| সাহিত্য

শিশির কন্যা

অসীম কুমার কৌশিক
পঠিত হয়েছে ৩০৪ বার। প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০১৮ । আপডেট: ০৯ নভেম্বর ২০১৮ ।

মা আমি ছাদে গেলাম। আমার মোবাইল টা কোথায়? কাজু যে আমার ফোনের অপেক্ষায় বসে আছে।এই নে ধর। আর এখনো তো সকাল হয় নি বাবা সমর।গায়ে চাদরটা জড়িয়ে যাস। মায়ের কথা না শোনার ফল এখন অবশ্য কিছুটা টের পাচ্ছি।শিরশিরে হাওয়া বইতে শুরু করেছে।তার সাথে নাকে আসছে সুঘ্রাণ। আমার কাজুর নিজ হাতে লাগানো শিউলি গাছটাতে আজ অনেক ফুল ফুটেছে। কাজল আমার জীবনসঙ্গীনী যাকে আমি ভালোবেসে কাজু বলে ডাকতাম।এই দিনের আশায় অনেক দিন অপেক্ষার প্রহর গুনেছি।যেদিন তোমার শিউলি গাছে ফুল ফুটবে সেদিন আমি শিউলি গাছের নিচে চেয়ারে বসে তোমার সাথে কথা বলবো। আমার মোবাইলে শুধু তোমার নাম্বারটাই রেখেছি,ভালোবাসার কাজু নামে। অনেক বকবক করলাম এবার তোমাকে ফোন দেই, নইলে আবার তুমি অভিমান করবে।

হ্যালো কাজু,কেমন আছো তুমি? আমি ভালো আছি অনেক ভালো। জানো তোমার হাতের শিউলি গাছে কত ফুল ফুটেছে।যার সুবাস পাওয়া মাত্র আমি ছাদে এসেছি তোমার শিউলি গাছের নিচে।মা তো আমায় বকা দিলো এখনো সকাল হয় নি আর আমি ছাদে এসেছি বলে।কে, কে কে ওখানে।ও... মা তুমি কখন এসেছো? আর পিছনে দাঁড়িয়েছিলে কেনো? দেখছো না মা আমি এখন আমার কাজুর সাথে কথা বলছি।চাদরটা রেখে এসেছিস বাইরে ঠান্ডা তাই দিতে এলাম। বলে হুহু করে কেঁদে উঠে চলে গেলো মা।হ্যা কাজু বলো মা এসেছিলো চাদর দিতে তাই কেটে দিয়েছিলাম।জানো আমি যখনই ছাদে এসে শিউলি গাছের নিচে বসে তোমার সাথে কথা বলি,মা তখনই আমার পেছন পেছন এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।

জানো মা ভাবে আমার মাথা নষ্ট হয়ে গেছে, আমি পাগল হয়ে গেছি।মা ভাবে আমি এসবের কিছুই টের পাই না।কাজু জানো আর কিছুদিন পর দুর্গাপূজা। তোমার মনে আছে প্রত্যেকবার পূজোয় আমরা আমাদের গ্রামে যেতাম। কত মজাই না হতো, আমার সব মনে আছে।কতদিন হলো আমারা আর একসাথে যাই না। ছোটবেলার কথা কি তোমার এখনো মনে পড়ে! আমি এখনো চোখ বন্ধ করলে সব স্পষ্ট দেখতে পাই। আজ থেকে প্রায় ত্রিশ বছর আগে। আমি আর কাজু তখন ক্লাস ফোর এ পড়ি।একদিন বাংলা ক্লাসের এর সময় স্যার আমায় জিজ্ঞেস করলেন সমর বলতো এখন কোন ঋতু? আমি তো বারবার শুধু এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলাম। উত্তরটা পেটে আসছে কিন্তু মুখে আসছে না।তারপর কাজুর দিকে তাকিয়ে দেখি ও ব্যাগের ভেতর থেকে কাশফুল বের করেছে। আমায় কিছু বলার চেষ্টা করছে কিন্তু আমি শুনতে পাচ্ছি না।তবে বুঝতে পেরেছিলাম কাজু কী বলছে।সঙ্গে সঙ্গে আমি বলে উঠলাম স্যার শরতকাল। এতো জোরে বলেছিলাম যে ক্লাসের সবাই হেসে উঠাছিল।কাজুটা এরকমই আমি যখনই বিপদে পড়ি তখন সেই আমার একমাত্র ভরসা।

