| প্রচ্ছদ

বগুড়ায় প্রথম আলোর সেচ্ছাসেবা সম্মাননা বিষয়ক মতবিনিময় সভা

স্বেচ্ছাসেবীরা পাশে থাকলে বাংলাদেশ জেগে উঠবেই

পঠিত হয়েছে ২১৩ বার। প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২০ ।

স্বেচ্ছাসেবীরা  পাশে থাকলে বাংলাদেশ জেগে উঠবেই
বয়সে তরুণ। দারিদ্রের সঙ্গে বড় হয়েছেন। পড়াশোনা করেছেন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। অল্প বয়সে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে পড়ায়  জীবনে নানা চড়াই উৎড়াই পাড়ি দিয়েছেন।  কখনো বাস চালকের সহকারি, কখনো রাজমিস্ত্রীর সহকারি আবার কখনো জুতার দোকানে কাজ করেছেন।  এখন চাকরি করেন সরকারি একটি দপ্তরের  নৈশপ্রহরী হিসাবে। প্রসূতি স্ত্রীর সন্তান  জন্মের সময় হঠাৎ রক্তের দরকার পড়ে। একব্যাগ রক্তের জন্য হাসপাতাল থেকে ও হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকে অনেক ছুটোছুটি করতে হয়।  অনেক ছোটাছুটির পর   মিলে এক ব্যাগ রক্ত। বেঁচে যান স্ত্রী।  জীবন বাঁচাতে সময়মত এক ব্যাগ রক্ত না  পেলে মানুষকে কতটা অসহায় করে তা হাড়ে হাড়ে টের পান । সেই থেকে শুরু হয় মানুষের জীবন বাঁচাতে মূমূর্ষ রোগীর জন্য রক্ত সংগ্রহের নেশা।  রক্তদাতার সন্ধানে তিনি বেছে নেন অনলাইন মাধ্যম। গঠন করেন  ‘বগুড়া অনলাইন রক্তদাতা সংগঠন’  নামে একটি সংগঠন।  কারও রক্তের প্রয়োজন পড়লে  একটি ফেসবুক পেজে   রক্তের কাংখিত গ্রুপ লিখে পোষ্ট দেন। র রক্তদাতাদের সঙ্গে করে ছুটে যান হাসপাতালে মূমুর্ষ রোগীর কাছে। মানুষের জীবন বাঁচাতে স্বেচ্ছায়  রক্ত  দিয়ে পাশে দাঁড়ানো  এই তরুণের নাম বগুড়ার সোহেল রানা (২৬)। গত চার বছরে পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষকে রক্ত দিয়ে বাঁচিয়েছেন।  মানুষের বিপদে এগিয়ে আসার ‌ মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবার যে কাজ তিনি ক‌রে‌ছেন, তাতে বেঁচে যাচ্ছে অসংখ্য মানু‌ষের প্রাণ।  এ মহ‍ৎ উদ্যেগে সাড়া দিয়ে সোহেলের অনলাইন গ্রুপে যুক্ত হয়েছেন ৪৭ হাজার মানুষ। তাঁর পেজে সদস্য সংখ্যা ৮ হাজার।  বগুড়া শহরের  শতাধিক তরুণ-তরুণী স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে  রক্ত সংগ্রহের কাজ করছেন  সোহেল রানার সঙ্গে। তারাও স্বেচ্ছায় রক্তদান করছেন।  রাতদিন মুঠোফোনে সক্রিয় থাকেন সোহেল  রানা।  যখনই কোনো রোগীর রক্তের প্রয়োজন পড়ে, সোহেলের গ্রুপের রক্তদাতারা সেখানে  স্বেচ্ছায় এগিয়ে যান রক্ত দিতে। সোহেলের স্বপ্ন রক্তের জন্য একজন মূমূর্ষ রোগীও যেন মারা না যান।
  প্রথম আলোর বগুড়া আঞ্চলিক কার্যালয়ে ভলান্টারি সার্ভিসেস ওভারসিজ (ভিএসও) এবং প্রথম আলোর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত স্বেচ্ছাসেবা সম্মাননা মতবিনিময় সভায়  সোহেল যখন স্বেচ্ছায়  রক্ত দিয়ে পাঁচ হাজার  মানুষের জীবন বাঁচানোর গল্প শোনান তখন করতালি দিয়ে তাঁর এ অনন্য কাজে সমর্থন জানান উপস্থিত অতিথি ও স্বেচ্ছাসেবীরা।
