| প্রচ্ছদ

বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী

ধন্য সেই পুরুষ

মুস্তাফিজ শফি
পঠিত হয়েছে ৪২ বার। প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২০ ।

অনেক সময় খানিকটা হালকা চালে বলে থাকি- আমি বাংলাদেশের সমান বয়সী। আমার জন্ম হয়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের বছরে। সেই অর্থে আমরা যারা স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বেড়ে উঠেছি; আমরা যারা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখার সুযোগ পাইনি; তাদের কাছে তিনি বহু বছর ছিলেন এক বিস্ময়ের নাম হয়ে। কী জাদুতে তিনি একটি জাতিকে এতটা ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন? কী সেই সম্মোহনী ক্ষমতা, যার বলে সাড়ে সাত কোটি মানুষ একটি তর্জনীর নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল? কেবল একটি মানুষের কথায় এভাবে কোটি কোটি মানুষের জীবন বাজি রাখার নজির বিশ্বের আর কোথায় আছে?

পরবর্তী সময়ে যখন এই রাষ্ট্র, সমাজ ও জাতির জন্ম এবং বিকাশ পর্বগুলো সম্পর্কে আগ্রহী হয়েছি, তখন বুঝতে পেরেছি বঙ্গবন্ধু নিছক 'জাদু' নন, জাদুবাস্তবতাও নন, বরং রক্ত-মাংসে গড়া এক ইস্পাতকঠিন অঙ্গীকারের নাম। যত দিন গেছে, ক্রমেই এই ধারণায় বদ্ধমূল হয়েছি যে- বঙ্গবন্ধুর সম্মোহনী নেতৃত্ব কোনো আকস্মিকতা নয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের উৎকর্ষ কেবল বাংলাদেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনেও নিহিত ছিল না। তিনি সেই চল্লিশের দশক থেকে, কিংবা গোপালগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতির কথা ধরলে ত্রিশের দশক থেকেই নিজেকে তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন নেতা হিসেবে। তার দেশপ্রেম, তার দূরদর্শিতা, জনগণের প্রতি তার দরদ- সবই একটি সম্ভাব্য জাতিরাষ্ট্রের মহানায়কের আগমনেরই পূর্বাভাস দিচ্ছিল।

দুই.

মনে রাখতে হবে, বঙ্গবন্ধু রাজনীতিতে ধূমকেতুর মতো উদয় হননি। একটি রাজনৈতিক শূন্যতার মধ্যে এসে জায়গা করে নিয়েছেন, এমনও নয়। অবিভক্ত বাংলার কথা যদি বলি- হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর মতো বৃহৎ নেতৃত্বের ছায়ার মধ্যেও তরুণ শেখ মুজিব ঢাকা পড়েননি। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে মহাত্মা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী কিংবা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতো নেতার মধ্যেও ছাত্রনেতা শেখ মুজিব এক বিশিষ্ট অবয়ব। ১৯৪৭ সালের সেই ছবিটি যদি আমরা দেখি, কলকাতায় মহাত্মা গান্ধী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ অন্যরা বসে আছেন, পেছনে দাঁড়িয়ে শেখ মুজিব। অনেকের কাছে লেখকসুলভ কল্পনা মনে হতে পারে; কিন্তু এই আলোকচিত্রটিকে আমার কাছে দারুণ প্রতীকী মনে হয়। মনে হয়, বর্ষীয়ান নেতারা তাদের সোনালি সময় ব্রিটিশ ভারতের মুক্তির জন্য ব্যয় করেছেন। সেই দেশ যখন স্বাধীনতার নামে বিভক্ত হচ্ছে, তখনও তরুণ শেখ মুজিব বসে পড়েননি। তিনি প্রতীকী অর্থেই যেন দাঁড়িয়ে আছেন, ঋজু ভঙ্গিতে, আরেকটি নতুন বাস্তবতার অপেক্ষায়।

অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে আমরা দেখি- দেশভাগের দিন থেকেই বঙ্গবন্ধু নতুন ব্যবস্থাকে 'অসম্পূর্ণ' মনে করছেন। কেবল বাংলার বিভক্তি নয়, স্বাধীনতার মর্মার্থ বিবেচনাতেও। তিনি বলছেন- 'স্বাধীন দেশের জনগণকে গড়তে হলে এবং তাদের আস্থা অর্জন করতে হলে যে নতুন মনোভাবের প্রয়োজন ছিল তা এই নেতৃবৃন্দ গ্রহণ করতে পারলেন না। এদিকে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান মুসলীম লীগকে তাদের হাতের মুঠায় নেবার জন্য এক নতুন পন্থা অবলম্বন করলেন।' (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ৯০)।

