| প্রচ্ছদ

বড় মসজিদের খুৎবা: শুধু ক্ষুধা সর্বস্ব রোযা রাখলে হবে না, পরিশুদ্ধতা অর্জনের চেষ্টা করতে হবে

আমিনুর রহমান
পঠিত হয়েছে ২৯৬ বার। প্রকাশ: ১২ মে ২০১৮ । আপডেট: ১২ মে ২০১৮ ।

১১ মে, ২৪ শাবান, ২৮ বৈশাখ শুক্রবার বগুড়া কেন্দ্রীয় বড় মসজিরে খতিব মাওলানা  মোঃ আজগর আলী বাংলা খুৎবায় পবিত্র কুরআনের দ্বিতীয় সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াত পাঠ করেন। উচ্চারণ: শাহরু রামাদ্বা-নাল লাযী উনযিলা ফীহিল কুরআ-নু হুদাল ল্লিনা-সি ওয়া বইয়্যিনা-তিম মিনাল হুদা- ওয়াল ফুরক্বান, ফামান শাহিদা মিনকুমুশ শাহ্রা ফালইয়াম্বুমহু; ওয়া মান কা-না মারীদ্বান আও আলা-সাফারিন ফা’ইদ্দাতুম মিন আইয়্যা-মিন উখার; ইয়ুরীদুল্লা-হু বিকুমুল ইয়ুসরা ওয়ালা-ইয়ুরীদু বিকুমুল উসর, ওয়া লিতুকমিলুল ‘ইদ্দাতা ওয়া লিতুকাব্বিরুললা-হা ‘আলা-মা-হাদা-কুম ওয়া লা’ আল্লাকুম তাশকুরূন।’
অর্থ: তোমাদের জন্য রোজা রাখাই উত্তম। যদি তোমরা উপলব্ধি করতে, রমযান মাস হল সে মাস যাতে কুরআন মজীদ অবতীর্ণ করা হয়েছে, যা মানবজাতির জন্য পথ প্রদর্শক এবং হেদায়েতের সুস্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী। তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস পাবে সে যেন অবশ্যই এর রোযা রাখে। আর কেউ অসুস্থ হলে, অথবা, সফর অবস্থায় থাকলে সে তা অন্য দিনগুলোতে পূর্ণ করবে, আল্লাহ্্ তোমাদের ব্যাপারে সহজটাই চান এবং তোমাদের জন্য যা কষ্টকর তিনি তা চান না। এজন্য যে, তোমরা সংখ্যা পূর্ণ করবে আর তোমাদেরকে সৎপথ প্রদর্শন করার কারণে তোমরা তাঁর (আল্লাহ্্র) শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করবে এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।’
মূলত রযমান মাসকে সামনে রেখেই তিনি এই আয়াতটিকে বেছে নেন। রমযানে আমাদের করণীয়গুলোই তুলে ধরেন। এই আয়াতের মাধ্যমেই রমযানের রোজা ফরজ হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, আল্লাহ্্ রমযানের রোযা বালেগ, মোমিন, মোমিনা এবং মোত্তাকীদের জন্য ফরজ করেছেন। রমযান মাসে আল্লাহ্্ রাব্বুল আলামীন কুরআনুল কারীম নাজিল করেছেন। রমযান অনেক সম্মানের ও রহমতের। পবিত্র কুরআনের জন্যই এই মাসের এত ইজ্জত। রমযান মাসে কেউ যদি দুই রাকাত নফল নামায পড়ে তাহলে সত্তর রাকাত নফল নামাজের সাওয়াব পাওয়া যায়। রমযান মাসে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়লে দুই রাকাত ফরজের সাওয়াব পাওয়া যায়। রমযান মাসে দুই রাকাত ফরজ পড়লে সত্তর রাকাত ফরজের সাওয়াব পাওয়া যায়। রমযান মাসে কোন রোযাদার যদি কোন আমলও না করে কিন্তু যদি গুনাহ্্ মুক্ত থাকে; তার পরেও তার শ্বাস-প্রশ্বাসে নেকি আল্লাহ্ তার আমল নামায় লিখবেন।
রমযান মাসের রোযা কেউ যদি কাযা করে এবং পরে যদি সে তা আদায় করে তাহলে কাযা আদায় হবে কিন্তু রমযান মাসের যে সাওয়াব, যে উপহার যে হাদিয়া এটার মর্যাদার সমপরিমাণ করতে কেয়ামত পর্যন্ত সে যদি রোযা থাকে সেই একটা রমযানের রোযার সমপরিমাণ রোযা হবে না।
