| প্রচ্ছদ

বগুড়ায় সাইবার পুলিশের কার্যক্রম শুরুঃযেসব ক্ষেত্রে অভিযোগ দায়ের করা যাবে

অরূপ রতন শীল
পঠিত হয়েছে ৩৪০ বার। প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০১৮ । আপডেট: ২১ নভেম্বর ২০১৮ ।

দেশে যত তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে ততোই  সাইবার ক্রাইম বা অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে  অনলাইন ব্যবহারে সাবধান বা সচেতন থাকার কোনো বিকল্প নেই। একটু অসচেতন হলেই ফেঁসে যেতে পারেন সাইবার অপরাধের দায়ে। জেনে হোক বা না জেনে, আপনি যদি অনলাইনে কোনো অপরাধ করেই ফেলেন, তাহলে এর জন্য দিতে হবে কঠিন মাশুল। সাইবার অপরাধীর বিচারে দেশে কঠিন আইন রয়েছে। যে আইন বিদ্যমান, তার প্রয়োগও বিদ্যমান। আর এ আইনের নাম হচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৩)।

আপনি কি জানেন? যেকোনো ধরনের ক্রাইম বা অপরাধ যখন অনলাইন বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ঘটে, তখন তাকে সাইবার ক্রাইম বা অপরাধ বলে। এছাড়াও  কোনো ব্যক্তি যদি ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ  হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি প্রদান করা হয়, তাহা হইলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছাড়াও সাইবার জগতের সার্বিক দুর্বৃত্তায়ন ঠেকাতে এবার ‘সাইবার পুলিশ সেন্টার’নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা হয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অধীনে এই সাইবার পুলিশ সারাদেশে কাজ করছে । থানা পুলিশের পাশাপাশি ডিজিটাল আইনে দায়ের করা মামলাগুলোর তদন্তেও বিশেষ দায়িত্ব পালন করছে  সাইবার পুলিশ।


বগুড়ায় সাইবার পুলিশ  সবে মাত্র ২মাস ধরে শুরু কাজ করেছে। কিন্তু এই শাখা ইতোমধ্যেই বেশ কিছু সাইবার অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছেন। সাইবার পুলিশ বগুড়া ইউনিট নিম্নলিখিত ধর্তব্য অপরাধসমূহ তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।

 
সাইবার অপরাধসমূহঃ


১। আপত্তিকর ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও, মিথ্যা তথ্য, বিভিন্ন ধরণের গুজব ইত্যাদি ফেসবুক এর মত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো।
২। ওয়েব ফিশিং বা অন্য কোন উপায়ে তথ্য চুরি করে ফেসবুক বা ই-মেইল অ্যাকাউন্ট হ্যাকের মাধ্যমে জিম্মি করে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা।
৩। হ্যাকিং এর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠিত দল কর্তৃক কোনো ব্যক্তি বা পরিবারকে ভীতি বা শক্তি প্রদর্শন, হুমকি প্রদান ও তথ্য ছিনতাই সংক্রান্ত অপরাধ।
৪। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস ও ভুয়া প্রশ্ন তৈরি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া।
৫। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ব্লগের মাধ্যমে জঙ্গীবাদী প্রচারনা এবং সমর্থক ও সদস্য সংগ্রহ করা।
৬। ইউটিউবে আপত্তিকর ও অশালীন খারাপ ভিডিও প্রচার করা।
৭। বিভিন্ন ধরনের পর্নো ভিডিও তৈরি করে বিভিন্ন পর্নো সাইটে প্রচার করা।
৮। ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিশু পর্নোগ্রাফি প্রচার।
৯। অবৈধ, অশ্লীল, ধর্মীয় অবমাননা হয় এমন কোন কন্টেট এর প্রকাশ এবং প্রচার করা।
১০। ভুয়া অনলাইন পত্রিকার মাধ্যমে মিথ্যা সংবাদ প্রচার ও গুজব ছড়ানো।
১১। বিকাশ ও রকেটের মত মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় প্রতারনার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া।
১২। মোবাইল নাম্বার ক্লোন করে চাঁদাবাজি।
১৩। মোবাইলে বিভিন্ন লটারি বা পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে আর্থিক প্রতারনা।
১৪। অনলাইন আর্থিক প্রতারনা।
১৫। পাসওয়ার্ড হাতিয়ে নিয়ে এটিএম কার্ড ও পিওএস জালিয়াতির মাধ্যমে আর্থিক প্রতারনণা।
১৬। অনলাইন গ্যাম্বলিং এবং ক্রিপেটা কারেন্সি সংক্রান্ত অপরাধ।
১৭। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে মাদক ক্রয়-বিক্রয় করা।
১৮। ভুয়া বা মিথ্যা ই-মেইল প্রেরণের মাধ্যমে প্রতারনা।
১৯। ভাইরাসের মাধ্যমে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেমের ক্ষতি সাধন করা।
২০। পাইরেসির মাধ্যমে "ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপারটি"র ক্ষতিসাধন।