পরবর্তীকালে আমরা আরও দেখতে পাই, যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য বঙ্গবন্ধু নিজের তারুণ্য উৎসর্গ করেছিলেন, সেই পাকিস্তানেই তাকে নানা ছুতোয় কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। দেওয়া হচ্ছে দেশদ্রোহের অপবাদ। তখনও বঙ্গবন্ধু একজন উদীয়মান নেতা। বড় নেতারা যখন নানামাত্রিক আপস করে নতুন দেশের পদ-পদবি বাগিয়ে নিচ্ছেন, তখন ক্রমেই গড়ে উঠছে শেখ মুজিবের আপসহীন ভাবমূর্তি। নবাব, খানবাহাদুর, ভূস্বামী, অভিজাত শ্রেণির বাইরের বিপুল জনসাধারণের নেতা হয়ে উঠছেন তিনি। নিজের জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের আশা ও আকাঙ্ক্ষাকে।

'অসমাপ্ত আত্মজীবনী', 'কারাগারের রোজনামচা' কিংবা সদ্য প্রকাশিত 'আমার দেখা নয়াচীন'- বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখনীতে আমরা দেখতে পাই, তিনি ইতিহাসের নানা বাঁক বদলের সাক্ষী কেবল নন, কেবল দৈনন্দিন সংগ্রামের কথা বলছেন না, কেবল নতুন চীনের সঙ্গে নতুন পাকিস্তানের তুলনা করছেন না। এই তিন গ্রন্থের পাতায় পাতায় ফুটে উঠছে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। একটি সুখী, সমৃদ্ধ, সোনার বাংলা গড়ে তোলার আশা। একটি নতুন জাতির জন্মমুহূর্তের বৈভব ও বেদনা। তিনি তখনই স্থিরলক্ষ্য- বিনা সংগ্রামে, বিনা ত্যাগে মুক্তি আসবে না। আর প্রয়োজন নেতৃত্ব। সমাজের ওপরতলা থেকে পাখির চোখে দেশ দেখা নেতা নয়, গণমানুষের সুখ-দুঃখের অংশীদার নেতৃত্ব। এখন, এই একুশ শতকে দাঁড়িয়ে, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের মুহূর্তে আমার মনে হয়, বঙ্গবন্ধু যেন নিজেকেই দেখতে পাচ্ছিলেন তার সামনে ধরা অদৃশ্য আয়নায়।

তিন.

চীন সফরে গিয়ে সে দেশের নেতা মাও সে তুংকে দেখে বঙ্গবন্ধু নিজেই নেতৃত্বের গুণাবলি সম্পর্কে আলোকপাত করছেন- 'এই মাও সে তুং! ৬০ কোটি লোকের নেতা। দেশের লোক এত ভালোবাসে এঁকে! হবেই তো, ত্যাগী, দেশকে ও জনগণকে তিনি ভালোবাসেন বলে জনগণও তাকে ভালোবাসে ও বিশ্বাস করে।' (আমার দেখা নয়াচীন, পৃষ্ঠা ৫৪)।

জনগণকে নেতৃত্ব দিতে হলে ত্যাগের প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি বলেছেন অসমাপ্ত আত্মজীবনীতেও- 'যে কোন মহৎ কাজ করতে হলে ত্যাগ ও সাধনার প্রয়োজন। যারা ত্যাগ করতে প্রস্তুত নয় তারা জীবনে কোন ভালো কাজ করতে পারে নাই- এ বিশ্বাস আমার ছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, এদেশে রাজনীতি করতে হলে ত্যাগের প্রয়োজন আছে এবং ত্যাগ আমাদের করতে হবে পাকিস্তানের জনগণকে সুখী করতে হলে।' (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা ১২৮)।