 সোহেল রানার মতো অন্তত ৩০টি সংগঠনের ৬০ জন স্বেচ্ছাসেবক, স্বেচ্ছাসেবা সংগঠক এবং অতিথি এসেছিলেন স্বেচ্ছাসেবা সম্মাননা মত বিনিময় অনুষ্ঠানে যোগ দেন।  বেশির ভাগ স্বেচ্ছাসেবক বয়সে  তরুণ এবং শিক্ষার্থী। তাঁদের কেউ  সুবিধা বঞ্চিত পথশিশুদের শিক্ষার জন্য কাজ করেন, বস্তির শিশুদের নিয়ে পাঠশালা চালান।  কেউ বাল্যবিবাহ রোধে আবার কেউ  নারী অধিকার আদায়ে, কেউ পরিবেশ রক্ষায়, কেউবা বিনা মূল্যে দুস্থ রোগীদের রক্তদান সেবায় কাজ করেন। কেউ গ্রামে গ্রামে ঘুরে বিনা পয়সার পাঠশালা চালান। নিজের জন্য নয়; মানুষের জন্য  নিঃস্বার্থভাবে কাজ করছেন তাঁরা ।
তরুণদের স্বেচ্ছাসেবাকে উৎসাহ দিতে শুরু হচ্ছে ‘স্বেচ্ছাসেবা সম্মাননা ২০২০’। ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার এই উদ্যোগ নিয়েছে ভলান্টারি সার্ভিসেস ওভারসিজ (ভিএসও) এবং প্রথম আলো। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে  বৃহষ্পতিবার বগুড়ায় ভিএসও-প্রথম আলো স্বেচ্ছাসেবা সম্মাননাবিষয়ক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। বেলা ১১টায় প্রথম আলোর আঞ্চলিক কার্যালয়ে এ মতবিনিময় সভা শুরু হয়।
মতবিনিময় সভায় স্বেচ্ছাসেবক ছাড়াও বিশিষ্ট শিক্ষক, মুক্তিযোদ্ধা,  শিশু ও সাংস্কৃতিক সংগঠক, কবি ও লেখক এবং নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বেচ্ছাসেবীরা নিজের পরিচয়  তুলে ধরেন। এরপর প্রথম আলোর  কর্মকান্ড নিয়ে নির্মিত দুটি তথ্যচিত্র নায়ক ও অধিনায়কেরা এবং আলোর পাঠশালা দেখানো হয়।
এরপর স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর মার্কেটিং বিভাগের সহকারি মহাব্যবস্থাপক শাহেদ বিন সারোয়ার।
প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আনোয়ার পারভেজের সঞ্চালনায়  স্বেচ্ছাসেবীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অর্থনীতি, মানবিক কর্মকান্ডসহ নানা ক্ষেত্রে চালিয়ে যাওয়া তাঁদের কর্মযজ্ঞ তুলে ধরেন।
বগুড়ার দরিদ্র ও স্বশিক্ষিত কাঠমিস্ত্রি আনোয়ার  হোসেন তালুকদার শোনান  ‘হতে চাই না বিয়ের পাত্রী, হতে চাই স্কুলছাত্রী’ লেখা লাল পোষাক ও লাল সাইকেল নিয়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ২০০ উপজেলায় প্রচারণা চালানো আর বগুড়ার সোনাতলার স্বল্প শিক্ষিত ও দরিদ্র জাহিদুল ইসলাম শোনান মানুষের দুর্ভোগ  নিরসনে স্বেচ্ছায় ৪৫০টি বাঁশের সেতু  তৈরীর  গল্প। 
