| প্রচ্ছদ

করোনায় তারাবীর নামাজ অনিশ্চিতঃ ৫ লক্ষাধিক হাফেজের কি হবে?

অধ্যাপক ড. মোহা. হাছানাত আলী
পঠিত হয়েছে ১৩৭ বার। প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২০ ১৭:৫৫:৪২ ।

বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই মসজিদ আছে। এমনকি কোন কোন গ্রামে একাধিক মসজিদও আছে। তাদের মধ্যে কোনটি প্রয়োজনে, আবার কোন কোন ক্ষেত্রে তা গোষ্ঠীগত বিরোধের কারণে স্থাপিত।
দেশে আসলে বর্তমানে কতটি মসজিদ আছে, তা এখনও জানা সম্ভব হয়নি। ঢাকাকে বলা হয় মসজিদের শহর। লেখাটি লেখার আগে গুগুল সার্চে গেলাম। ২০১৮ সালের পর আর কোন আপডেট তথ্য পেলাম না।
গুগুল’র দেয়া তথ্যানুসারে, ২০১৮ সালের ১৯শে ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনে সরকারি দলের সংসদ সদস্য জনাব শেখ মো. নুরুল হকের প্রশ্নের উত্তরে তৎকালীন ধর্মমন্ত্রী জনাব মতিউর রহমান মহান সংসদে যে তথ্য দেন, সে অনুসারে দেশে মসজিদের সংখ্যা ছিলো ২ লাখ ৫০ হাজার ৩৯৯টি।
গুগুলে আর কোন আপডেট না পেয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সচিব জনাব কাজী নুরুল ইসলামের মোবাইলে ফোন করে দেশের মোট মসজিদের সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি জানালেন, বর্তমানে দেশের মোট মসজিদের সংখ্যা ৩ লক্ষাধিক। তিনিও প্রকৃত কোন সংখ্যা না দিতে পারার কারণে যা দাঁড়ালো তাতে করে দেশে বর্তমানে কতটি মসজিদ চালু আছে, তা অজানই রয়ে গেল। তবে ভদ্রলোকের বিনয়ী আচরণ আমাকে মুগ্ধ করেছে। এদিকে বর্তমানে দেশে সরকারী অর্থায়নে আরও ৫৬০টি মসজিদ কাম সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প চলমান রয়েছে।
এখন আসি আসল কথায়। এই মুহুর্তে সারাবিশ্ব মরণব্যাধি করোনার কারণে লকডাউন। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এদিকে মহিমান্বিত ইবাদতের মাস মাহে রমজান ঘরবন্দী মুসলমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। যে রোজার পুরস্কার স্বয়ং আল্লাহতায়ালা রোজাদারকে প্রদান করবেন মর্মে নিজে ঘোষণা করেছেন।
এক মাস রোজা পালন মুসলমানদের জন্য এক মহাপবিত্র ইবাদত হিসেবে বিবেচিত। আর রোজাকে কেন্দ্র করে দেশের সকল মসজিদে উৎসবের আমেজে তারাবীহ নামাজ আদায় করা হয়। দেশের প্রায় তিন লক্ষাধিক মসজিদের অধিকাংশেই খতম তারাবীহ পড়ানো হয়। মুসুল্লিরা সমবেতভাবে দু'জন হাফেজের ইমামতিতে কোরআন খতম করার মানসে সারা মাস তারাবীহ’র নামাজ আদায় করে থাকেন।
দেশের সকল মসজিদে খতমে তারাবীহ হয়, তা কিন্ত নয়। তবে আজকাল গ্রামাঞ্চলেও খতম তারাবীহ অনুষ্ঠিত হয়। সে হিসেবে দেশে কমবেশি ৫ লক্ষ হাফেজের প্রয়োজন হয় সুষ্ঠুভাবে মাসব্যাপী তারাবীহ নামাজ আদায় করার জন্য। কিন্তু তাদের কোন প্রাতিষ্ঠানিক চাকরি নেই।
দেশে মোট হাফেজের সংখ্যা কতো, তা গণনা করার কোন স্বীকৃত সংস্থাও নেই। তাই কোরআনে হাফেজদের প্রকৃত সংখ্যাটা জানাও বেশ দূরহ ব্যাপার। তবে সংখ্যাটা যাই হোক না কেন, হাফেজগণ সারা বছর কোরআন চর্চা করে থাকেন এই মাহে রমজানকে কেন্দ্র করে। তারাবীহ’র নামাজের প্রস্ততি নিতে তাদের এই চর্চা অব্যাহত থাকে সারা বছরব্যাপী।
