| প্রচ্ছদ

৬ বছরে বন্ধ দুইশত পোলট্রি ফার্ম

নওগাঁর রাণীনগরে নানা সংকটে কমছে ব্রয়লার মুরগির খামার

কাজী আনিছুর রহমান,রাণীনগর (নওগাঁ)
পঠিত হয়েছে ৩৬ বার। প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০১৯ ।

নওগাঁর রাণীনগরে পোল্ট্রি শিল্পের উজ্জল সম্ভবনা থাকলেও মুরগি পালন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে খামারীরা। অন্যের দেখে উৎসাহিত হয়ে পোল্ট্রি খামার করে লোকসানের ঘানি টানছেন অনেকেই। রাণীনগর উপজেলার ৮ টি ইউনিয়নে গত ৬ বছরে পারিবারিক ভাবে গড়ে তোলা ফার্ম এবং ছোট ও মাঝারি মিলে প্রায় ২ শতাধিক পোল্ট্রি ফার্ম বন্ধ হয়ে গেছে। এই ফার্মগুলোর মধ্যে অধিকাংশই ছিল ব্রয়লার মুরগির ফার্ম!

উপজেলা প্রাণীসম্পদ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রাণীনগর উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে রেজিষ্ট্রেশকৃত মোট ৩৫ টি মুরগি খামার ছিল। এর মধ্যে পর্যায়ক্রমে ১৮ টি খামার বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। রেজিষ্ট্রেশনহীন ৪৫ টি খামারের মধ্যে ১০টি ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়াও বেকারত্ব ঘোচাতে পারিবারিক ভাবে গড়ে তোলা অনেক খামার পুঁজি সংকটে বন্ধ হয়েছে। প্রাণীসম্পদ দপ্তরের পক্ষ থেকে মুরগি খামারীদের উন্নয়নের লক্ষ্যে যথাসাধ্য সহযোগিতা ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। 
 অভিজ্ঞ খামারীরা বলছেন, অপরিকল্পিত ভাবে খামার নির্মাণ, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞতা, যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব, স্থানীয় প্রাণীসম্পদ দপ্তরের ঝিমিয়ে পড়া ভূমিকা, বড় ও মাঝারি খামারের জন্য প্রশিক্ষিত শ্রমিকের অভাব ও বিশেষ করে বাজারে নামে-বেনামের নিম্মমানের খাদ্যের বেড়া জালে পড়ে কাঙ্খিত উৎপাদন করতে না পেরে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন খামারীরা।

জানা গেছে, রাণীনগর উপজেলায় প্রায় এক যুগ আগে পোল্ট্রি মুরগি পালন শুরু করা হয়। স্থানীয় কিছু উদ্দোমী ব্যক্তি বিভিন্ন বিষয়ে ১ মাস থেকে ৩ মাস মেয়াদী প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজ নিজ এলাকায় ছোট ও মাঝারি ধরণের ব্রয়লার মুরগির ফার্ম গড়ে তুলে

কিন্তু আরো লাভের আশায় যখন ব্যবসার পরিধি বাড়াতে গিয়ে মুরগির পরিমাণ বেশি হওয়ার কারণে চাপের মুখে পড়ে খামারীরা। মানসম্মত বাসস্থান, বায়ু সিকিউরিটি না মানায়, চিকিৎসকের অভাব, খাদ্য প্রদানের সঠিক সময় ও পরিমাণ, ব্রয়লার এর মুত্যু’র পরিমাণ বেশি ও বিভিন্ন পরিচর্চার অভাব সহ নানা কারণে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখিন হয় স্থানীয় খামারীরা।

বর্তমান বাজারে প্রতি পিচ ব্রয়লার মুরগির বাচ্চা ২৮ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। আজ থেকে প্রায় ৫/৭ বছর আগে এই বাচ্চা গুলো প্রতি পিচ প্রায় ৬০ থেকে ৭০ টাকা পিচ বেচা-কেনা হয়েছিল। এই জাতের মুরগির বাচ্চা প্রায় ৪০ দিনের মধ্যে খাওয়ার উপযোগি হয়। এক কেজি ওজনের প্রতিটি ব্রয়লার মুরগি পালনে সব মিলিয়ে প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয় (বাচ্চার দামসহ)।

