| প্রচ্ছদ

ইসরাইলি মিডিয়ার বিশ্লেষণ

আরবদের তেল সম্পদ ফুরিয়ে যাচ্ছে, ধেয়ে আসছে বিপর্যয়

পুণ্ড্রকথা ডেস্ক
পঠিত হয়েছে ৮৮ বার। প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ।

বিশ্বজুড়ে তারা জিসিসি নামে পরিচিত। যার পূর্ণরূপ হচ্ছে উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা। এসব ধনী তেলসমৃদ্ধ দেশের যথোচিত সংক্ষিপ্ত নাম হতে পারে এটিএম। ১৯৭০ দশক থেকে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তারা নিজেদের সম্পদের বিস্তার ঘটিয়েছে, বন্ধু বানিয়েছে, প্রভাব ছড়িয়েছে আর সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান না করে তা জিইয়ে রেখেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গত মাসে ঘোষণা করা শান্তি পরিকল্পনায় সেই তেল সম্পদের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এতে অনেকটা নির্লিপ্তভাবে ধরে নেয়া হয়েছে যে প্রস্তাবিত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করতে পাঁচ হাজার কোটি ডলার সহায়তা আসবে আরব দেশগুলো থেকে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক ভাণ্ডার অবারিত রাখতেই ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর একীভূতকরণ পরিকল্পনা আটকে রেখেছে হোয়াইট হাউস। এসব দেশের ওপর কেবল ট্রাম্পই নির্ভর করছেন, বিষয়টি ঠিক এমন না। মানবিক বিপর্যয় থেকে গাজা উপত্যকা রক্ষায় ও সর্বাত্মক যুদ্ধ থেকে বিরত রাখতে কাতারের সুটকেসভর্তি নগদ অর্থের ওপর নির্ভরশীল হামাস ও ইসরাইল।

আবদুল ফাত্তাহ আল-সিসি সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর মিসরের অর্থনীতিকে পতন থেকে রক্ষায় দুই হাজার ৩০০ কোটি ডলার উপসাগরীয় অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। লেবাননও তাদের প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর অর্থনৈতিক শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সম্প্রতি তারা বড় ধরনের অর্থনৈতিক ছাড় পাওয়ার প্রত্যাশার কথা জানিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে তেল অর্থের গুরুত্ব বোঝাতেই এখানে কয়েকটি উদহারণ দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল গত সপ্তাহে বলেছে, আরবের সবচেয়ে বড় এটিএমের অর্থ ফুরিয়ে যাচ্ছে। তেলের অর্থের ওপর নির্ভরশীলতা মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। যদি তেলের মূল্য বর্তমান অবস্থায়ও বহাল থাকে, তবে আরবদের জমা হওয়া দুই লাখ কোটি ডলার শেষ হয়ে যাবে মাত্র ১৫ বছরের মধ্যে।

এক ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলার হলেও ২০৫১ সালের মধ্যে এই অর্থ ফুরিয়ে যাবে। কিন্তু তেলের দরপতন ২০ ডলার করে হলে, ২০২৭ সালের মধ্যে তাদের সম্পদ নিঃশ্বেষ হয়ে যাবে।

বিশ্ব তেল বাজারে বাস্তবিকভাবে যা ঘটছে, তাতে পরিস্থিতি দ্রুতই বদলে যাচ্ছে। অপরদিকে নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন, নতুন জীবাশ্ম জ্বালানির উৎস তৈরি করছে। যার মধ্যে আমেরিকান পাথুরে তেলের কথা উল্লেখযোগ্য। এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনে জীবাশ্ম জ্বালানিকে নবায়ন থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।

ইতিমধ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অতীতের চেয়ে কম পেট্রোলিয়াম নির্ভরশীল হয়ে গেছে। ফলে বৈশ্বিক তেলের চাহিদা ২০৪১ সালে সর্বোচ্চ চূড়ায় গিয়ে ঠেকবে। এমনকি তার আগে অতীতের চেয়ে চাহিদা খুবই ধীর গতিতে বাড়বে। আর মূল্য ব্যারেল প্রতি একশ ডলারের বেশি বেড়ে যাওয়াটা একেবারেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে তখন।

একটি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে, জিসিসি দেশগুলোর নতুন তেল জমানায় রাজস্ব প্রভাবের প্রতিই বেশি আগ্রাহী আইএমএফ।

সংক্ষেপে বললে, উপসাগরীয় দেশগুলোর নাগরিকদের নৈমিত্তিক জীবন কঠিন হয়ে পড়েছে। যদিও এখনো তারা একটি করমুক্ত সহজ জীবন যাপন করতে পারছেন। বিশাল সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের চাকরির নিশ্চয়তা রয়েছে। এছাড়াও চমৎকার সব অবকাঠামোর কথা না-ই বলা হল।

