| প্রচ্ছদ

অবশেষে না ফেরার দেশে বিয়েতে রাজি না হওয়া সেই রিপা

পুণ্ড্রকথা ডেস্ক
পঠিত হয়েছে ৬১ বার। প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারী ২০২০ ।

পাঁচ মাস মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে শনিবার মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন জেসমিন আক্তার রিপা (২০)। বিয়েতে রাজি না হওয়ায় এলাকার বিল্লাল ফরাজী প্রকাশ্যে জোরপূর্বক রিপাকে তুলে নেয়ার চেষ্টা চালায়। টেনে-হেচঁড়ে এবং বেদম পিটুনি দিয়ে চরম শারীরিক লাঞ্ছিত করে। বিচার না পেয়ে গত ১০ আগস্ট বিষপান করেছিলেন রিপা। অথচ চারদিন পর ১৪ আগস্ট কালীগঞ্জের এক যুবকের সাথে তার বিয়ের পিঁড়িতে বসার কথা ছিল। 

রিপা গাজীপুরের কালীগঞ্জের বড়গাঁও (খিলপাড়া টেকের) দরিদ্র মো. রফিকুল ইসলামের মেয়ে। বখাটে বিল্লাল ফরাজি (৪৫) একই এলাকার গিয়াস উদ্দিন ফরাজির ছেলে।  

রিপার মা নূরজাহান বেগম বলেন, তার স্বামী রফিকুল ইসলাম গাছ কাটা শ্রমিক। তাঁর এক ছেলে, দুই মেয়ে। সন্তানদের মধ্যে দ্বিতীয় ছিল রিপা। বেশ কিছুদিন ধরেই বিল্লাল ফরাজি পথে ঘাটে তার মেয়েকে উত্ত্যক্ত করতো। বিল্লাল বিবাহিত ও তিন সন্তানের জনক। তার বিরুদ্ধে একাধিক ধর্ষণ ও হত্যা মামলা রয়েছে। গত ১০ আগস্ট দুপুরে রিপার বিয়ে ঠিক হয়। বিয়ের দিন ধার্য হয় ১৪ আগস্ট। বিষয়টি জানতে পেরে ক্ষুব্ধ হয় বিল্লাল। রিপা বিকেলে বাড়ির পাশের সড়কে গেলে বিল্লাল তাকে প্রকাশ্যে জোরপূর্বক টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকে। রিপা চিৎকার দিলে চড়-লাথি মেরে লাঞ্ছিত করে। পরে এলাকার লোকজন তাকে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় তারা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বর বিল্লালের চাচা হেকিম ফরাজির কাছে বিচার দাবি করেন। কিন্তু সেখানে সে বিচার পায়নি। বিল্লাল নূরজাহান বেগমের মোবাইলে ফোন দিয়ে অশ্লীল কথাবার্তা বলে এবং রিপার ভাই ও বাবাকে হত্যার হুমকি দেয়। জানতে পেরে রিপা সবার অজান্তে কীটনাশক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। টের পেয়ে পরিবারের লোকজন তাকে উদ্ধার করে প্রথমে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং পরে উত্তরা রিজেন্ট হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে ১৫ দিন ধরে আইসিও'তে চিকিৎসাধীন ছিল রিপা। খরচ যোগাতে না পেয়ে পরে মেয়েকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে দুই মাস রিপার চিকিৎসা হয়। গলায় কৃত্রিম শ্বাসনল লাগিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন চিকিৎসকরা। খরচ যোগাতে না পেরে আড়াই মাস আগে মেয়েকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। এজন্য বাড়িতে, অক্সিজেন সিলিন্ডার, সাকশন মেশিন, আইপএস এসব যন্ত্র কিনতে হয়েছে। ব্যয় হয়েছে কয়েক লক্ষাধিক টাকা। ধার দেনা করে ওই টাকা ব্যয় করেছেন। তারপরও মেয়েকে বাঁচাতে পারলেন না। 

 

নূরজাহান বেগম আরও বলেন, এ ঘটনায় তিনি বাদী হয়ে বিল্লাল ফরাজি, তার বাবাসহ ৭ জনকে আসামি করে কালীগঞ্জ থানায় মামলা করেছিলেন। ঘটনার পর বিল্লাল মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমায়। অন্য আসামিরা উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে এসে মামলা তুলে নিতে হুমকি দিতে শুরু করে। আমরা এক প্রকার জিম্মি অবস্থাতেই ছিলাম। এরই মধ্যে শনিবার ভোরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে রিপা। তিনি মেয়ের হত্যায় প্ররোচনাদানকারীদের ফাঁসি দাবি করেন। 

বাবা রফিকুল ইসলাম বলেন, নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় কাপাসিয়ার দুর্গাপুর গ্রামে এক সৌদি প্রবাসীর সাথে রিপার বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের পর জানতে পারি রিপার আগে তার স্বামী আরো তিনটি বিয়ে করেছিল। রিপা ৬ মাসের গর্ভবর্তী অবস্থায় তার স্বামী আবার বিয়ে করে। রিপার সাথে স্বামীর ডিভোর্স হয়ে যায়। তারপর থেকে সে তার কাছেই ছিল। এখন রিপার মেয়ে নূহার বয়স দুই। তিনি বলেন, লাঞ্ছিতের ঘটনায় পুলিশ কোন পদক্ষেপ নেয়নি। তিনিও এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন। 

এ বিষয়ে কালীগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক মো. সোহেল মোল্লা বলেন, রিপার লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। রিপার মা নুরজাহান বেগম বিল্লাল ফরাজীকে প্রধান আসামি করে ৭ জনের নামে মামলা করেছিলেন। আসামিরা জামিনে থাকায় গ্রেপ্তার করা যায়নি। 

মন্তব্য