| বিশেষ

বিপ্লবী এবিএম শাহজাহান

সাজিয়া আফরিন সোমা
পঠিত হয়েছে ১৮২৪ বার। প্রকাশ: ২৩ মে ২০১৮ । আপডেট: ২৩ মে ২০১৮ ।

এবিএম শাহজাহান। একটি নাম, একটি আদর্শ। একাধারে তিনি ছিলেন চিন্তাবিদ,রাজনীতিবিদ, মুক্তিযোদ্ধা, জনপ্রতিনিধি এবং সর্বোপরি আদর্শ একজন মানুষ।  তাঁর সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি? বিশেষত এ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের ক'জন এবিএম শাহজাহানকে চেনেন? একজন মেধাবী ছাত্রও যে মানুষের কল্যাণে রাজনীতিতে জড়াতে পারেন, একটি আদর্শের জন্য লড়তে পারেন, দেশের স্বাধীনতার জন্য  অস্ত্রহাতে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে পারেন- সেটি প্রমাণ করে গেছেন এবিএম শাহজাহান।

১৯৪৭ সালের আগষ্ট মাসে বগুড়া জেলার তালোড়ার বেলঘড়িয়া গ্রামে এবিএম শাহ্জাহান জন্মগ্রহণ করেন। বাবা নুরুল হুদা ছিলেন স্কুল শিক্ষক।  দৃঢ় মনোবল নিয়ে তিনি তাঁর আদর্শে সব সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেন।  মেয়ে বা ছেলেতে বিভেদ করেননি কখনও। মা আবেদা খাতুনের জন্ম আলতাফ নগরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। অপরূপ সুন্দরী অত্যন্ত রুচিশীল এবং বুদ্ধিমতীও ছিলেন। তিনি বিয়ের পরও কিছুদিন নিজের পড়াশুনা চালিয়ে গিয়েছিলেন। বাবা- মা'র দশ সন্তানের মাঝে এবিএম শাহ্জাহান ছিলেন ষষ্ঠ। তিনি ছোট বেলা থেকেই ভীষণ দুরন্ত ছিলেন।  তাঁর দুরন্তপনায়র সায় দেওয়ার জন্য মাঝে মাঝেই বাবার কাছে তিন এবং তাঁর বড় ভাই এক বিশেষ শাস্তি পতেন।  শীতকালে একগলা পানিতে নামিয়ে রাখতেন আর গরমকালে কান ধরে রোদে দাঁড়িয়ে রাখতেন। তবে বাবার দেয়া শাস্তিতেও দুই ভাইয়ের দুরন্তপনা এতটুকুও কমতো না। এবিএম শাহ্জাহান তালোড়া আলতাফ আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু করেন।  

ছাত্র জীবন থেকেই তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। ১৯৬৩ সালে রাজশাহী বোর্ড থেকে এসএসসি পাশ করেন। তৎকালীন সময় রাজশাহী বোর্ডে ছয় জন প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন তিনি সেই ছয়জনের একজন।  এরপর  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হতে কেমিষ্ট্রিতে অনার্স ও মাষ্টার্স শেষ করেন এবং রাজনীতিতে জড়িয়ে পরেন। ১৯৭৩ সালে সরকারি কর্মকর্তা হাফিজা খাতুনের (পরবর্তিতে পরিকল্পনা মন্ত্রনালয়ের যুগ্মসচিব হিসেবে অবসর নেন) সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এবিএম শাহ্জাহান ছিলেন রাজনীতি সচেতন মানুষ। তিনি তাঁর জীবনের বেশীর ভাগ সময় মানুষের জন্য ব্যয় করেছেন। সাধারন মানুষের পাশে কাটিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জনের পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে চাকুরীর সুযোগ পাবার পরেও তিনি তা ফিরিয়ে দিয়েছেন। রাজনীতি আর সাধারণ মানুষের পাশেই তিনি থাকতে চেয়েছেন। অন্যায়ের প্রতিবাদ করে গেছেন সবসময়।  সমঅধিকার আর ন্যায় বিচারের স্বপ্ন দেখেছেন সারাজীবন। তাইতো সাধারণ মানুষও তাকে প্রচণ্ড ভালবাসতেন।

