| প্রচ্ছদ

বগুড়া অনলাইন রক্তদান সংগঠনের উদ্যোগঃ আড়াই বছর আগে হারিয়ে যাওয়া কিশোর খুঁজে পেল স্বজনদের

অরূপ রতন শীল
পঠিত হয়েছে ৩২৬ বার। প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০১৮ । আপডেট: ০৬ নভেম্বর ২০১৮ ।

আড়াই বছর আগে হারিয়ে যাওয়া ছেলের চিন্তায় একদিনও ঠিকমত ঘুমাতে পারেন নি মা রাবেয়া খাতুন। মানসিকভাবে অসুস্থ ১৭ বছর বয়সী ছেলের সন্ধান পেতে নিজ জেলা রাজশাহীসহ আশ-পাশের জেলাগুলোতে কতই না খোঁজাখুঁজি করেছেন। থানায় জিডিও করেছিলেন। কিন্তু ছেলেকে তিনি ফিরে পাচ্ছিলেন না। অবশেষে একদল যুবক-যুবতীর মহানুভবতা আর ফেসবুকের কল্যাণে হারিয়ে যাওয়া বুকের বুকের সেই ধনকে তিনি খুঁজে পেলেন বগুড়ায়।
রাজীব শুভ নামে সেই কিশোর এখন বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মঙ্গলবার দুপুরে শজিমেক হাসপাতালে অনেকদিন পর ছেলেকে দেখে তিনি তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করেন। মুখে কপালে বার বার চুমু দিতে দিতে রাবেয়া খাতুন বলতে থাকেন, ‘বাবারে তুই এতদিন কই ছিলি রে, তোরে কোথায় না কোথায় খুঁজেছি রে।’ পাশে থাকা রাজীবের বোনও তখন অঝোরে কাঁদছিলেন। ততক্ষণে অন্যান্য রোগীর স্বজনদের চোখগুলোও ভিজে উঠেছে। কিন্তু রাজীব শুভ যেন ভাবলেশহীন। মা বোন এবং সঙ্গে আসা এক মামাকে চিনলেও কোন কথা বলছিল না সে।
বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়া এলাকায় ভাইপাগলা মাজারের পশ্চিমে দিকে ফুটপাতের ধারে বেশ কয়েকদিন ধরে এক যুবক অচেতন হয়ে পড়েছিল। খালি গায়ে লুঙ্গিপড়া যুবকটির মাথার চুল যেমন বড় হয়েছিল তেমনি মুখটাও দাড়ি-গোঁফে ঢেকে গিয়েছিল। তার ডান পায়ের গোড়ালিতে পচন ধরেছিল। সেখানে মাছি আর পোকা যেন বাসা বেঁধেছিল। ৪ নভেম্বর রোববার বিকেলে সাহেব আলী নামে এক ইলেকট্রিশিয়ান তাকে দেখে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘বগুড়া অনলাইন রক্তদান সংগঠন’-এর প্রধান সোহেল রানাকে খবর দেন। সোহেল ওই এলাকায় তাদের সংগঠনের সদস্য শাহনাজ ইসলাম নাজকে সড়কের পাশে এক যুবকের পড়ে থাকার কথা জানিয়ে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তির জন্য অনুরোধ করেন। পরে শাহনাজ ইসলাম নাজ তাদের সংগঠনের অন্য সদস্যদের নিয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে ওই যুবককে উদ্ধার শজিমেক হাসপাতালে ভর্তি করে দেন। রোববার সন্ধ্যায় হাসপাতালের জরুরী বিভাগে তার মাথা নেড়ে করা হয় এবং দাড়ি গোঁফ কেটে গোসল করানো হয়। তবে যুবকটি তখন পর্যন্ত তার নাম ও ঠিকানা বলতে পারছিল না। কিন্তু স্বজনদের খুঁজে পেতে অনলাইন রক্তদান সংগঠনের সদস্যরা ওই যুবকের দাড়ি গোঁফ রাখা অবস্থায় এবং সেগুলো কেটে ফেলার পর তোলা একাধিক ছবি ফেসবুকে শেয়ার করেন। একই সঙ্গে তার চিকিৎসাও চলতে থাকে। তবে পায়ে ইনফেকশন থাকার কারণে তাকে হাসপাতালের ৪র্থ তলায় অর্থোপেডিক বিভাগে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসার পাশাপাশি তাকে নিয়ম করে খাবার সরবরাহ করা হয়।

