| আলোচনা

করোনাভাইরাস

ঝুঁকি এড়াতে কাগুজে নোটের পরিবর্তে ডিজিটাল পদ্ধতিতে লেনদেন বাড়াতে হবে

সঞ্চিতা তানভির
পঠিত হয়েছে ১৪ বার। প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২০ ।

করোনাভাইস সম্পর্কে আমার লেখার কথা নয়। কারণ আমি কোন চিকিৎসক নই বা জীববিজ্ঞান বিষয়ে আমার বিশেষ কোন জ্ঞানও নেই। কিন্তু সম্প্রতি ইংরেজি দৈনিক ‘ডেইলি স্টার’-এ প্রকাশিত একটি খবরে আমার চোখ আটকে যায়। গত ১১ মার্চ ওই পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে ‘টাকায় করোনা ঝুঁকি, উদ্যোগ নেই বাংলাদেশ ব্যাংকের’ শিরোনামে খবরটি আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। প্রতিবেদনটিতে মূলত টাকার কাগুজে নোট ও ধাতব মুদ্রার হাতবদলকে করোনাভাইস ছড়ানোর অন্যতম মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেহেতু আমি আর্থিক খাতের একজন কর্মী এবং আমার কর্মস্থল বগুড়ায় এরই মধ্যে বিদেশ ফেরত ২ ব্যক্তিকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে সেহেতু এ বিষয়ে কিছু লেখার তাগিদ অনুভব করছি। 
ডেইলি স্টারে প্রকাশিত খবরটি বিশ্লেষণের আগে করোনাভাইরাস এবং এর সংক্রমণের হালনাগাদ কিছু তথ্য আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাই।
COVID2019 (পূর্ণাঙ্গ রূপ হলো- ‘করোনাভাইরাস ডিটেক্টেড ২০১৯) নামে পরিচিত করোনাভাইরাসটির বিস্তার ঘটে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহান প্রদেশে। এরপর ভাইরাসটি আর বসে থাকেনি বরং দেশ থেকে দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী নতুন এই ভাইরাস এরই মধ্যে পৃথিজীজুড়ে লক্ষাধিক মানুষকে সংক্রমিত করেছে। যার মধ্যে চার হাজার তিনশ’রও বেশি জনের মৃত্যু হয়েছে। করোনার দ্রুত বিস্তার দেখেই বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (হু) নতুন এই ভাইরাসের সংক্রমণকে মহামারি বলে ঘোষণা করেছে। 
করোনা আমাদেরও করুণা করেনি। ঢুকে পড়েছে বাংলাদেশেও। সরকারের রোগতত্ত্ব,  রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পক্ষ থেকে গত ৮ মার্চ সংবাদ সম্মেলনে ৩ বাংলাদেশির করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবার কথা জানানো হয়। এরপরই সরকারের পক্ষ থেকে সতর্কতামূলক প্রস্তুতি হিসেবে জনসমাগম এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আর সে কারণেই জাতির জনক বঙ্গন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত পূর্ব ঘোষিত মুজিববর্ষের সমাবেশ স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে।
করোনাভাইসের সংক্রমণ ঠেকাতে দেশে দেশে নানাধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এই লেখা যখন লিখছি তখনই গণমাধ্যমে খবর এল যে, ইউরোপের দেশগুলো থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। অন্যদিকে ভারত সরকার ১৩ মার্চ থেকে এক মাসের জন্য সবধরনের ভিসা স্থগিত করেছে।
দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা বলছেন করোনাভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে নানাভাবে অন্যজনের দেহে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এসবের মধ্যে
TOUCH বা সংস্পর্শ বিপজ্জনক। যেহেতু মানবদেহে করোনাভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণগুলো ১৪ দিনের পূর্বে নিশ্চিত হওয়া যায় না- সে কারণে কখন কে আক্রান্ত হয়েছেন বা হচ্ছেন সেটি তাৎক্ষণিক বলাও যায় না। এ কারণে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে চিকিৎসকরা একে অন্যের সঙ্গে করমর্দন ও কোলাকুলি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। এমনকি দু’জন ব্যক্তির মধ্যে ন্যুনতম ১ মিটার (৩ ফুটের কিছু বেশি) দূরত্ব বজায় রাখারও কথা বলা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে কেনাকাটা বা অন্য প্রয়োজনে টাকা-পয়সার লেনদেন নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