আমাদের গ্রামটা নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।নদীর ধার এসময় কাশফুলে ভরে যায়।আমাদের গ্রামের নাম কাশপাড়া। শুনে অনেকেই চমকে উঠে তবে কাশফুলের জন্য বিখ্যাত বলেই এই নাম।সেদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে আমি কাজুকে জিজ্ঞেস করি, আচ্ছা কাজু তুই কাশফুল ব্যাগে নিয়ে ঘুরিস কেনো?কাজু হেসে বলে,আরে বোকা এটা তো তুই কাল আমার মাথায় চুলের মধ্যে আটকে দিয়ে বলেছিলি আমায় নাকি রাক্ষসী রানির মতো লাগছে।তাইতো রেখে দিয়েছিলাম। 

আমি তখন কাজুর গাল টেনে যেইনা দৌড়ে পালিয়েছি।অমনি কাজু আমার পেছন পেছন দৌড়েছিলো ঠিকই কিন্তু ও জানে যে আমার সাথে দৌড়ে কোনো লাভ নেই।বাড়ি এসে খেয়ে একটু পর ভয়ে ভয়ে বের হলাম।কাজুদের বাড়ি এসে দেখি কাজু নেই।ওর ঠাকুমাকে জিজ্ঞেস করলাম কাজু কোথায় গো ঠাকুমা।কি হইছে রে সমু? মহারাণী তো স্কুল থেকে এসে না খেয়ে সুয়ে ছিলো। এখনই বেড়িয়ে গেলো।কত করে কইলাম ও কাজল খেয়ে যা মা।কিছুই তো খাস নি সকালের পর থেকে।কিন্তু কে শোনে কার কথা জোরে দরজাটা লাগিয়ে চলে গেলো। ঠাকুমা আমায় ভালোবেসে সমু বলে ডাকতো।কাজুর বাবা মা অনেক আগেই চলে গেছে সকল মায়া ত্যাগ করে।আমি পকেটে করে কাজুর জন্য দুটো সন্দেশ নিয়ে এসেছি।জানি ও ঠিক আমার উপর রাগ করে কিছু খাবে না।কিন্তু এখন কাজুকে পাই কোথায়! ঠাকুমা আমি আসছি দরজাটা লাগিয়ে দাও।ও সমু থাম কোথায় যাচ্ছিস? ও সমু, এই ছেলেটাও হয়েছে আর পারিনা বাপু।কবে যে মেয়েটা বড় হবে তারপর ওদের চার হাত এক করে দিতে পারলে মরেও শান্তি পেতাম।সমুর বাপেতো কথা দিছিলো কাজলের মায়েরে। 

কাজল আমার জম্মের আগেই বাপেরে হারায়ছে আর জম্মের পর মায়েরে হারাইলো।মেয়াটার কপালে একটু সুখ দিয়ো ঠাকুর একটু সুখ দিয়ো।সেই দিন যেন দেখে যেতে পারি। কাজু, এই কাজু কথা বলছিস না কেনো? আমি জানতাম তুই এই নদীর ধারেই বসে থাকবি।তাইতো দৌড়ে ছুটে এলাম। দেখ তোর জন্য কি এনেছি?কাজু,এই কাজু কথা বল। এই আমি কান ধরছি দেখ। আমি তো তোকে রাগানোর জন্যই এরকম করছি।মাথা তুলে দেখ একবার আমি কান ধরে দাঁড়িয়ে আছি।আস্তে আস্তে মাথা তোলে কাজু। কাজু তুই কান্না করছিস?আমি হাত দিয়ে কাজুর দু চোখ মুছে দিয়ে অনেকগুলো কাশফুল দেই ওর হাতে।আর ওর মাথায় শিং বানিয়ে দেই দুটো কাশফুল দিয়ে। এবার কাজু হেসেছে। কাজু তুই এখনো কিছু খাস নি কেনো আমার উপর রাগ করে।দেখ তোর জন্য আমি সন্দেশ এনেছি।খাইয়ে দে নইলে খাবো না। এমনই কাজু,সন্দেশ দুটো যে ওকে খাওয়াতে পারবো না এটা জানতাম। আমাকেও একটা খেতে হলো।

