| প্রচ্ছদ

এক গণসঙ্গীত শিল্পীর কথন

ফরহাদুজ্জামান শাহী
পঠিত হয়েছে ৫১ বার। প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২০ ।

নাম তার সম্পদ কুমার পোদ্দার। বগুড়ার প্রথিতযশা গণসঙ্গীত শিল্পী হিসেবে সুপরিচিত। বেড়ে উঠেছেন পুরো সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে। সজ্ঞীতজ্ঞ বাবা স্বর্গীয় ওস্তাদ শৈলেন্দ্রনাথ পোদ্দার অনেককে গান শেখাতেন নামমাত্র অর্থের বিনিময়ে। কেউ টাকা না দিলেও তাকে শেখাতে কার্পণ্য করতেন না। ফলে সংসারে অভাব লেগেই থাকত। নীতি-নৈতিকতায় ওস্তাদ শৈলেন্দ্রনাথ পোদ্দার ছিলেন আদর্শস্থানীয়। তাঁর শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরে নাম করেছেন প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী আঞ্জুমান আরা বেগম, রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সেলিমা মালেক চৌধুরী, চিত্রপরিচালক নাজমুল হুদা মিঠু, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্ণর লুৎফর রহমান, বগুড়া ইয়্যুৎ কয়্যারের প্রতিষ্ঠাতা তৌফিকুল আলম আলম টিপু প্রমুখ। বড়ভাই ওস্তাদ গুরুদাস পোদ্দারেরও জেলাজুড়ে খ্যাতি আছে সঙ্গীত শিক্ষক হিসেবে। পরিবারের সবাই ছিলেন বাবার আদর্শ অনুসারে। না খেয়ে থাকলেও কারো কাছে কখনো হাত পাতেননি।  দরিদ্র এ পরিবারের ৯ ভাই বোনের মধ্যে ৫ম সন্তান সম্পদ ছিলেন সবার চোখেরমণি।

কিন্তু হঠাৎ কালবৈশাখি নেমে আসে সম্পদদের পুরো পরিবারের উপর। শিববাটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৫ম শ্রেণীতে পড়ার সময়ই ১৯৭৮ সালে মধ্য কাটনারপাড়ার পৈত্রিকভিটা থেকে এনিমি প্রোপার্টির দোহায় দিয়ে প্রভাবশালীদের দ্বারা সপরিবারে উচ্ছেদ হন। প্রশাসনও সহায়তা করে প্রভাবশালীদের। খোলা আকাশের নিচে কাটে তাদের দিনরাত। পরে অস্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন শাজাহানপুর উপজেলার ডেমাজানী এলাকায়। পরে সবাই বিক্ষিপ্তভাবে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছেন। সম্পদও শহরতলীর গন্ডগ্রামে একটি মাটিরঘরে আশ্রয় নিয়েছেন।

একই পরিণতি ঘটেছিল আরো অনেক পরিবারের ললাটে। পড়তে হয়েছিল তাদেরকে অনাবিল দুঃখের সাগরে। চারিদিকে শুধু অভাব-অনটন আর দুঃখ-কষ্ট। নব্য সৃষ্ট বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশায় এই কুঠারাঘাত মেনে নিতে পারেননি সম্পদ। সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বেড়ে উঠা সম্পদ সমাজের স্বার্থপরতা, নীতিহীনতা ও নৈতিকতার অভাবের বিষয়টি ফুটিয়ে তোলেন তার গানে। রাজনীতি সচেতন এই মানুষ তখনই গণআন্দোলনে সরাসরি জড়িত হয়ে পড়েন। মাঠে-ময়দানে, কলে-কারখানায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গড়ে ওঠা বিভিন্ন আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। শোষণের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের লড়াই করতে উদ্বুদ্ধ করতে গান লিখেছেন। প্রচারবিমুখ মানুষটি এ পর্যন্ত শতাধিক গণসঙ্গীত লিখেছেন, যা সারাদেশে শোষিত জনশ্রেণীর মাঝে ব্যাপক শ্রোতাপ্রিয়তা পেয়েছে। বয়স এখন ৬০ এর কাছাকাছি। এ বয়সেও চেষ্টা করছেন গণসঙ্গীতকে নিজের মাঝে লালন করে এদেশের সংস্কৃতিতে তা বিলিয়ে দিতে। একইসাথে শ্রমিক অধিকার সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করতে।

তারমতে গণসঙ্গীত হল জীবনের গান। এর সাথে অন্য গানের তুলনাই হয় না। এই বিশ্বাস থেকেই গনসঙ্গীতের প্রতি মুগ্ধতা তৈরি হয়। তবে অভাবের সংসার তার পিছু ছাড়েনি। সংসারের আয় না থাকলেও বাড়তে থাকে খরচ। বড় মেয়ে সরকারি মজিবর রহমান মহিলা কলেজে আর ছোট মেয়ে ডেমাজানি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ছেন। অথচ কয়েকবছর ধরেই বিনা চিকিৎসা আর অবহেলায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন এই শিল্পী। যে কারণে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছেন যে, মাঝে মাঝে ঘর থেকে বের হতে পারেন না। এমতবস্থায় তার স্ত্রী, দুই কন্যাসহ পুরো পরিবার এখন বিপদগ্রস্ত। তিনিই পরিবারের একমাত্র রোজগারের মানুষ। অসুস্থ হয়ে অধিকাংশ সময় ঘরে পড়ে থাকায় ঠিকমতো তিনবেলা খাবারও জুটছে না। বাধ্য হয়ে স্ত্রীকে কাজ নিতে হয়েছে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে। সংসার চলছে কিছু মানুষের আর্থিক সহায়তায়। দুঃস্থ শিল্পীদের জন্য সামান্য সরকারি সহযোগিতা পান প্রতিবছরে মাত্র একবার। সেটুকু দিয়েই বেচে আছেন গণসঙ্গীতের মতই ধুকে ধুকে।

গুণী এই শিল্পী আজ গুরুতর অসুস্থ হয়ে সাহায্যের জন্য সবার কাছে হাত বাড়িয়েছেন। সবার সহায়তা পেলে চিকিৎসা করে আবার সুস্থ হয়ে উঠবেন সম্পদ। অসুস্থ গণসঙ্গীত শিল্পী সম্পদের পাশে দাঁড়ানোর এখনই সময়। তাহলে সেই সম্পদ আবার মজলুম মানুষের গান ধরবেন খোলা ময়দানে, হাজারো শ্রোতার মধ্যে। তার সংসারে আসবে স্বচ্ছলতা। এ স্বপ্ন এখনো দেখেন সম্পদ।

লেখকঃ 

বগুড়া জেলা প্রতিনিধি
চ্যানেল 24

মন্তব্য