বগুড়া সাইবার পুলিশে অভিযোগের নিয়মাবলীঃ


১। ভিক্টিম বা অভিযোগকারী প্রথমে যেখানে তার জন্য ক্ষতিকর বা আপত্তিকর বিষয়টি দেখতে পাবেন সেই জায়গাটিই হবে উক্ত অপরাধের ঘটনাস্থল।
২। যে সময়ে আপত্তিকর বিষয়বস্তু দেখতে পাবেন সেটা হবে ঘটনা সংগঠনের সময়।
৩। সাইবার ক্রাইম সংক্রান্ত কোন প্রকার অভিযোগ বা সাধারণ ডায়েরী  বা মামলা করতে চাইলে অভিযোগকারীকে ঘটনাস্থল বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ/সাধারণ ডায়েরী/মামলা করতে হবে।
৪। উক্ত অভিযোগ /সাধারণ ডায়েরী/মামলার একটি কপি সাইবার পুলিশ , পুলিশ সুপারের কার্যালয় বগুড়ার বয়ারাবর জমা দিতে হবে।
৫/।উল্লেখ্য যে, ফেসবুক সংক্রান্ত অভিযোগ বা সাধারণ ডায়েরী বা মামলায় ফেসবুক আইডিএর ইউআরএল লিংক ও নিওমেরিক ভ্যালু অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে এবং অপরাধ সংশ্লিষ্ট পেইজ এর স্ক্রীনশট সংযুক্ত করতে হবে।
৬।উপরের উল্লেখিত বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে সাইবার পুলিশ বগুড়া টিম ভিক্টিম বা অভিযোগকারীকে সার্বিক সহযোগিতা করে থাকে।


আইনে যে শাস্তি রয়েছেঃ

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৩)-এর ৫৪ ধারা অনুযায়ী, কম্পিউটার বা কম্পিউটার সিস্টেম ইত্যাদির ক্ষতি, অনিষ্ট সাধন যেমন ই-মেইল পাঠানো, ভাইরাস ছড়ানো, সিস্টেমে অনধিকার প্রবেশ বা সিস্টেমের ক্ষতি করা ইত্যাদি অপরাধ। এর শাস্তি সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ৭ বছর কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা। ৫৬ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে এমন কোনো কাজ করেন, যার ফলে কোনো কম্পিউটার রিসোর্সের কোনো তথ্য বিনাশ, বাতিল বা পরিবর্তিত হয় বা এর উপযোগিতা হ্রাস পায় অথবা কোনো কম্পিউটার, সার্ভার, নেটওয়ার্ক বা কোনো ইলেকট্রনিক সিস্টেমে অবৈধভাবে প্রবেশ করেন, তবে এটি হবে হ্যাকিং অপরাধ, যার শাস্তি সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ৭ বছর কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা।
৫৭ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে কোনো মিথ্যা বা অশ্লীল কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করে, যার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয় অথবা রাষ্ট্র বা ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, তাহলে এগুলো হবে অপরাধ। এর শাস্তি সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ৭ বছর কারাদণ্ড এবং ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা।

সাইবার পুলিশ বগুড়ার ব্যাপারে জেলা পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা বলেন, 'আমরা সবেমাত্র যাত্রা করেছি। আশা করছি সবার সহযোগিতায় বগুড়ায় সাইবার অপরাধ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। আর সবার মধ্যে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে  সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন সেমিনার, অনুষ্ঠানে লিফলেট বিতরণ শুরু করা হয়েছে।' তিনি আরও জানান, অভিযোগকারীরা অতি সহজেই যেকোন সময় ০১৭৬৯৬৯৩৩৬৯ এই নম্বরে ফোন করে তাদের অভিযোগের কথা জানাতে পারবেন।

মন্তব্য