কারাগারের রোজনামচায় আমরা দেখি বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক দর্শন ও বিশ্বাসের একটি রূপরেখা স্পষ্টাক্ষরে ঘোষণা করছেন। ধ্রুপদি অর্থে তিনি কমিউনিস্ট না হয়েও শোষক ও শোষিতের চিরন্তন সংগ্রামের ব্যাপারে তার দৃঢ় উপলব্ধির কথা বলছেন। বলছেন- 'শোষক ও শোষিতের মধ্যে সংগ্রাম হয়েই থাকে এবং হবেও। শোষকদের কোনো জাত নাই, ধর্ম নাই।' (কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা ১৮৭)।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতি যদি আমরা দেখি, দেখতে পাই গভীর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে গড়ে তুলছেন শোষকের বিরুদ্ধে নিরলস নেতা হিসেবে। জেল, জুলুম, হুলিয়া সত্ত্বেও তিনি মানুষের মুক্তির মন্ত্র ছড়িয়ে যাচ্ছেন মানুষের মধ্যেই। নিজে প্রস্তুত হচ্ছেন, জাতিকে প্রস্তুত করছেন স্বাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য। সেই ১৯৫২ সালে, স্বাধীনতা সংগ্রামের দুই দশক আগে, চীনে গিয়ে তিনি নিজের পরিচয় যেভাবে দিচ্ছেন, তা কেবল কৌতূহল উদ্দীপক নয়, কান্তার মরু পাড়ি দেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ও। বঙ্গবন্ধু লিখছেন- 'আমার আবার পরিচয়? পথে পথে ঘুরে বেড়াই, বক্তৃতা করে বেড়াই। আর মাঝে মাঝে সরকারের দয়ায় জেলখানায় পড়ে খোদা ও রসুলের নাম নেবার সুযোগ পাই। এই তো আমার পরিচয়।' (আমার দেখা নয়াচীন, পৃষ্ঠা ৭৩)।

আমরা এখন জানি, দেশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত ঘুরে বেড়িয়ে বঙ্গবন্ধু আসলে যেমন নিজেকে চেনাচ্ছিলেন, তেমনই চিনছিলেন ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই সবুজ জমিন ও তার রক্তিম ভবিষ্যৎকে। তিনি হয়ে উঠছিলেন বাঙালি জাতির বিশ্বাস ও আস্থার প্রতীক। হয়ে উঠছিলেন জাতির পিতা। হাজার বছরের বাঙালি জাতির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নিজস্ব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট তৈরি করছিলেন। কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তিরও প্রেক্ষাপট তৈরি করছিলেন নিজের জীবনের সোনালি সময়গুলো ব্যয় করে।

বলা বাহুল্য, বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ ও সংগ্রাম বৃথা যায়নি। তার নেতৃত্বে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল বিস্ময় ছড়িয়ে। বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বের অন্যান্য স্বাধীনতাকামী জাতিরও অনুপ্রেরণার নাম, মুক্তির মন্ত্র।

চার.

দুর্ভাগ্য আমাদের, যে স্বপ্নের সোনার বাংলা বঙ্গবন্ধু গড়তে চেয়েছিলেন, সেই সময় তিনি পাননি। সারাজীবন তিনি যে রাষ্ট্রের জন্য লড়াই করেছেন, তার পূর্ণাঙ্গ রূপ তিনি দিয়ে যেতে পারেননি। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত ঘটনার মধ্য দিয়ে কেবল শারীরিকভাবে বঙ্গবন্ধুকে আমরা হারাইনি; গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক মুক্তির সুমহান আদর্শগুলোও ভূলুণ্ঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশ যাত্রা করেছিল পেছনের দিকে, অন্ধকারের অভিমুখে। একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত যে মুক্তির আলো আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে দিয়েছিল, ঠিক তার উল্টো পথে। বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারবর্গের হত্যাকাণ্ডের বিচার করা যাবে না- এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত সংবিধানে যুক্ত করা হয়েছিল সেই বর্বরোচিত দায়মুক্তি বা কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ। সংবিধানে যখন এমন বিচারহীনতার ধারা থাকে, গোটা দেশ তখন অবিচারে নিমজ্জিত না হয়ে পারে? একের পর এক পুনর্বাসিত হচ্ছিল যুদ্ধাপরাধী ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা। আর এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে সময় লেগেছিল দীর্ঘ একুশ বছর। রক্ত ঝরেছিল। খালি হয়েছিল অনেক মায়ের বুক।

বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চার মেয়াদের নেতৃত্বে পশ্চাৎমুখী যাত্রা কেবল রুদ্ধ হয়নি, বাংলাদেশ এগিয়ে চলছে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে। কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করে বঙ্গবন্ধুর খুনিচক্রের বিচার সম্ভব হয়েছে। সম্ভব হয়েছে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও। বাংলাদেশে এখন আর বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে না।