মাওলানা আলী আজগর বলেন, রমজান মাস আমাদের পরীক্ষার জন্য, প্রস্তুতি গ্রহণ করার জন্য। আন্তর্জাতিক পরিম-লকে পরিশুদ্ধ করার জন্য আল্লাহ্্ আমাদেরকে রমযান দান করেছেন। শুধু মুসলমানদের ব্যক্তি জীবন নয়। ব্যক্তি জীবনের পরিশুদ্ধতার নূর বা আলোর মহিমার বিকশিত রূপ বা আভা মুসলমান যেখানে যাবে সেখানেই পৌঁছে যাবে। আল্লাহ্্ রাব্বুল আলামীন রমযান মাস মোমিন মোত্তাকিদের জন্য দিয়েছেন। রোযা রাখবেন তো মোমিন মোত্তাকিনেরা। সেই মোমিন মোত্তাকিনদের জন্য আল্লাহ্্ পাক কুরআনুল কারীম নাযিল করেছেন। কুরআনুল কারীম হওয়ার কথা শুধু মোমিন মোত্তাকিনদের জন্য। কিন্তু আল্লাহ্্ পাক মুসলমানদের এই কুরআনকে মুসলমানদের এই জীবন ব্যবস্থাকে মুসলমানদের এই বিধিবিধানকে গোটা বিশ্ববাসীর জন্য করে দিয়েছেন। ‘হুদাললিল নাস’- সমস্ত মানুষের হেদায়েতের জন্য সঠিক পথের দিশা দেওয়ার জন্য আল্লাহ্্ পাক কুরআনুল কারীম নাযিল করেছেন।
তিনি মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘এখন আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, হুজুর মুসলমানদেরই তো হেদায়েত নাই। ওরাই তো পথ পাইতেছে না। আবার অমুসলিমরা কি পাবে?’ তাহলে শুনুন, আল্লাহ্্ রাব্বুল আলামীন মানুষের সত্য বিবেককে জাগ্রত করে দিয়েছেন। সৃষ্টিগতভাবে আল্লাহ্্ রাব্বুল আলামীন মানুষের একটা সত্য বিবেক দিয়েছেন। এই সত্য বিবেক দিয়ে সত্য সন্ধান করতে করতে একদিন না একদিন সত্য তার কাছে ধরা পড়ে। সত্য গ্রহণ করে। আজও এই পৃথিবীতে মুসলমান কুরআনুল কারীম গ্রহণ নাও করতে পারে। এই মুসলমান হেদায়েত গ্রহণ করতে নাও পারে। কিন্তু আজকের ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ রক্তাক্ত, হানাহানি-কাটাকাটির এই পৃথিবীতে এখনও অমুসলিম ভাইয়েরা দলে দলে মুসলিম হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে মাওলানা আজগর আলী এপ্রিল মাসের শেষ দিকে (২৭ অথবা ২৯ তারিখ) রংপুরে তার কাছে এক হিন্দু ভাইয়ের ইসলাম গ্রহণের উদাহরণ তুলে ধরেন। ওই ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, পবিত্র কুরআন থেকে ঈমানের মাহাত্ম সম্পর্কে ৫/৭ মিনিট আলোচনা করেছিলাম। আমি সেদিন আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম। মসজিদ ভর্তি মুসল্লী। আমি দেখলাম যে আমার মুসলমান ভাইদের চাইতে এই অমুসলিম ভাইটার (কলেমা যেহেতু পরাই নাই মসজিদে ওজু গোসল করে চলে এসেছে) চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। তার মানে ইসলামের নূর অলরেডি তার মধ্যে ঢুকে গেছে। চোখ দিয়ে পানি আসছে তার। মুসলমানদের চাইতে অমুসলিমরা যখন ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়, তাদের ভেতরে যখন ইসলামের আসল আলোটা ঢোকে, তখন তার মাঝে উপলদ্ধি শুরু হয়। আমরা তো ইসলাম পাইতে পাইতে ভেতরটা