| প্রচ্ছদ

ফতেহ্ আলী সেতুর নিচে ময়লা-আবর্জনার পাহাড়

বগুড়ার করতোয়া এখন ভাগাড়!

পুণ্ড্রকথা রিপোর্ট
পঠিত হয়েছে ৮০৩ বার। প্রকাশ: ০৭ জানুয়ারী ২০২০ ।

বগুড়ায় করতোয়া নদীর দূষণ রোধে তাতে ময়লা ও আবর্জনাসহ যে কোন ধরনের বর্জ্য না ফেলার জন্য উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও কেউ তা মানছে না। বরং এক সময়ের খরস্রোতা ওই নদীকে এখন ‘ভাগাড়’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিয়েসহ বিভিন্ন ভোজের অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত ওয়ান টাইম প্লেট-গ্লাস, ফল সংরক্ষণের প্লাস্টিকের প্যাকেট, পলিথিন ব্যাগ, শহরে ফতেহ্ আলী বাজারে জবাই করা গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ও কবুতরের নাড়ি-ভুড়ি, পালক এবং বিষ্টাসহ মৃত পশু-পাখিও ফেলা হচ্ছে করতোয়া নদীতে। 
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, শহরের ফতেহ্ আলী বাজারের পূর্ব দিক থেকে দক্ষিণে জেলা কারাগারের সামনের অংশের নদী তীরবর্তী এলাকাতেই সবচেয়ে বেশি বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। বছরজুড়ে সেখানে রাতদিন বর্জ্য ফেলা হলেও যেন দেখার কেউ নেই। বর্ষা মৌসুমে বর্জ্যগুলো স্রোতে ভেসে গেলেও এখন শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি না থাকায় ফতেহ্ আলী সেতুর দক্ষিণ পশ্চিমপ্রান্ত যেন ‘বর্জ্যরে পাহাড়ে’ পরিণত হয়েছে।
পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বলছেন, শহরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মূল দায়িত্ব বগুড়া পৌরসভা কর্তৃপক্ষের। এজন্য করতোয়া নদীতে বর্জ্য না ফেলানোর বিষয়টি তদারকের জন্য আদালত পৌর কর্তৃপক্ষকে নির্দেশও দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ওই প্রতিষ্ঠানটি এ ব্যাপারে রীতিমত উদাসীন। আর নদীর মালিক জেলা প্রশাসন শুধু চিঠি দিয়েই তাদের ‘অফিসিয়াল দায়িত্ব’ পালন করে যাচ্ছে। ফলে করতোয়া নদীতে বর্জ্যরে পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। এমন পরিস্থিতিতে দূষণের কবল থেকে করতোয়াকে রক্ষায় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো আবারও আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার কথা ভাবছেন।
বগুড়ায় করতোয়া নদীর দখল ও দূষণ রোধে ইতিপূর্বে স্থানীয় জেলা প্রশাসনের কোন উদ্যোগ না থাকায় বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) পক্ষ থেকে প্রায় ৫ বছর আগে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে উচ্চ আদালতে রিট (৬৫০১/২০১৫) করা হয়। তাতে বগুড়া জেলা প্রশাসক, পৌরসভা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ ২১জনকে বিবাদি করা হয়। শুনানী শেষে আদালত একই বছরের ২২ আদালত করতোয়া নদীকে অবৈধ দখলমুক্ত করতে জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ওই নদীতে সব ধরনের বর্জ্য ফেলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পৌরসভাকে নির্দেশন দেন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান জানান, আদালতের ওই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে করতোয়া নদীর অবৈধ দখল উচ্ছেদে বিভিন্ন সময় স্থানীয় জেলা প্রশাসনের তৎপরতা দেখা গেলেও দূষণ রোধে পৌর কর্তৃপক্ষের কোন উদ্যোগ চোখে পড়েনি। তিনি বলেন, পৌর কর্তৃপক্ষের এমন উদাসীনতায় দোকানিসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দৈনন্দিন নানা ধরনের বর্জ্য সরাসরি করতোয়া নদীতে ফেলতে শুরু করেছে। বিষয়গুলো জেলা নদী কমিটির সভায় একাধিকবার উত্থাপন করা হলেও কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ফতেহ্ আলী বাজারে পূর্ব দিকে করতোয়া