পরদিন সোমবার রাত ১০টার দিকে যুবকটি নিজের নাম রাজীব শুভ, বাবার নাম ইমাজ উদ্দিন বলে জানায়। বাড়ি রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার অনুপামপুর গ্রামে-এর বেশি কিছু সে আর বলতে পারেনি। সঙ্গে সঙ্গে নাম-পরিচয়সহ তার ছবি আবারও ফেসবুকে শেয়ার করে স্বজনদের বগুড়া শজিমেক হাসপাতালে যোযোগের অনুরোধ জানানো হয়। এর পাশাপাশি বগুড়া অনলাইন রক্তদান সংগঠনের পক্ষ থেকে রাজশাহী ও চারঘাটে অবস্থানরত তাদের সদস্যদেরও বিষয়টি অবহিত করা হয়। মঙ্গলবার সকালে চারঘাট থেকে রাজীব শুভ’র মামা রফিকুল ইসলাম হাারিয়ে যাওয়া ভাগ্নের ছবি ফেসবুকে দেখে তাকে চিনতে পেরে বগুড়ায় অনলাইন রক্তদান সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর তিনি তার বোন এবং ভাগ্নিকে নিয়ে বগুড়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন।রাজীব শুভর মা রাবেয়া খাতুন জানান, তার দুই ছেলে এবং এক মেয়ের মধ্যে রাজীব শুভ মেজ। শিশু কালেই তার মানসিক রোগ ধরা পড়ে। কয়েক বছর আগে তাকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর প্রায় ৩ বছর আগে তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়। তখন চিকিৎসকরা রাজীব শুভকে কিছু ওষুধ নিয়মিত সেবনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু দিনমজুর বাবা ইমাজ উদ্দিন অর্থাভাবে এক সময় ওষুধ কেনা বন্ধ করে দেন। ফলে রাজীব শুভ আবারও অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং ২০১৬ সালের মাঝামাঝি একদিন হারিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে না পেয়ে চারঘাট থানায় একটি জিডিও করা হয় (নং-৪৯৩)।
মা রাবেয়া খাতুন বলেন, ‘রাজীবকে হারানোর পর একদিনও ঘুমাতে পারিনি। শুধু তার চিন্তা হতো। কোথায় আছে কি করছে। তবে বিশ্বাস ছিল সে বেঁচে আছে এবং একদিন তাকে ফিরে পাব।’ হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে অসুস্থ অবস্থায় রাস্তা থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তির পাশাপাশি ফেসবুকে ছবি দিয়ে স্বজনদের খোঁজ করার জন্য তিনি বগুড়া অনলাইন রক্তদান সংগঠনের সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, ‘ওদের জন্যই আমি আমার ছেলেকে ফিরে পেয়েছি। ওদের জন্য আমি প্রাণখুলে দোয়া করছি।’
বগুড়া অনলাইন রক্তদান সংগঠনের প্রধান সোহেল রানা জানান, তারা জরুরী প্রয়োজনে বিনামূল্যে রক্ত দিয়ে থাকেন। এর পাশাপাশি বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। সংঠনের সদস্য শাহনাজ ইসলাম বলেন, ‘খবর পাওয়ার পর পরই আমি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যাই এবং ওই যুবককে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করাই। আমি মনে করি সে তো আমার ভাইও হতে পারতো। রাজীব শুভকে তার স্বজনরা খুঁজে পাওয়ায় আমিসহ আমার সংগঠনের সদস্যরা দারুণ খুশি।’
রাজীব শুভ’র বড় বোন লায়লা খাতুন জানান, তাদের পক্ষে বগুড়ায় থেকে ভাইকে চিকিৎসা করানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা রাজীবকে কালকের (বুধবার) মধ্যে রাজশাহী নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবো। সেখানে মেডিকেলে তাকে ভর্তি করিয়ে চিকিৎসা করাবো।’
শজিমেক হাসপাতালের অর্থপেডিক বিভাগের চিকিৎসক জাহিদুল ইসলাম জানান, রাজীব শুভর পায়ের গোড়ালি কেটে গিয়ে ইনফেকশন হয়ে গিয়েছিল। তবে এখন ক্ষত অনেকটাই ভাল হয়েছে। তবে তাকে আরও কয়েকদিন ড্রেসিং করাতে হবে।
শজিমেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. নির্মলেন্দু চৌধুরী বলেন, ‘রাজীবকে আমরা যথাযথ চিকিৎসা দিচ্ছি। সে অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠেছে।’

মন্তব্য