ জুন আদালত মামলাটি আমলে নিলে শুনানি শুরু হয়। ২০ জুন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হয়। এ মামলায় মোট সাক্ষ্য দিয়েছেন ৮৭ জন। নুসরাত হত্যার পর বেরিয়ে আসে এসপি, এডিএম (অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট) ও ওসির বিতর্কিত ভূমিকার কথা। নুসরাতের পরিবারও বলে আসছে, প্রশাসনের লোকজন দায়িত্বশীল আচরণ করলে হয়তো নুসরাতকে ওই পরিণতি বহন করতে হতো না। 

মন্তব্য