| সাহিত্য

ভৌতিক গল্পঃ অ-মানবী [প্রথম পর্ব]

সাজিয়া আফরিন সোমা
পঠিত হয়েছে ১৭২ বার

পুরা আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে আছে, চারদিক অন্ধকার নেমে এসেছে, ঝড়ো বাতাস শুরু হয়ে গেছে। রুমা বেলকুনিতে দাঁড়িয়ে দেখছে,বাতাসে শাড়ির আঁচল উড়ছে। কি যে ভাল লাগছে রুমার! নতুন পরিবেশে এসে একা একা এভাবেই রুমা সময় পার করে। কদিন হলো মাত্র আসা,এখনও তেমন কাউকে চেনেনা জানেনা। 

বাতাসে একটু একটু করে মেঘগুলো সরে যেতে শুরু করেছে। সে এক অন্যরকম সৌন্দর্য। এরকম এক অজানা ঝড়ো হাওয়া এসে সবার মনের মেঘগুলো যদি সরিয়ে দিতো, সবকিছু নতুনের মতো চক চক করতো, নতুনত্বের ছোঁয়ায় সবকিছু আন্দোলিত হতো- মনে মনে ভাবে রুমা। 

পেছন থেকে পল্লবের ডাকে ঘোর কাটে রুমার। 

পল্লবঃ তুমি যে কেনো ঝড়ের সময় বাইরে দাঁড়িয়ে থাকো বুঝিনা,বাতাসে সব ধূলা ভিতরে এসে গেলো। 

রুমাঃঝড় দেখতে আমার ভাল লাগে পল্লবঃ দেখো। 

পল্লব একটু রেগেই বললো কথাটা। কারো কারো ভাল লাগাটা একটু আলাদা সবার থেকে, রুমারও তাই। আর কিছু ভাল লাগে না তেমন। প্রকৃতি তাকে টানে খুব বেশী। ছোট বেলায় খুব একটা ছোটাছুটি করতো না। সবার সাথে থেকেও হারিয়ে যেতো প্রকৃতির সাথে।

 পল্লবঃ কি দেখা হলো তোমার? ঝড়তো অনেক আগেই শেষ হয়েছে।

রুমাঃ কিছু বলবে? পল্লবঃ বেরুচ্ছি,ফিরতে রাত হবে। 

রুমা দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে এলো, সিড়ি অনেকটা পুরোনো দিনের মতো,আলোটাও কম ঢোকে। বিরাট বাড়িতে ওরা শুধু দুজন। একদিকে থাকলে অন্যদিকটা নীরবতায় ডুবে যায়। রুমা বার বার বলেছিলো এমন বাড়িতে উঠবেনা,একা একা পুরানো বাড়িতে ভাল লাগবে না। কিন্তু পল্লব সেটা গা করেনি। ওর ভাল লেগেছে,আর কারো না লাগলেও হবে। 

সন্ধ্যায় বাড়ির নীরবতা যেনো আরও বেড়ে যায়,দূর থেকে শিয়ালের ডাক ভেসে আসে,অদ্ভূত সব পাখিরা ডেকে যায় বারবার। পাশেই নাকি শ্মশান আর নদী! নতুন এসেছে বলে এখনও দেখা হয়নি শহরটা। জানালার পাশেই বড় পুরোনো দুই গাছ ছিলো,আসবার পর রুমা দেখেছিলো। এবার শশুড় বাড়ি থেকে ঘুরে এসে সেই গাছটা আর চোখে পরেনি,কেটে ফেলে সেখানে বাড়ির কাজ শুরু হয়েছে। বাড়িতে ওরা শুধুই দুজন, আর দুজন মানুষের অল্পকটাই কাজ। তাই সেটা সেরেই রুমা জানালা দিয়ে এদিক ওদিক দেখতে বসে। 

এদিক ওদিক দেখেই সময়টা কাটায়। বেলকুনি থেকে আশপাশের বাড়ির ছাদ আর আকাশ ছাড়া তেমন কিছু চোখে পরেনা তাই জানালা দিয়েই বেশী দেখে রুমা।  বেল বেজেই যাচ্ছে,রুমা পরি মরি করে নিচে ছুটছে, আজ নিচে আবার আলো নেই। নিচতলায় যারা থাকে তাদের সাথে দেখা হয়নি এখনও,তবে তারা আজ বাড়িতে নেইও। তাই বলতেও পারছেনা আলো দেবার কথা। দোতলা থেকে যে আলো আঁধারের খেলা তাতেই চলতে হচ্ছে। এতে আরও গুমোট ভাবটা বেড়ে গেছে। 

পল্লবঃ কতবার বেল দিচ্ছি,সবাই দেখছে আমি দাঁড়িয়ে আছি এতোক্ষন! 