কিন্তু অচিরেই তেলের মূল্য দিয়ে আর বেতন পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। কজেই তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনতে শুরু করেছে তারা। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন-২০৩০ পরিকল্পনা। এতে অর্থনীতিকে তিনি উচ্চ-প্রযুক্তি, পর্যটন ও অন্যান্য কারখানা নির্ভর করে তোলার পরিকল্পনা করেছেন।

যদি তিনি সফল (যদিও তার সফলতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে) হয়ে যান, তবুও সৌদি নাগরিকরা যে ধরনের জীবন ধারনে অভ্যস্ত, সেই খরচ পূরণে তা সম্ভব হবে না।

আইএমএফ সেই দিকেই আভাস দিয়েছে। জিসিসি সরকারগুলো যে হাইড্রোকার্বন জিডিপি উৎপাদন করছে, সেখান থেকে প্রতি এক ডলারে আশি সেন্ট পাচ্ছে তারা। আর তাদের বাকি অর্থনীতি থেকে ডলারের ১০ সেন্ট আসছে।

কাজেই এই ব্যবধান দূর করতে নিবৃত্তিমূলক পর্যায়ে গিয়ে তাদের কর বাড়াতে হবে, অথবা খরচ মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিতে হবে।

ইতিমধ্যে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু আইএমএফের হুশিয়ারি, তাদের জমাকৃত সঞ্চয় ফুরিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পেতে ব্যাপক খরচ কমিয়ে দিতে হবে। এই প্রক্রিয়ার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের একটি সংক্ষিপ্ত বরাত (একটি জটিল আন্তঃপ্রজন্মগত পছন্দ) দিয়েছে আইএমএফ। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সংকট আরও ব্যাপকভাবে ধেয়ে আসছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশের বিলাসিতা থেকে মধ্যআয়ের পরিশীলিত মলিন জীবনে অভ্যস্ত হওয়ার সময়টা খুব সহজেই পার করতে পারবে বলে নিশ্চয়তা দেয়া যাচ্ছে না।

রাজতান্ত্রিক সরকারের ওপর ভিত্তি করে অংশত উপসাগরীয় দেশগুলোর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্ভরশীল। এছাড়া অর্থনৈতিক পসারের ওপরও নির্ভরশীলতার বিষয়টি রয়েছে তাদের।

যখন আরব বসন্ত শুরু হয়েছিল, তখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো তাদের কর্মীদের বেতন ও অন্যান্য কল্যাণমূলক পদক্ষেপ বাড়িয়ে দিয়েছিল মারাত্মকভাবে। পরবর্তী সময়ে তা কোনো বাস্তবিক বিকল্প হিসেবে প্রমাণিত হয়নি।

হতাশার জন্য এটাই যথেষ্ট। কিন্তু দরিদ্র উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর সেই প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যজুড়েই বিস্তৃতি ঘটেছিল। সামরিক শক্তির চেয়ে উপসাগরীয় অর্থনীতি আরও বড় অনিশ্চয়তায়। ইরানের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ঠেকাতে এসব দেশকে বিশাল সামরিক শক্তি অর্জন করতে হয়েছে।

এভাবে জর্ডান ও তিউনিশিয়ার মতো অর্থনৈতিক পর্যুদস্ত দেশগুলোকে টিকিয়ে রাখতে উপসাগরীয় অর্থপ্রবাহ সচল রাখতে হয়েছে। অঞ্চলটি কেবল একটি প্রকাণ্ড এটিএমই না, আরব বিশ্বের একটি বড় কর্মসংস্থান সংস্থাও বলা যায় তাকে। তারা আড়াই কোটি মিসরীয়, লেবানিজ ও ফিলিস্তিনিকে চাকরির যোগান দিয়েছে। কারণ এসব আরবের নিজ দেশে কর্মসংস্থানের অভাব রয়েছে।

দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের ভূমিকা বিশাল ও ব্যাপক। এছাড়া এতে বেকারত্ব থেকে তৈরি রাজনৈতিক ঝুঁকিও কমে যায়। কিন্তু জিসিসি দেশগুলোর অর্থনীতি কঠিন হয়ে পড়েছে। কর্মক্ষেত্রে স্থানীয়দের যুক্ত করতে তারা ব্যাপক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রবাসীদের কর্মসংস্থা এখন নির্মম ঝুঁকিতে রয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যকে চিরায়ত নৈরাজ্যিক মনে হলেও আরও দশটি বছর অপেক্ষা করুন, তখন তাদের অর্থ কমে যাবে, সামান্য শান্তি ও স্থিতিশীলতা আনতে খুব কম কর্মসংস্থান থাকবে। সে হিসেবে বলাই যায় যে চরম বিপর্যয় ধেয়ে আসছে।

অর্থনীতিবিদ ও কলামনিস্ট ডেভিড রোজেনবার্গের লেখাটি ইসরাইলি দৈনিক হারের্টজে বিশ্লেষণটি প্রকাশিত

মন্তব্য