কিন্ত এবারের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। দেশে মহামারী করোনা। আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ও মৃত্যুর মিছিল দিনদিন লম্বা হচ্ছে। মুসল্লিরা আসন্ন তারাবীহ’র নামাজ মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে উৎসবের আমেজে আদায় করতে পারবেন, এমন কোন সুসংবাদ এখনও দেশে নেই।
গত ৬ এপ্রিল ২০২০ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম মন্ত্রনালয়ের সমন্বয় অধিশাখা কর্তৃক ইস্যুকৃত পত্র নং ১৬.০০.০০০০.০০১.২১.০০৩, ২০২০-১৪৮ এর ৪/১ ধারা অনুসারে ওয়াক্তিয়া নামাজে ইমাম ও মোয়াজ্জিন সহ ৫জন, আর জুম্মা’র নামাজে ইমাম ও মোয়াজ্জিন সহ সর্বমোট ১০ জন মুসুল্লি জামাতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন বলে বলা হয়েছে।
সরকার ও ইসলামী ফাইন্ডেশন ইতোমধ্যেই মুসুল্লিদেরকে নিজ নিজ বাসায় তারাবীহ নামাজ আদায় করার জন্য অনুরোধ করেছেন বা নির্দেশনা জারি করেছেন। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে করোনা রোধ কল্পে এ সিদ্ধান্ত অত্যাবশ্যকীয় ছিলো। আশা করি দেশবাসী বিশেষ করে গ্রামের মুসুল্লিরা তা মেনে চলবেন।
এটা তো জানা কথা যে, করোনা চিকিৎসার কোন মেডিসিন এখনও পৃথিবীর কোন বিজ্ঞানী আবিস্কার করতে পারেননি। করোনা চিকিৎসায় বিশ্ববাসীর বহুল প্রত্যাশিত 'ভ্যাকসিন' আক্রান্ত মানুষের জীবন রক্ষার্থে কবে বাজারে আসবে, তাও কেউ জানে না।
যে কথা বলছিলাম। করোনা গোটা বিশ্বব্যাবস্থাকে লন্ড-ভন্ড করে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতি বিশ্ববাসীর কল্পনাতেও ছিলো না। বিশ্ববাসী এখন প্রতিদিন করোনামুক্ত সকাল দেখার আশায় ঘুমাতে যায়।
রাজধানীবাসী এবার রমযানে প্রথমবারের মতো পুরান ঢাকা ও বেইলী রোডের বাহারী ইফতারি'র স্বাদ থেকে বঞ্চিত হবে। রমযান মাসে ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহর, এমনকি গ্রামাঞ্চলের অনেক মসজিদে গরীব খেটে খাওয়া রোজাদারদের মধ্যে ইফতার বিতরণ করা হতো। এবার হয়তো তা আর সম্ভব হবে না। বঞ্চিত হবে সমাজের অস্বচ্ছল মানুষগুলো।
রোজার মাসে বাংলাদেশসহ বিশ্বের লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ মুসলমান ওমরাহ পালনের উদ্দ্যেশে পবিত্র মক্কা ও মদিনায় গমন করেন। মানুষ ক্বাবা ঘর তোয়াফ করছে না, এ দৃশ্য বিশ্বমুসলিমদের জন্য হৃদয়বিদারক। নবীজির রওজায় মসজিদে নববীতে বিশ্ববাসী একসাথে বসে ইফতার করতে পারবে না, তা বিশ্ব কি কোনদিন স্বপ্নেও ভেবেছিল? সেটাও আজ সত্য হতে চলেছে।  করোনা গোটা বিশ্বব্যাবস্থাকে তছনছ করে দিয়েছে। কবে তা আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে, তা এই মুহুর্তে কেউ বলতে পারছে না।
এবার আসি আসল কথায়। যে কারণে এ লেখার অবতারণা। তা হলো, এবার কমবেশি প্রায় ৫ লক্ষাধিক কোরআনে হাফেজ বেকার হয়ে যাবেন। কেন বলছি? কারণ, হাফেজ সাহেবদের অধিকাংশই সারা বছর এই পবিত্র মাসটির জন্য অপেক্ষা করেন দু'টি কারণে। এক. তাদের কোরআন চর্চাটা জারি রাখার জন্য। অন্যটি বাড়তি কিছু আয়ের জন্য।
২৭শে রমজান কোরআন খতম হয়ে যায়। আর সেদিন মুসুল্লিরা খুশি চিত্তে হাফেজ সাহেবদেরকে হাদিয়া প্রদান করে থাকেন। এবার সেরকম হবার সম্ভাবনা একেবারেই নেই। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সমজিদে খতম তারাবীহ জামাতের সাথে আদায় করা তো দূরের কথা, মুসুল্লিরা জামাতের সাথে মসজিদে নামাজ-ই পড়তে পারবেন না। আর পড়াও উচিত হবে না।