এবিএম শাহ্জাহানের জীবনের সবচেয়ে বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান অপরিসীম। বীর যোদ্ধা শাহজাহানের মুক্তিযুদ্ধকালীন লড়াইয়ের কাহিনী আজও বগুড়া বিশেষত পশ্চিম বগুড়ার মানুষের মুখে মুখে। তিনি যুদ্ধকালীন মুজিব বাহিনীর বৃহত্তর বগুড়ার কমান্ডার ছিলেন। যুদ্ধের একেবারে শুরুতেই তিনি ভারতে চলে যান এবং দেরাদুনের তান্দুয়া কাম্পে প্রশিক্ষণ নিয়ে সম্মুখ সমরে যোগ দেন। 

এবিএম শাহ্জাহানের নেতৃত্বে পরিচালিত সেই অপারেশনগুলো: কাহালুর পাঁচপীর মাজার সংলগ্ন রেলের ব্রীজ উড়িয়ে দেওয়া।  ওই অপারেশনের সময় তাঁর নির্দেশে একটি গ্রুপ ব্রীজের পাহারায় নিয়োজিত  রাজাকার ক্যাম্প লক্ষ্য করে ফায়ার শুরু করেছিলো। সেই যুদ্ধে শাহজাহানের বাহিনীর কাছে রাজাকাররা টিকতে না পেরে লেজ গুটিয়ে পালিয়ে যায়। 

এবিএম শাহজাহানের নেতৃত্বে পরবর্তীতে দুপচাঁচিয়া থানা আক্রমণ করা হয়।  রাত তখন ১০ টা। বিশাল বাহিনী অপারেশনের জন্য প্রস্তুত। জেলা কমান্ডার এবিএম শাহ্জাহান এবং ডেপুটি কমান্ডার হোসেন আলী এই অপারেশনের মূল দায়িত্বে ছিলেন।  এবিএম শাহ্জাহানের নেতৃত্বে তালোড়া-দুপচাঁচিয়া রাস্তার পাশে অ্যাম্বুস করা হয়।  সেখান থেকে সেনা আর রাজাকারদের টহল দেখা যাচ্ছিলো। শত্রুরা তখন রেঞ্জের ভিতর।  দলনেতা ফায়ার বলতেই একসাথে সবাই ফায়ার শুরু করে। শত্রুর দিক থেকে পাল্টা ফায়ার শুরু হয়। এই সময় দুইটি সেল এসে পড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর।  সেই যুদ্ধেও মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়ী হন। 

১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে কড়িমামুজায় একই ভাবে এবিএম শাহ্জাহানের নেতৃত্বে পুরো দলটি পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।  তাঁর নেতৃত্বে কাহালু রেল ষ্টেশনের পূর্বে রেলের ব্রীজে রাজাকারদের ক্যাম্প তছনছ এবং শিকড় গ্রাম যুদ্ধ করেন মুক্তিযোদ্ধারা।  বরাবরই এই যোদ্ধা কখনও লাইনের সামনে, কখনও লাইনের মাঝে আবার কখনও লাইনের পেছনে থেকে বিচক্ষণতা এবং সতর্কতা অবলম্বন করে বিশাল গেরিলা দলকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন।  (তথ্য সুত্র:গেরিলা জবানবন্দি ও পশ্চিম বগুড়ার রণাঙ্গনে নয় মাস) যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে রাজাকারদের বিরুদ্ধেও  সোচ্চার ছিলেন।   যার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর নিজ এলাকার রাজাকারদের জনসম্মুখে আনার ঘটনার মাধ্যমে।  যা এখনও মানুষ মনে রেখেছে।