 শতবছর ধরে প্রতিদিন মধ্যরাতে  শহরে মুসাফির ও অনাহারি ও নিরন্ন মানুষকে রাতের খাবার পরিবেশনের অনবদ্য গল্প তুলে ধরেন  বগুড়ার আকবরিয়া গ্রুপের উপ মহাব্যবস্থাপক ইকবাল নুর। আর  বগুড়া সদর উপজেলার শশীবদনী গ্রাম থেকে মাদক তাড়িয়ে গোটা গ্রামকে  গার্মেন্টস পল্লী ও কর্মমুখর করার সফলতার গল্প শোনান  তরুণ আশরাফুল ইসলাম।
 বগুড়া শহরের অ্যাডওয়ার্ড পার্কে ভ্রাম্যমান পাঠশালা খুলে চারবছর ধরে পথ শিশুদের বিনাপয়সায় পাঠদানের গল্প  বলেন, আলোর দিশারীর আদিত্য কুমার। প্রায় একই ধরনের উদ্যোগের গল্প বলেন, ভিন্নদৃষ্টির রিংকু রায় ও উত্তমাশার নুসরাত জাহান।
 সোনাতলা উপজেলার দুই তরুণ  রাশেদুজ্জামান এবং  আবু মান্নাফ খান বলেন, গ্রামে গ্রামে ভ্যানচালিত ভ্রাম্যমান লাইব্রেরি নিয়ে ঘুরে বিনাপয়সায় বই বিলানোর গল্প। আর
 বিতর্ক ক্লাবের  মাধ্যমে  সৃজনশীল, মেধাবী ও আলোকিত তারুণ্য গড়ার সফলতার গল্প বলেন সরকারি আজিজুল হক কলেজের পুন্ড্র ডিবেটিং ক্লাবের অরূপ রতন শীল।  বিপন্ন প্রায় শকুনকে বাঁচানোর কর্মকান্ড নিয়ে কাজ করার কথা বলেন পরিবেশকর্মী মিজানুর রহমান।
 সরকারি আজিজুল হক কলেজের দর্শন  বিভাগের শিক্ষক ফজলে বারী  বলেন নিজ এলাকায় বন্য প্রাণী সংরক্ষণে সামাজিক আন্দোলন গড়ার গল্প। আর বস্তির শিশুদের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে আলোকিত করার গল্প বলেন  মৌমাছি খেলাঘরের সভাপতি মাসুদুর রহমান।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সামাজিক আন্দোলন  এবং মানুষকে সচেতন করার নানা উদ্যোগের কথা বলেন নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলসের সহসভাপতি এবং দৈনিক উত্তরের দর্পণের সম্পাদক আবদুস সালাম ।
দুর্যোগে সংকটে নানা মানবিক কর্মকান্ড ও সামাজিক আন্দোলনসহ বছরজুড়ে  প্রথম আলো বন্ধুসভার সৃজনশীল নানা কর্মকান্ডের কথা তুলে ধরেন  বগুড়া বন্ধুসভার  সভাপতি জিয়াউল ইসলাম।
পরিবেশ রক্ষায় কর্মযজ্ঞের গল্প বলেন সরকারি আজিজুল হক কলেজে পরিবেশবাদি সংগঠন তীরের উপদেষ্টা এবং একই কলেজের শিক্ষক শফি মাহমুদ।
ব্যক্তি উদ্যোগে গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান, দরিদ্র মানুষকে  চিকিৎসা সহায়তা প্রদানসহ নানা সামাজিক কর্মযজ্ঞের গল্প বলেন সরকারি আজিজুল হক কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি সুইন চৌধুরী।
  শিল্প  উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী  সৈয়দ আহম্মদ কিরণ শোনান  বিদেশ থেকে আমদানি নির্ভরতা কমাতে  বগুড়ায় ডিজিটাল স্কেল তৈরী এবং এর মাধ্যমে শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরীর গল্প।
স্বেচ্ছাসেবকদের মুখে  অনবদ্য উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প শুনে অভিভূত হয়ে সচেতন নাগরিক কমিটির জেলা সভাপতি মাসুদার রহমান বলেন, ‘ দুর্নীতি,ব্যাংক লুট, অপরাজনীতি ও দুবৃর্ত্তায়নের গল্প শুনতে শুনতে মনটা যখন বিষাদে ভরে যায়; তখন নিরবে নিভৃতে কাজ করা চলা দেশের হাজারো তরুণদের দুর্দান্ত, অনবদ্য ও আলোকিত এসব কাজ দেখে আশার আলো জাগে''
