| আলোচনা

রোজা শরীরের ক্ষত সারিয়ে তোলে ও সংক্রমণ রোধে সাহায্য করে: বিবিসি’র প্রতিবেদন

পুণ্ড্রকথা ডেস্ক:
পঠিত হয়েছে ৪১০ বার। প্রকাশ: ১৬ মে ২০১৮ । আপডেট: ১৬ মে ২০১৮ ।

রমজান মাসের রোজা যারা করেন তারা কি জানেন রোজা রাখার কারণে শরীরের পাচকতন্ত্র, যকৃৎ, কিডনি এবং দেহ ত্বকে এক ধরনের পরিবর্তন আসে। সেখানে থেকে সব দূষিত বস্তু বেরিয়ে শরীর যেন শুদ্ধ হয়ে ওঠে। কথাগুলো বলছেন ক্যামব্রিজের (বৃটেন) এডেনব্রুকস হাসপাতালের অ্যানেসথেসিয়া এন্ড ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিনের কনসালট্যান্ট ডা. রাজিন মাহরুফ।
রমজান মাসের রোজায় মানব দেহে কি পরিবর্তন ঘটে-তার কাছে এমন প্রশ্ন রেখেছিল বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বিবিসি। জবাবে ডা. রাজিন মাহরুফ রমজানের রোজাকে মানব দেহের জন্য উপকারী হিসেবেই উল্লেখ করেছেন। তার দেওয়া তথ্যগুলোর ওপর ভিত্তি করে বিবিসি ১৪ মে এক প্রতিবেদন তৈরি করে। যা তাদের অনলাইন সংস্করণে প্রকাশ করা হয়েছে। পুণ্ড্রকথা’র পাঠকদের জন্য সেটি তুলে ধরা হলো।
বিবিসিকে ডা. রাজিন মাহরুফ জানান, রোজা কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায় এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও কমায়। তবে যেহেতু রক্তে সুগার বা শর্করার মাত্রা কমে যায়, সে কারণে হয়তো কিছুটা দুর্বল এবং ঝিমুনির ভাব আসতে পারে। তিনি এক মাসের রোজাকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে মানবদেহের ওপর তার প্রভাবগুলো বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, রোজার প্রথম কয়েকদিন সবচেয়ে কষ্টকর। শেষ খাবার যাকে সেহেরী বলা হয় সেটি খাওয়ার পর আট ঘন্টা পার না হওয়া পর্যন্ত কিন্তু মানুষের শরীরে সেই অর্থে রোজার প্রভাব পডবে না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যে খাবার খাই, পাকস্থলীতে তা পুরোপুরি হজম হতে এবং এর পুষ্টি শোষণ করতে অন্তত আট ঘন্টা সময় নেয় শরীর। যখন এই খাদ্য পুরোপুরি হজম হয়ে যায়, তখন আমাদের শরীর যকৃৎ এবং মাংসপেশীতে সঞ্চিত থাকে যে গ্লুকোজ সেটা থেকে শক্তি নেয়ার চেষ্টা করে। শরীর যখন এই চর্বি খরচ করতে শুরু করে, তা আমাদের ওজন কমাতে সাহায্য করে। এটি কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায় এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়। তবে যেহেতু রক্তে সুগার বা শর্করার মাত্রা কমে যায়, সে কারণে হয়তো কিছুটা দুর্বল এবং ঝিমুনির ভাব আসতে পারে। এছাড়া কারও কারও ক্ষেত্রে মাথাব্যাথা, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব বা নিশ্বাসে দুর্গন্ধ হতে পারে।
তাঁর উপদেশ হলো: ৩ হতে ৭ রোজায় পানিশূন্যতা থেকে সাবধান থাকতে হবে। তার মতে, প্রথম কযেকদিনের পর শরীর যখন রোজায় অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, তখন শরীরে চর্বি গলে গিয়ে তা রক্তের শর্করায় পরিণত হচ্ছে। কিন্তু রোজার সময় দিনের বেলায় যেহেতু কিছুই খাওয়া বা পান করা হয় না তাই রোজা ভাঙ্গার পর অবশ্যই সেটার ঘাটতি পূরণের জন্য প্রচুর পানি পান করতে হবে। নইলে মারাত্মক পানি-শূন্যতায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে গরমের দিনে যদি শরীরে ঘাম হয়। তিনি বলেন, ‘আর যে খাবার আপনি খাবেন, সেটাতেও যথেষ্ট শক্তিদায়ক খাবার থাকতে হবে। যেমন কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা এবং চর্বি। একটা ভারসাম্যপূর্ণ খাবার খুব গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে সব ধরণের পুষ্টি, প্রোটিন বা আমিষ, লবণ এবং পানি থাকবে।’
৮ হতে ১৫ রোজায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠে শরীর:  এই পর্যায়ে এসে নিশ্চয়ই রোজাদাররা অনুভব করতে পারে যে তার শরীর-মন ভালো লাগছে। কারণ রোজার সঙ্গে তার শরীর মানিয়ে নিতে শুরু করেছে। রোজার অন্যান্য সুফল আছে উল্লেখ করে ডা. মাহরুফ বলেন, ‘সাধারণত দৈনন্দিন জীবনে আমরা অনেক বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবার খাই এবং এর ফলে আমাদের শরীর অন্য অনেক কাজ ঠিকমত করতে পারে না। কিন্তু রোজার সময় যেহেতু আমরা না খেয়ে থাকছি, তাই শরীর তখন অন্যান্য কাজের দিকে মনোযোগ দিতে পারে। কাজেই রোজা কিন্তু শরীরের জন্য বেশ উপকারী। এটি শরীরের ক্ষত সারিয়ে তোলা বা সংক্রমণ রোধে সাহায্য করতে পারে।’