কাজু আমায় খাইয়ে দেওয়ার সময় ওর আঙুলে আমি যেইনা কামড় দেই অমনি কাজু আবার আমার পেছনে ছুটতে থাকে। সমর এবার দুর্গা পূজায় তুই কি সাজবি? আমি তোকে এবার কাজুর মতো সাজিয়ে দেবো আর আমি সমর সাজবো বলে সে কি হাসি কাজুর।সবার বাড়িতে পূজোর ধুম পরে গেছে। বাড়িঘর ধোয়া -মোছার কাজে সবাই ব্যস্ত।অনেক কুটুম আসে এসময় সবার বাড়িতে তাই এতো আয়োজন।বাড়ি- বাড়ি বিভিন্ন রকমের নাড়ু, মোয়া আরো কত কি বানানোর কাজ শুরু হয়েছে।এজন্য কাজুটাও ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।আমি একা একা নদীর ধারে বসে আছি।আজ যদি কাজু না আসে আর কথাই বলবো না কাজুর সাথে।আমি হাতে কাশফুল নিয়ে হাটুতে মাথা রেখে মাটির দিকে তাকিয়ে আছি। কিছুক্ষণ পর আমার পিঠে কাশফুলের ছোঁয়া পেলাম।তবুও আমি মাথা তুললাম না।আমি জানি এটা কাজু।আমায় অনেকক্ষণ ডাকার পর কাজু যেইনা চলে যাবে।অমনি অর হাত ধরে ফেললাম, আমার যত অভিযোগ ছিলো সব শুনালাম। দেখি কাজু আমার জন্য নারিকেলের নারু নিয়ে এসেছে।আমরা দুজন বসে সেগুলো খেলাম। দুর্গা পূজোয় সত্যি সত্যি আমি শাড়ি পরে, মাথায় টিপ দিয়ে কাজু সাজলাম। 

আর কাজু প্যান্ট শার্ট পরে সমর সাজলো। আমাদের অভিনয় দেখে সকলের সেকি হাসি।আমি তো লজ্জায় সেখান থেকে দৌড়ে বাড়ি চলে এসেছিলাম।দেখতে দেখতে পূজো শেষ হয়ে গেলো। তারপর অনেকটা বছর কেটে গেলো। আমরা সবাই শহরে চলে আসি।আমার আর কাজুর বিয়ে হলো। কিন্তু কাজুর ঠাকুমা আমাদের বিয়ে দেখে যেতে পারে নি।আমার বাবাও আমাদের বিয়ের কয়েকমাস পরেই মারা যায়। এভাবেই কাটতে থাকে আমার আর কাজুর সংসার।মা কাজুকে খুব ভালোবাসে। নিজের মেয়ের মতো।প্রতিদিন বিকেলবেলায় কাজুকে সামনে বসিয়ে মাথার চুল বেধে দিতো।কখনো কখনো চুলে বেণি বানিয়ে দিতো। বেণিতে কাজুকে খুব মানাতো।কি সহজ সরল মুখখানা,আমি তাকিয়ে থাকতাম।অমনি কাজু দু হাত দিয়ে আমার চোখ চেপে ধরে কানে কানে ফিসফিস করে বলতো কত ভালোবাসো আমায়!আমি কোনো উত্তর দিতাম না। 

অভিমানী কাজু তখন মাথা নিচু করে বসে থাকতো।তখন আমি কাজুর কোলে মাথা রেখে বলতাম,কাজু আমি তোমায় কতটা ভালোবাসি এর উত্তরটা আমার অজানা কেননা আমার ভালোবাসার যে কখনো শেষ হবে না। কাজু দেখো আমি আমার কথা রেখেছি। শুনতে পাচ্ছো কি তুমি।আজও আমি তোমাকে সেদিনের মতোই ভালোবাসি হইতো সেদিনের চেয়ে বেশিই ভালোবাসি।তুমি আমায় ছেড়ে গেলে কিন্তু তোমার ভালোবাসাকে আমি যেতে দেইনি। বিজয়া দশমীতে তোমায় বিসর্জন দিয়েছি।সেদিন হাসপাতালে প্রসব বেদনায় যখন তুমি ছটফট করছিলে তখন আমার হৃদয়ে কে যেনো আঘাত করছিলো।সে আঘাত আজও শেষ হয় নি। আমার সন্তানকে আমার সাথে পরিচয় করে দেবার আগেই তোমরা দুজন আমায় ছেড়ে পালিয়ে গেলে।এই শরৎ, এই পূজো এসব আজ আমি তোমার শিউলি গাছের তলায় বসে কাটায়।প্রত্যেক দশমীতে তোমার গাছের শিউলি ফুল দিয়ে আমি দুটো মালা গেথে আমার শূন্য দুটি বালিসের কাছে রেখে দিই। মা আমায় পাগল ভাবে।কিন্তু আমার শূন্য বালিসে শিউলি ফুল যে তোমাদের ফিরিয়ে আনে নতুন করে নতুন রুপে।ভালো থেকো। মোবাইলটার চার্জ দিতে হবে।

মন্তব্য