পাইকারি বাজারে বিক্রি হয় প্রায় ১০০ টাকা পর্যন্ত এবং খুচরা বাজারে বিক্রি হয় ১১০ থেকে ১৩০ টাকায় (অধিকাংশ সময়)। একজন খামারী প্রায় দেড় মাস মুরগি পালন করে এই স্বল্প আয়েও সন্তোষ ছিলেন। কিন্তু ব্রয়লার মুরগির মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার কারণে এক পর্যায় পুঁজি হারিয়ে নতুন করে আর ঘুরে দাঁড়ানো তো দূরের কথা পোল্ট্রি শিল্প থেকে ছটকে পড়ে অন্য পেশা বা ব্যবসার প্রতি মনোযোগ দেন অনেক খামারীরা।

উপজেলার সিম্বা গ্রামের মুরগি খামারী সানোয়ার হোসেন, সোয়েব ইবনে প্রিন্সসহ বেশ কয়েক জন খামারীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এলাকার বহু মানুষ শুধুমাত্র উৎসাহিত হয়েই পোল্ট্র্রি খামার করার কারণে লোকসানের বোঝা কাঁধে পড়েছে! একজন খামারী মুরগি পালনের আগে যদি ভাল প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তাহলে এই শিল্প অবশ্যই সবার জন্যই সম্ভবনাময়। তাছাড়া বর্তমান বাজারে গুনগত মানসম্মত খাদ্য ক্রয় করা বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ! হরেক রকমের খাদ্যের ভিরে মানসম্পূর্ণ খাদ্য বাছাই করতে না পেরে অর্থাৎ শুধুমাত্র অজ্ঞতার কারণেই লোকসানের বোঝা কাঁধে নিয়ে এই ব্যবসা থেকে কয়েক শত ছোট ও মাঝারি খামারীরা ছটকে পড়েছে। তাছাড়া ব্রয়লার মুরগির মৃত্যুর ঝুকি সব সময়ই বেশি থাকে! অতিরিক্ত গরমে ও শীতকালীন সময় এর মৃত্যুর নিয়ন্ত্রণ করা একই বারেই সম্ভব হয় না। আর বিশেষ করে বড় ও মাঝারি খামারে প্রশিক্ষিত দক্ষ শ্রমিকের অভাবে মুরগির পরিচর্চা সঠিক ভাবে করতে না পাড়ায় লোসের ঘানি টানতে হয়। খামারীদের দাবি, এলাকার ঝরে পড়া খামারীদের এবং এই ব্যবসায় আগ্রহীদের পোল্ট্রি পালনের উপর সময় উপযোগি স্থানীয় ভাবে ভাল প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, সরকার পর্যায় থেকে স্বল্প সুদে ঋনের ব্যবস্থা ও খাদ্য ক্রয় সংক্রান্ত বিশেষ সচেতনতা বৃদ্ধি ও বাজার মনিটরিং এর ব্যবস্থা করতে পারলে এবং মুরগির বাজার দর ভাল পেলে এই উপজেলায় নতুন করে ফিরে আসতে পারে পোল্ট্রি শিল্পের উজ্জল সম্ভবনা।

উপজেলার ভান্ডারীয়া গ্রামের মুরগি খামারী সাজ্জাদ হোসেন, ভেটি গ্রামের গোলাম মোস্তফা জানান, প্রায় ৭/৮ বছর আগে ব্রয়লার মুরগি পালন শুরু করি। প্রথম দিকে ভাল বাজার মূল্য থাকায় লাভের মুখ দেখেছিলাম। কিন্তু কয়েক বছর পর থেকে ব্রয়লার মুরগির মৃত্যুর হার বেশি, বাজার দর কম এবং ভাল চিকিৎসক না পাওয়ায় লোকশানের সম্মুখিন হতে হয়। তারপরও ব্যবসা ধরে রাখার এক পর্যায় গত বছর প্রচন্ড গরমে প্রায় দেড় হাজার মুরগি মারা যায়। এতে দিনদিন লোসের পাল্লা ভারি হতে থাকায় শেষ পর্যন্ত ব্যবসা বন্ধ করে দেয়।

রাণীনগর প্রাণীসম্পদ দপ্তরের ভেটেরিনারি সার্জন ডা: মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম বলেন, অধিকাংশ খামারীরা পোল্ট্রি মুরগি পালনের নিয়ম-কানুন না মানার কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। প্রশিক্ষিত ব্যক্তি ও ঝরে পড়া খামারীরা খামারের জন্য সঠিক স্থান নির্ধারণ, মানসম্মত ফার্ম নির্মাণ, বায়ু সিকিউরিটি মেনে এবং স্থানীয় প্রাণীসম্পদ দপ্তরের পরামর্শক্রমে মুরগি পালন করতে পাড়লে লাভবান হবে বলে আশা করছি।

মন্তব্য