নদীর তীর ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে বড় একটি ড্রেনের মাধ্যমে জবাই করা গরু-ছাগলের রক্ত, চর্বি, হাড় ও মাংসের টুকরা, হাঁস-মুরগী ও কবুতরের পালক এবং নাড়ি-ভুড়ির পাশাপশি মরা হাঁস-মুরগীও সরাসরি নদীতে পেলা হচ্ছে। এর পাশেই ফতেহ্্ আলী সেতুর পশ্চিম-দক্ষিণ প্রান্তে স্থানীয় ফল ব্যবসায়ীদের ফেলা নানা ফল সংরক্ষণের প্লাস্টিকের প্যাকেটসহ ওয়ান টাইম প্লেট ও গ্লাস ফেলা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ফেলার কারণে ফতেহ্ আলী সেতুর ওই অংশে বর্জ্যরে স্তুপ পাহাড়সম উঁচু হয়ে গেছে। বর্জ্যগুলো একদিকে যেমন নদীর গতিপথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে তেমনি পানিতে মিশে তাকে আরও দূষিত করছে। বগুড়ায় রেলওয়ের উর্ধ্বতন উপ-সহকারি প্রকৌশলী আসলাম হোসাইন জানান, রেল সেতুর ওপর এবং তার আশে-পাশে ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে সেতুর গার্ডরে মরিচা পড়তে শুরু করেছে। এ কারণে গার্ডারগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। 
আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে কেন বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে সে সম্পর্কে জানতে চাইলে ফতেহ্্ আলী বাজার কাঁচামাল ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি আবু কালাম আকন্দ জানান, আদালতের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি তাদের জানা নেই। তিনি বলেন, ‘আপনার মাধ্যমেই প্রথম এ বিষয়টি আমরা জানলাম। আগামীতে আমরা আর কোন বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলবো না। এখন থেকে পৌরসভার মাধ্যমে আমরা বর্জ্য অপসারণ করবো।’ একই কথা বলেছেন বগুড়া ফল ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জুলফিকার আনাম তুষারও। তিনি বলেন, ‘করতোয়া নদীতে বর্জ্য ফেলানো যাবে না- এমন কোন নির্দেশনার কথা আমাদের জানা ছিল না। যেহেতু আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তাই আমরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে আমরা সদস্যদের সঙ্গে বসে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেব।’
তবে বগুড়া পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা রাখিউল আবেদীন জয় দাবি করেছেন, তারা ফতেহ্্ আলী বাজারে প্রতিটি দোকান-মালিক ও ব্যবসায়ীকে নদীতে বর্জ্য না ফেলার জন্য বার বার তাগাদা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের বলেছি তারা যেন তাদের প্রতিদিনকার বর্জ্যগুলো বাজারের সামনের সড়কে রাখেন আমরা ভোরে ট্রাক দিয়ে সেগুলো তুলে নিয়ে গিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলবো।’ বগুড়া পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ জানান, ফতেহ্ আলী বাজারের দোকানিরা বাজার থেকে নদী পর্যন্ত একটি ড্রেন তৈরি করেছে। সেই ড্রেন দিয়ে তারা জবাই করা পশু-পাখির বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলে। নিষেধ করলেও তারা শোনেন না। বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য বগুড়া পৌরসভার মেয়র অ্যাডভেঅকেট একেএম মাহবুবর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি। কর্মকর্তারা জানান তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন। তবে সেল ফোনে কল দিলেও তা বন্ধ পাওয়া গেছে। 
করতোয়া নদীর দখল ও দুষণ রোধে উচ্চ আদালতে রিটকারী পরিবেশবাদী সংগঠন বেলার রাজশাহী বিভাগীয় সমন্বয়কারী তন্ময় কুমার সান্যাল জানান, করতোয়া নদীর দূষণ রোধে স্থানীয় প্রশাসন সব ধরনের উদ্যোগ নিবেন বলে তারা আশাবাদী। তবে যদি তাদের ঘাটতি দেখা যায় তাহলে হয়তো আবারও আদালতের শরণাপন্ন হতে হবে।

মন্তব্য