১৬ রোজার পর শরীর ভারমুক্ত হতে শুরু করে: রমজান মাসের দ্বিতীয়ার্ধে শরীর কিন্তু পুরোপুরি রোজার সঙ্গে মানিয়ে নেবে। শরীরের পাচকতন্ত্র, যকৃৎ, কিডনি এবং দেহত্বক এখন এক ধরণের পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাবে। সেখানে থেকে সব দূষিত বস্তু বেরিয়ে শরীর যেন শুদ্ধ হয়ে উঠবে। এসময় শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তাদের পূর্ণ কর্মক্ষমতা ফিরে পাবে। রোজাদারদের স্মৃতি এবং মনোযোগের উন্নতি হবে এবং তারা যেন শরীরে অনেক শক্তিও পাবেন। ডা. রাজিন মাহরুফ বলেন,  ‘শরীরের শক্তি জোগানোর জন্য আপনার আমিষের ওপর নির্ভরশীল হওয়া ঠিক হবে না। যখন আপনার শরীর 'ক্ষুধার্ত' থাকছে তখন এটি শক্তির জন্য দেহের মাংসপেশীকে ব্যবহার করছে। এবং এটি ঘটে যখন একটানা বহুদিন বা কয়েক সপ্তাহ ধরে আপনি উপোস থাকছেন বা রোজা রাখছেন। যেহেতু রোজার সময় কেবল দিনের বেলাতেই আপনাকে না খেয়ে থাকতে হয়, তাই আমাদের শরীরের চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট খাবার এবং তরল বা পানীয় গ্রহণের সুযোগ থাকছে রোজা ভাঙ্গার পর। এটি আমাদের মাংসপেশীকে রক্ষা করছে এবং একই সঙ্গে আমাদের আবার ওজন কমাতেও সাহায্য করছে।’
বিবিসি ডা. রাজিন মাহরুফকে প্রশ্ন করে, ‘তাহলে রোজা রাখা কি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো?’ জবাবে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই, তবে একটা ব্যাপার আছে।’ তাঁর পরামর্শ হচ্ছে রমজান মাসের পর মাঝে মাঝে রোজা রাখা যেতে পারে। যেমন ৫:২ ডায়েট (পাঁচদিন কম খেয়ে দুদিন ঠিকমত খাওয়া-দাওয়া করা)। যেখানে কয়েকদিন রোজা রেখে আবার স্বাস্থ্যসম্মতভাবে খাওয়া-দাওয়া করা যেতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘রোজা রাখা শরীরের জন্য ভালো কারণ আমরা কী খাই এবং কখন খাই সেটার ওপর আমাদের মনোযোগ দিতে সাহায্য করে। কিন্তু একমাসের রোজা রাখা হয়তো ভালো। তবে একটানা রোজা রেখে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া যাবে না।’ তার মতে শরীরের ওজন কমানোর জন্য একটানা রোজা রাখা কোন উপায় হতে পারে না। কারণ একটা সময় শরীর চর্বি গলিয়ে তা শক্তিতে পরিণত করার কাজ বন্ধ করে দেবে। তখন এটি শক্তির জন্য নির্ভর করবে মাংসপেশীর ওপর। এটা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। কারণ শরীর তখন ক্ষুধায় ভুগবে।

মন্তব্য