ডেইলি স্টারের ১১ মার্চের প্রতিবেদনে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭ সালের এক গবেষণার কথা জানিয়ে বলা হয়েছে নগদ অর্থ ব্যবহারের মাধ্যমে মলমূত্রের ব্যাকটেরিয়া  থেকে শুরু করে ফ্লু জাতীয় ভাইরাস পর্যন্ত মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে যেতে পারে। এ কারণে কাগজের নোট হাতবদলের মাধ্যমে করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেকগুলো দেশ এরই মধ্যে নানা ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে উহান থেকে কাগুজে নোট আর ধাতব মুদ্রা তুলে নেয় চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অতিবেগুনী রশ্মি এবং উচ্চ তাপমাত্রা ব্যবহার করে নোটগুলো জীবাণুমুক্ত করা হয়। অঞ্চলভেদে ভাইরাসের প্রকোপ বুঝে সাত থেকে ১৪ দিন  কোয়ারেন্টাইনে রেখে আবার নোটগুলো বাজারে ছেড়েছে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একইভাবে দক্ষিণ  কোরিয়াতেও ৬ মার্চ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত ব্যাংক নোট কোয়ারেন্টাইন করে রাখার সিদ্ধান্ত  নেওয়া হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভও করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে একই পন্থা নিয়েছে। কারণ কাগুজে নোটে কয়েকদিন পর্যন্ত ভাইরাস টিকে থাকতে পারে।
করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে গত ২ মার্চ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে স্পর্শবিহীন মাধ্যম বা প্রযুক্তি ব্যবহার করে কেনাকাটা বা লেনদেন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এখানে স্পর্শবিহীন লেনদেন বা প্রযুক্তি বলতে, ব্যাংক নোট ছাড়া অন্য মাধ্যম যেমন এটিএম কার্ড, বিভিন্ন পেমেন্ট অ্যাপ অথবা অন্য কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করে লেনদেনের কথা বোঝানো হয়েছে। 
ডেইলি স্টারের ওই প্রতিবেদনে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেওয়া নানা পদক্ষেপর কথা উল্লেখ করে বলা হয়, বাংলাদেশে নগদ অর্থ ছাড়া অন্য পদ্ধতিতে লেনদেনের পরিমাণ বেশ কম। জাতিসংঘের সংস্থা ‘বেটার দেন ক্যাশ অ্যালায়েন্স’ এর একটি জরিপ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে মোট লেনদেনের মাত্র ছয় শতাংশ ডিজিটাল মাধ্যমে হয়ে থাকে। ‘বেটার দেন ক্যাশ অ্যালায়েন্স’-এর গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ‘পাই স্ট্র্যাটেজি’র ব্যবস্থাপনা সহযোগী পিয়াল ইসলাম ডেইলি স্টারের প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, ২০১৯ সালে ডিজিটাল পদ্ধতিতে লেনদেনের পরিমাণ ১৮ শতাংশ বাড়লেও লেনদেনের সংখ্যা তেমনটা বাড়েনি। গত বছর পাই স্ট্র্যাটেজির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ডিজিটাল পদ্ধতিতে লেনদেনের ৬ শতাংশ কেনাকাটায়, ৭ শতাংশ বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস বিল পরিশোধে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মীদেও বেতন  দেওয়ার জন্য ৫ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়েছে। অর্থাৎ ৮০ শতাংশেরও বেশি লেনদেন হয়েছে সরাসরি ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে নোট হাতবদলের মাধ্যমে। আর বাংলাদেশের অধিকাংশ কাগুজে নোট অন্যান্য দেশের নোটের তুলনায় ময়লা ও অপরিষ্কার।
ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে ৩ ব্যক্তির সংক্রমিত হওয়ার কথা জানিয়ে দেশের কাগুজে নোট ও ধাতব মুদ্রা জীবাণুমুক্ত করণে বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্রুত উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, নগদ অর্থ লেনদেন কমাতে ব্যাংকগুলোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশে করোনাভাইরাস এখনও নিয়ন্ত্রণে আছে। মহামারি পর্যায়ে  পৌঁছানোর আগেই এর প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে পারে।
যা হোক, আমরা আতঙ্ক ছড়াতে চাই না, কাউকে দোষারোপও করতে চাই না বরং সচেতনতা বাড়াতে চাই। কাগুজে নোট ও ধাতব মুদ্রা যে জীবাণুবাহক-এটি নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। যেহেতু দেশের সবকিছুই এখন ডিজিটালাইজড করা হচ্ছে তাই আর্থিক লেনদেনকেও সর্বস্তরে ডিজিটালাইজড করা প্রয়োজন। তা না হলে বর্তমানে করোনাভাইরাস কিংবা ভবিষ্যতে নতুন কোন ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে শুধু আক্রান্ত বা সন্দেহভাজনদের কোয়ারেন্টাইন করে রাখলেই আমরা নিরাপদ থাকবো-এমনটা ভাবা মনে হয় ঠিক হবে না। আশাকরি সরকার এখনই এ ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

 

মন্তব্য