| প্রচ্ছদ

সীমান্তের ওপারে আটকা পণ্যবোঝাই কয়েক হাজার ট্রাক

পুন্ড্রকথা ডেস্ক
পঠিত হয়েছে ৬৫ বার। প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২০ ২২:৪০:২৮ ।

ভারতের পেট্রাপোল বন্দরে পণ্যবোঝাই কয়েক হাজার ট্রাক আটকা পড়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতে মহামারি করোনাভাইরাস প্রতিরোধে বিভিন্ন বিধিনিষেধ জারি রয়েছে। এ কারণে কার্যত বেনাপোল-পেট্রাপোল বন্দর এলাকার অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে।

 

বেনাপোলে নেই কোনও শিল্প কারখানা। বেনাপোল স্থলবন্দর ঘিরে জীবিকার জন্য নির্ভরশীল কয়েক হাজার মানুষ। এই পথে আমদানি-রফতানি দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় বন্ধ থাকায় রোজগার বন্ধ হয়ে পড়েছে শ্রমিকদের। স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল-পেট্রাপোল। একই সঙ্গে বেকার হয়ে পড়েছেন বন্দরসংশ্লিষ্ট কয়েক হাজার শ্রমিক। বন্দর ও কাস্টমস সংশ্লিষ্ট কয়েকশ এনজিওকর্মীরও একই অবস্থা। ভারত দিয়ে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের সিংহভাগ পণ্য আসে এই বন্দর দিয়ে। আপাতত বেনাপোল বন্দরের সঙ্গে যুক্ত সীমান্ত এলাকার মানুষ করোনায় নয়, রুজি-রুটি হারানোর আতঙ্কে রয়েছেন।

বেনাপোল-পেট্রাপোল বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম বন্ধের ফলে উভয় সীমান্তে আটকা পড়েছে কয়েক হাজার পণ্যবোঝাই ট্রাক। যার অধিকাংশই বাংলাদেশের রফতানিমুখী গার্মেন্টস শিল্পের ও দেশীয় বিভিন্ন শিল্প-প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল। যেগুলো বেনাপোল বন্দরে প্রবেশের অপেক্ষায়।

গত ২২ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত পেট্রাপোল বন্দর দিয়ে কোনও পণ্যবাহী ট্রাক বেনাপোল বন্দরে প্রবেশ করেনি। বেনাপোল বন্দর দিয়ে কোনো পণ্য নিয়ে ট্রাক পেট্রাপোল বন্দরে যায়নি। আমদানি-রফতানি বন্ধ থাকায় বাণিজ্যে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ ট্রাকে করে বিভিন্ন ধরনের পণ্য ভারত থেকে আমদানি হয়। ভারতে রফতানি হয় প্রায় দেড়শ থেকে ২০০ ট্রাক বাংলাদেশি পণ্য। প্রতি বছর এ বন্দর থেকে সরকার প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা আমদানি পণ্য থেকে ও পাসপোর্টধারী যাত্রীদের কাছ থেকে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা রাজস্ব পায়। কিন্তু এখন সবই বন্ধ রয়েছে । করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আর কতদিন আমদানি-রফতানি বন্ধ থাকবে সেটা কেউ বলতে পারছেন না।

এরই মধ্যে গত ২২ এপ্রিল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে সরকার ১০ দিনের (৫ মে পর্যন্ত) সাধারণ ছুটি বাড়িয়ে দেয়। তবে ছুটির সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ শৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখার লক্ষ্যে কাস্টমস হাউজ ও কাস্টমস স্টেশনসমূহে স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার নির্দেশ দেয় এনবিআর। সেই হিসেবে বেনাপোল কাস্টমস ও বন্দরে কাজ চলছে। তবে তা খুবই কম।