এবিএম শাহজাহান জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সমাজতন্ত্রের আদর্শে দীক্ষা নিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখতেন শ্রেণীবিহীন শোষণবিহীন একটি সমাজ গড়ে তোলার। এ লক্ষ্যে অনেক কষ্ট এবং ত্যাগও স্বীকার করেছেন তিনি।  বগুড়া-৩ (দুপচাঁচিয়া-আদমদীঘি) আসনে দু'বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হনএবিএম শাহজাহান। একবার  ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৫ দলীয় জোটের মনোনয়নে এবং পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে এরশাদের জাতীয় পার্টি থেকে। জাতীয় পার্টিতে যোগদানের দুই বছরের মাথায় ১৯৯০ সালের গোড়ায় তিনি পাট প্রতিমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন।  এ সময় তিনি বগুড়ার সান্তাহার কলেজ এবং তালোড়া শাহ্ এয়তেবাড়িয়া কলেজকে সরকারিকরণ করেন।  এছাড়া তালোড়ায় তিনি একটি টেলিফোন এক্সচেঞ্জও প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের আগে তিনি জনতা ব্যাংকের পরিচালক, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করেন।  ১৯৯০ পরবর্তী সময়ে তিনি জাতীয় পার্টির মহাসচিব হন।  ২০০৪ সালে তিনি জাতীয় পার্টি থেকে পদত্যাগ করেন এবং রাজনীতি থেকেও অবসর গ্রহণের ঘোষণা দেন।  

শেষ দিনগুলোতে এই যোদ্ধা অসুস্থতা নিয়ে কাটিয়েছেন। তারপরেও তিনি তাঁর প্রিয় এলাকা আর মানুষদের থেকে দূরে থাকতে চান নি। তাই অসুস্থ অবস্থায়ও তিনি বেশীর ভাগ সময় তাঁর প্রিয় গ্রামে তাঁর সহযোদ্ধা আর বন্ধুদের সাথে কাটিয়েছেন। সবার সাথে কথা বলে, গল্পে পার করেছেন তাঁর সময়।  এই সময়গুলোতো কখনও সহধর্মিনী কখনও বা সন্তান আবার কখনও কাছের মানুষ তাঁর পাশে থেকেছেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর এই বীর যোদ্ধা গত ৮ মে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। সেই চীরচেনা পথ ধরে সবুজে ঘেরা তাঁর প্রিয় গ্রামেই ফিরে গেছেন। হাজারো মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালবাসা এবং রাষ্টীয় সম্মানের (গার্ড অব অনার) মাধ্যমে পারিবারিক কবরস্থানে দাফনের সাথে যেনো শেষ হয়ে গেলো একটি অধ্যায়।  

এবিএম শাহ্জাহানের ৩ সন্তানের মাঝে সবার বড় হাফিজুল আদিত। বাবা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন,“বিপ্লবী সমাজতন্ত্রের আদর্শে উজ্জীবিত আমার বাবা সারাজীবনই সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। এলাকার সাধারণ মানুষ তার প্রাণ ছিল এবং তাদের জন্য তিনি নিঃস্বার্থভাবে শ্রম দিয়েছেন।  তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি এক বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং আদর্শিক বিপ্লবী।   এদেশের স্বাধীনতা এবং আদর্শিকতার ভিত্তির অন্যতম কান্ডারী এবং রূপকার। তার মতো মানুষ লাখে-নিযুতে একটিই জন্মায় এবং তার মতো আদর্শবান অদম্য সাহসী বীরোচিত মানুষের গল্পই শেষ পর্যন্ত রয়ে যাবে যুগ যুগ ধরে মানুষের মুখে-গল্প-উপন্যাসে। হয়ত একসময় নামবিহীন, তাতে কি! আর আমাদের অনুপ্রেরনা যোগাবে উন্নত মানুষ হবার, তৈরী করবে নতুন উন্নত নেতৃত্ব।"

মন্তব্য