বগুড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহমুদুল আলম তরুণদের নানামুখি কর্মকান্ডের প্রসংশা করে বলেন, তরুণেরা আলোর ফেরিওয়ালা হয়ে স্বেচ্ছায় সমাজে যেসব  কাজ করে চলেছেন, একদিন তাঁরাই দেশটাকে পাল্টে দেবে।’
অনুষ্ঠানে অতিথির বক্তব্যে  কবি ও কথা সাহিত্যিক বজলুল করিম বাহার বলেন, দেশে যখন ভালো কাজ সংকুচিত হচ্ছে ঠিক তখনই তরুণদের এসব ভালো কাজ,আলোকিত কাজ, দুর্দান্ত আশা জাগাচ্ছে। এসব তরুণেরা  পাশে থাকলে বাংলাদেশ জেগে উঠবেই, আঁধার ঠেলে আলো আসবেই।
সরকারি আজিজুল হক কলেজের উপাধ্যক্ষ ফজলুল হক বলেন,আলোকিত কাজ করে চলা এসব তরুণেরাই 'এক টুকরো বাংলাদেশ'।
 সরকারি মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর জোহরা ওয়াহিদা রহমান বলেন, ‘দেশটাকে  হৃদয় দিয়ে ভালবাসতে হবে।  কলেজ ক্যাম্পাসে ফেলা  ময়লা কুড়িয়ে  সমস্যার সমাধান হবেনা। তাতে সারাজীবন ময়লা কুড়ানোতেই পন্ডশ্রম হবে। ময়লা যাতে কেউ বাইরে না ফেলে সেই শেকড়ে কাজ করতে হবে। স্বেচ্ছাসেবার জন্য ইচ্ছে শক্তিই যথেষ্ট। নতুন প্রজন্মের স্বেচ্ছাসেবীরা  এভাবে কাজ করতে থাকলে একদিন বাংলাদেশকে বদলে যাবেই, আলো আসবেই।’
সরকারি শাহ সুলতান কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর শহিদুল ইসলাম বলেন, সমাজ ও দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য স্বেচ্ছাসেবার বিকল্প নেই। স্বেচ্ছাসেবার  মাধ্যমে সমাজকে নাড়া দিয়ে জাগানো যায়, দেশকে পাল্টানো যায়।
 সরকারি আজিজুল হক কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক শাহজাহান আলী বলেন, স্বেচ্ছাসেবা মহান কাজ। মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা অংশ নিয়েছিলেন তাঁরা ছিলেন জাতীর ক্রান্তিকালের  স্বেচ্ছাসেবক।   বগুড়ায় অনেক তরুণেরা  স্বেচ্ছায় অনেক অনবদ্য ও প্রশংসনীয় কাজ করে যাচ্ছে। কেউ রাস্তার আবর্জনা পরিষ্কার করছে, কেউ বস্তির শিশুদের পড়াচ্ছে, কেউ রক্তদান করছে, কেউ পাঠাগার চালাচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবীরা মহান কাজ করলেও তারা সম্মাননা পাওয়ার আশায় এসব কাজ করেন না। তবু ভিএসও-প্রথম আলো স্বেচ্ছাসেবীদের জন্য সম্মাননার যে উদ্যোগ নিয়েছে  সেটি দুর্দান্ত  ভালো উদ্যোগ 
অনুষ্ঠানে প্রথম আলোর ভিডিও চিত্র মাটির মায়া ও ভিএসও ভিডিও, প্রথম আলোর ২০ বছর প্রদর্শন করা হয়।
৩৫ বছর বয়সী যেকোনো স্বেচ্ছাসেবক বা স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ২০১৯ সালে তাঁদের কার্যক্রমের জন্য এই সম্মাননা পাবেন। আবেদন করার তথ্য মিলবে http://prothomalo.com/volunteeraward এই ওয়েব ঠিকানায়।

মন্তব্য