ভোতা হয়ে গেছে। গুনাহ্্ করতে করতে অভ্যাস হয়ে গেছে! ইসলামও চলবে এটাও চলবে! অথচ বিশ্ব নবী (সাঃ) বলেছেন, এই যে অমুসলিম জীবন ভর শেরেকি করেছে, কুফুরি করেছে, হালাল-হারাম বোঝে নাই। ভেতরটা গোনাহতে ভর্তি। এই গোনাহ্্ ভর্তি অন্তরটা দিয়ে একটা বার যদি মুসলমানদের হাতে হাত রেখে তার জবান দিয়ে অন্তর দিয়ে সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যায়, যদি বলতে পরে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ্্ (সাঃ)’, তাহলে আল্লাহ্্ রাব্বুল আলামীন তার গোটা জিন্দেগির সমস্ত গুনাহ্্গুলো মাফ করে দিবেন। আমরা তো আধ্মাতিক এই আলো- সব গুনাহ্্ দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছি। আমরা ঘুমাইলে দুনিয়া আসে, চিন্তা করলে দুনিয়া আসে। খেয়াল করলে গুনাহ্্ আসে। অথচ মুসলমানদের এমন হওয়ার কথা ছিল না। মুসলমান যদি চোখ বন্ধ করে, ঘুমায় তাহলে তার আধ্মাতিক জগতে তার খেলা করার কথা। সেই জগৎ আমাদের কোথায় গেল? সেই উপলব্ধি আমাদের কোথায় গেল? সেই ঈমান, সেই মারেফত আমাদের কোথায়? মুসলমান তার ঈমানী জজবা দিয়ে ঐক্যদ্ধ হয়ে যদি একবার আল্লাহু আকবার বলে, তাহলে গোটা পৃথিবীর সমস্ত কুফুরী শক্তির কলিজা চৌচির হয়ে যাবে। সেই ঈমান তৈরি করার জন্য আল্লাহ্্ রাব্বুল আলামীন পুরো একটি রমযান মাস মোমিন মোত্তাকিনদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে। সেটা কি দিয়ে তৈরি হবে! শুধু পেট-ক্ষুধা সর্বস্ব রোযা রাখলেই কি আমাদের ঈমান পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে? আমরা সুন্দর হয়ে যাব? মারেফতের ওই রাস্তাটা তৈরি হয়ে যাবে? চোখ বন্ধ করলেই, ইবাদত-বন্দেগি করলেই আমাদের ভাল লাগবে-মজা লাগবে? এটা কেমনে-আমাদের খেয়াল খুশির অনুপাতে নাকি?
আল্লাহ্্ পাক রমযান মাসকে শুধুমাত্র কুরআন শরীফ তেলাওয়াত সর্বস্ব  করেননি। বরং কুরআনকে আল্লাহ্্ করেছেন সত্য-মিত্যার পার্থক্যকারী। আলো-আঁধারের পার্থক্যকারী। নেককাজ-মন্দকাজের পার্থক্যকারী। আমার রোযা দিয়ে আমার কুরআন শরীফ দিয়ে আমার মুসলমানী দিয়ে আমার ইবাদত বন্দেগী দিয়ে যদি সত্য-মিত্যার পার্থক্য না হয়, হক-বাতিলের পার্থক্য না হয়, খারাপ এবং ভালোর পার্থক্য না হয় এবং সত্য গ্রহণ ও মিথ্যা বর্জন যদি না হয়, তাহলে আমার এই রোযা আমার এই নামাজ এই কুরআন তেলাওয়াতের অ্যাকশন হবে না। আমরা প্রতিবছর রোযা পাই। কিন্তু তাতে আমাদের কি পরিবর্তন আসছে?
তিনি মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে অনুরোধ করেন, যারা মসজিদে এসেছেন তারাসহ প্রত্যেক বাড়িতে যারা কুরআন শরীফ পড়া জানি না, কিন্তু এই রমযান আসছে আমি কুরআন শরীফ পড়া শিখতেছি এবং শিখবো-এই দৃঢ় প্রত্যয়ী আমি হবো যেন আল্লাহ্্ পাক যেন এই রমযানকে আমার জীবনে যথার্থভাবে কাজে লাগান। আমি কুরআন শরীফ পড়াই শিখবো এই হোক এই রমযানে আমার লক্ষ্য। আল্লাহ্্ আমাদের সবাইকে কবুল করুন।

মন্তব্য