রুমাঃ আসছিলাম তো। 

পল্লবঃ সিঁড়িতে উঠতে উঠতে জিজ্ঞেস করলো- খেয়েছো? আমি কিন্তু খেয়ে এসেছি। 

রুমাঃ তুমি তো জানাও নি, তাই এখনও খাইনি। সিড়িতে উঠতে উঠতেই রুমা বললো। 

পল্লব ঘরে চলে যায়,রুমা খাবার গুলো সব ফ্রিজে তুলে রাখে,খেতে ইচ্ছে করছেনা তার। কেমন যেনো অচেনা সম্পর্ক তাদের,শান্ত,গম্ভীর,আর দূরত্ব যে কত শত মাইল! ডাইনিং এর লাইট নিভিয়ে ঘরে যাবে তখনই বন্ধ জানালায় চোখ পরে যায়,কাঁচে বড় একটা ছায়া। বাইরে আবছা আলোয় কালো ছায়াটা পরিষ্কার,একটু তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করে রুমা,কারণ জানালার নিচেই আর একটা বাড়ির টিনের চালা,চোর কিনা সেটা দেখার চেষ্টা। না মনে হয় বড় গাছটার ছায়া! ঘরে চলে আসে রুমা। 

বিছানায় শুতে শুতে মনে পরে- আরে! গাছটা তো কদিন হয় কেটে ফেলেছে,তাহলে ছায়াটা কি চোরের? তাহলে তো সারারাত আজ সজাক থাকতে হবে। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পরে রুমা। ঘুম ভাঙ্গে বুয়ার বেলে। দরজা খুলে উপরে এসে জানালা গুলো খুলতে থাকে। ঠিক ঐ জানালায় এসে চোখ আটকিয়ে যায়,কিসের ছায়া ওটা ছিলো? পল্লবের আজ অফিস নেই, বাড়িতে থাকবে হয়ত সে। বলতে হবে কথাটা। 

নাস্তার টেবিলে রুমা বলে- পাখিগুলোর খারার শেষের দিকে, আজ কি আনবে? মাছের ভিটামিন আজ শেষ হবে,ওটাও আনতে হবে। 

পল্লবঃ আজ পারবো না,বাইরে কাজ আছে। আর ওগুলো যে কেনো রাখো ,শুধু শুধু ঝামেলা।

 রুমাঃ ওদের সাথেই তো আমার দিন কাটে,কি আর এমন ঝামেলা করে ওরা বলো?

পল্লব উঠে বেরিয়ে যায়। রুমা ঘর গোছাতে গোছাতে কার যেনো কথা শুনতে পাচ্ছে,মনে হচ্ছে দরজার পাশেই কারা যেনো ফিস ফিস করে কথা বলছে। রুমা দরজার কাছে এগিয়ে যেতে থাকে ফিস ফিস কথা ততোটায় দূরে সরে যেতে থাকে, এক সময় তা হারিয়ে যায়। রুমা খুবই বিরক্তবোধ করে, মনে মনে ভাবে কি হচ্ছে এসব? 

রাতে টেবিলে খাবার রেডি করছিলে রুমা,ঠিক ওর পায়ের কাছে এসে পরলো পাতিল রাখার স্ট্যান্ড! চমকে উঠে রুমা,এতো ভারী কোন কিছু এভাবে ছিটকে পরার তো কথা না,তাও আবার রান্না ঘর থেকে! রান্না ঘরের প্লেট রাখার কেসে ঝুলানো ছিলো সেটা। এতো দূর থেকে ছিটকে পরে কি ভাবে! রান্না ঘরের জানালাও বন্ধ, কারন পাশের ছাদ দিয়ে বিড়াল ঢোকে বলে। এসব ভাবছিলো আনমনে ঠিক তখনই রান্না ঘরের সেল্ফে রাখা কয়েকটা বক্স পরে যায়। এবার গা ছম ছম করে উঠে ওর। বাতাস নেই,রান্নাঘরে কেউ নেই,অকারণ গোছানো জিনিস পত্র পরে যাবে? আজ রাতেই পল্লবকে বলতে হবে এসব। 

রাতে কাজগুলো শেষ করে রুমা ঘরে যাওয়ার আগেই পল্লব ঘুমিয়ে পরে, তাই আর বলা হয়না কিছুই। মাঝ রাতে রুমের দরজায় ভীষন জোরে ধাক্কা দেওয়ার শব্দে দুজনেরই ঘুম ভেঙ্গে যায়। দুজনই লাফিয়ে উঠে বসে, এতো রাতে রুমের দরজায় ধাক্কা কি করে সম্ভব? সব দরজা বন্ধ, বাড়িতে আর কেউ নেই তাহলে? পল্লব কে? কে? দরজায় বলে দুইবার চিৎকার করে কিন্তু কোন উত্তর পেলো না। আর কোন শব্দ নেই দেখে পল্লব ধীরে ধীরে দরজার কাছে যায়। দরজাটা ধীরে ধীরে খোলে। না কেউ নেই। এবার বেরিয়ে চার দিকটা দেখে ফিরে এলো, নাহ্ কেউ নেই! (চলবে) 

মন্তব্য