এবিষয়ে মসজিদ কমিটিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। শহরে কোন সমস্যা না হলেও গ্রামে অতি উৎসাহী কিছু মানুষ যাতে জামাতে তারাবীহ নামাজ আদায় করতে না পারে, তা নিশ্চিতে মসজিদের ইমাম, মসজিদ কমিটি ও ইসলামী ফাউন্ডেশনকে জনসচেতনা সৃষ্টি করতে হবে।
এখন এই আনুমানিক ৫ লক্ষ হাফেজ সাহেবদের আর্থিক প্রনোদণার বিষয়টি কিভাবে সমাধান করা যাবে, তা সরকার ও স্ব-স্ব মসজিদ কমিটিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করতে হবে। তা না হলে এতো বহু সংখ্যক হাফেজ সাহেবদের উপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের রোজা ও ঈদ নিশ্চিতভাবে কষ্টদায়ক হয়ে যাবে।
এক্ষেত্রে দেশের সকল সমজিদ কমিটি পূর্ব থেকেই নিয়োগকৃত হাফেজ সাহেবদেরকে সংশ্লিষ্ট মসজিদের পক্ষ থেকে নিয়োগ করতে পারেন। যেহেতু ৫/১০ জন মুসুল্লি সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে মসজিদে নামাজ আদায় করতে পারবেন, সেহেতু একদিকে যেমন সারাদেশের লক্ষ লক্ষ মসজিদে কোরআন তেলাওয়াত হলো, কোরআন খতম হলো, আর কোরআনের চর্চাটাও বজায় থাকলো, অন্যদিকে হাফেজ সাহেবদের আর্থিক বিষয়টারও একটা সুরাহা হ'ল।
আর এই ব্যবস্থাটি যদি স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে মসজিদ কমিটি হাফেজগণকে নিয়োগ প্রদান করে তাদেরকে মসজিদে না এনে নিজ নিজ বাসায় রেখে কোরআন খতমের লক্ষ্যে তারাবীহ নামাজ আদায় করার জন্য দায়িত্ব প্রদান করা যেতে পারে।
মহামারী করোনা মসজিদে খতম তারাবীর ইমাম হিসেবে হাফেজগণের নিয়োগ ও সস্মানী একেবারেই অনিশ্চিত করে তুলেছে। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের পরিবারের সদস্যদের রোজা ও ঈদ উদযাপন এই সম্মানীর উপর নির্ভর করে। তাই দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় হাফেজগণকে নিয়োগ বঞ্চিত না করে আলোচনার মাধ্যমে তাদের নিয়োগের বিষয়টি স্বাস্থ্য প্রটোকল অনুযায়ি করা যায় কিনা, তা ভেবে দেখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে তাদের সম্মানী এবারের মতো কমবেশি হতে পারে।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন তাদের জেলা অফিসের মাধ্যমে প্রকৃত হাফেজগণের তালিকা তৈরি করে হাফেজদের জন্য মসজিদভিত্তিক থোক বরাদ্দ প্রদান করে এই ক্রাইসিস সুচারুভাবে সমাধান করতে পারে। সমাজের সম্পদশালী ব্যক্তিরাও কোরআন নাযেলের মাসে কোরআন চর্চা চালু রাখার স্বার্থে এগিয়ে আসতে পারেন।  সরকারী, আধাসরকারী ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পরিচালিত মসজিদে খতম তারাবীহ’র জন্য পূর্বের মতো হাফেজ নিয়োগ করে সাময়িকভাবে এই ক্রাইসিসও মোকাবেলা করা যেতে পারে।
আশা করি মসজিদ কমিটি ও সরকার উভয়েই বিষয়টি সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করবেন। অন্যথায় হাফেজগণ এক অনিশ্চিত আর্থিক সংকটের মধ্যে পতিত হবেন।

লেখক: অধ্যাপক ড. মোহা. হাছানাত আলী, আইবিএ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। 
মেইল :
[email protected]


 

মন্তব্য