শারীরিকভাবে অনুপস্থিতি সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু কিন্তু এখনও আমাদের প্রতিদিনের অঙ্গীকারের নাম। তার অনির্বাণ জীবন ও কর্ম এই দেশ ও জাতির অনিঃশেষ প্রেরণার উৎস। আমার কাছে বঙ্গবন্ধু একটি নদীর নাম। যে নদী অবিরাম বয়ে চলেছে আমাদের ধমনিতে। আর তাগিদ দিচ্ছে একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত, অগ্রসর রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার। এই আদর্শ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই জীবনব্যাপী কাজ করে গেছেন জাতির পিতা। আমাদেরকে বারবার সেখানেই ফিরে যেতে হবে। সেই আদর্শকে বুকে ধারণ করতে হবে।

স্বাধীন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- 'এ স্বাধীনতা আমার ব্যর্থ হয়ে যাবে যদি বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত না খায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এ স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এদেশের মানুষ যারা আমার যুবক শ্রেণি আছে তারা চাকরি বা কাজ না পায়।'

রাজনৈতিক মুক্তির পর আমরা যদি অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি অর্জন করতে চাই, তাহলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আঁকড়ে ধরার বিকল্প নেই। স্বীকার করতেই হবে, এ দেশে অনেক অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে। এও অস্বীকার করা যাবে না যে, একই সঙ্গে বেড়েছে বৈষম্যও। আর সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প তো রয়েছেই। এই সময়ে তাই বঙ্গবন্ধু আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। আরও বেশি জরুরি। অর্থনৈতিক মুক্তি সুষম করতে হলে, সাধারণ মানুষকে বৈষম্যের জাল থেকে মুক্তি দিতে হলে আমাদের অগ্রসর হতে হবে বঙ্গবন্ধুর প্রদর্শিত শোষণমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথেই। তাই এখন আরও বেশি প্রয়োজন তার জীবন, কর্ম, আদর্শ ও চিন্তাভাবনা চর্চা করার। মুজিব জন্মশতবর্ষ আমাদের সামনে সেই তাগিদ নিয়েই হাজির হয়েছে।

পাঁচ.

ব্যক্তিগতভাবে বঙ্গবন্ধু আমার আশৈশব আগ্রহের নাম। কলেজজীবনে ছাত্রলীগের প্রতি আমাকে আকৃষ্ট করেছিল এই মহান নেতার আদর্শই। নিছক স্লোগানে নয়, বঙ্গবন্ধুকে আমি পাঠ করতে চেয়েছি জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের নিরিখে। বিভিন্ন সময়ে তার বক্তব্য, সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপসমূহ তাই আমি গভীর অভিনিবেশ সহকারে বুঝতে চেয়েছি। সাংবাদিকতার প্রায় তিন দশকে পেশাগত ব্যস্ততার বাইরেও যেখানে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে যা পেয়েছি, তা সংরক্ষণ করতে চেয়েছি সেই তাগিদ থেকেই। সম্পাদক হিসেবে দৈনিক সমকালের সম্পাদকীয় নীতিতে বঙ্গবন্ধু এক বাতিঘরের নাম। দেশ ও জাতির অভিমুখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনিই আমাদের ধ্রুবতারা। বস্তুত অতীতের বাংলাদেশকে যদি জানতে চাই, বর্তমানের বাংলাদেশকে যদি বুঝতে চাই, ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে যদি দেখতে চাই- বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের চেয়ে বড় আকরগ্রন্থ আর কী হতে পারে?

সন্দেহ নেই, গত কয়েক বছরে বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখা ডায়েরি থেকে প্রকাশিত তিনটি গ্রন্থ তাকে চেনার কাজটি সহজ করেছে। কিন্তু তার আগের পাঁচ দশকেও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। সামরিক, আধা-সামরিক শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তাকে নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে প্রবন্ধ, নিবন্ধ, স্মৃতিকথা। গান, কবিতা, গল্প, চিত্রকর্মেও বঙ্গবন্ধু আমাদের সামনে নতুন নতুন মাত্রা নিয়ে হাজির হয়েছেন। মুজিববর্ষে আরও অনেক গবেষণা হবে। আমাদের সামনে উন্মোচিত হবে নতুন নতুন অনেক তথ্য। এই সবকিছুর মধ্য দিয়েই আমরা বঙ্গবন্ধুকে, জাতির পিতাকে বুকে ধারণ করব। তার স্বপ্নের সোনার বাংলার লাল-সবুজ পতাকাকে ঊর্ধ্বে ধরে সামনে এগিয়ে যাব।

লেখক: দৈনিক সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক।

 

মন্তব্য