গত ৩০ মার্চ এক আদেশে আমদানিকৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, জরুরি চিকিৎসা সামগ্রী ও অন্যান্য সেবা সামগ্রী, শিল্পের কাঁচামাল এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থার আমদানিকৃত পণ্য খালাসের জন্য কাস্টম হাউস ও শুল্ক স্টেশনগুলোকে নির্দেশ দেয় এনবিআর। এরই মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বেশকিছু পণ্য বেনাপোল কাস্টম থেকে খালাস করলেও অধিকাংশ আমদানিকারক পণ্য খালাসে আগ্রহী ছিল না। পণ্য আমদানি-রফতানি ও খালাসের সঙ্গে ভারতীয় কাস্টম, বন্দর, বেনাপোল বন্দর, ব্যাংক, ট্রান্সপোর্ট, উভয় দেশের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও বন্দর শ্রমিকরা জড়িত রয়েছে। সবার সঙ্গে সমন্বয় না হলে কার্যত পণ্য আমদানি-রফতানি ও খালাস প্রক্রিয়ায় জটিলতা থেকে যায়।

এদিকে বেনাপোল-পেট্রাপোল দিয়ে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম শুরুর ব্যাপারে দুই দেশের মধ্যে নানাভাবে আলোচনা হয়। কিন্তু পণ্য নিয়ে যাওয়া-আসা ট্রাকচালক ও হেলপারদের ফেরার পথে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনে থাকা বাধ্যতামূলক করায় পণ্য পরিবহনে অনীহা প্রকাশ করেছেন তারা।

ওপারের বন্দর সূত্রে জানা যায়, বেনাপোল বন্দরে আটকে থাকা ভারতীয় আটটি খালি ট্রাকসহ চালক এবং হেলপাররা কয়েক দিন আগে নিজ দেশে ফিরে গেছেন। তবে পেট্রাপোল বন্দরে ফিরে যাওয়া ট্রাকচালক এবং হেলপারদের ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকের ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব চালকরা ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বিহারের বাসিন্দা।

পেট্রাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস স্টাফ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কার্তিক চক্রবর্তী বলেন, ‘ভারতে দফায় দফায় লকডাউন ঘোষণা করায় সব ধরনের আমদানি-রফতানিসহ সীমান্ত-বাণিজ্য বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে করোনার আতঙ্কের জেরে স্থলবন্দর এলাকার অর্থনীতি একেবারে মুখ থুবড়ে পড়েছে। পণ্যবোঝাই কয়েক হাজার ট্রাক বেনাপোল বন্দরে প্রবেশের অপেক্ষায় দীর্ঘদিন পড়ে আছে। সেগুলোকে সঠিক পদ্ধতিতে বাংলাদেশে পাঠিয়ে ব্যবসায়ীদের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা যায় কি-না সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের চেষ্টা চলছে।’

ভারতের পেট্রাপোল সীমান্তে বাণিজ্যে জড়িত ব্যবসায়ী কৃষ্ণগোবিন্দ বলেন, ‘আগে মানুষের জীবন। তারপর ব্যবসা। গত ২৩ মার্চ থেকে আমাদের কয়েকটি পাট বীজবোঝাই ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে পেট্রাপোল বন্দরে। লাখ লাখ টাকা ক্ষতির মধ্যে পড়ে আছি। তবু আমরা সরকারের সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত হিসেবে নিয়েছি। কারণ কোনোভাবেই কোনও দেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হোক আমরা তা চাই না।’

বেনাপোল আমদানিকারক সমিতির সহ-সভাপতি আমিনুল হক বলেন, ‘করোনাভাইরাস আতঙ্ক এতটাই ভয়ঙ্কর যে, সীমান্ত সিল করে দিয়েছে সাধারণ মানুষের প্রাণ রক্ষার স্বার্থে। পাশাপাশি এর প্রভাব ব্যবসা বাণিজ্যেও পড়েছে। এখনই ক্ষতির মুখ দেখতে শুরু করেছেন ভারত-বাংলাদেশের পণ্য আমদানি-রফতানিকারকরা। ক্ষতি কাটিয়ে নিতে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’

বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন বলেন, ‘করোনাভাইরাসের কারণে ব্যবসা ক্ষতির মুখে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক দিনের মধ্যেই চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়বে। সেই সঙ্গে সীমান্ত এলাকার হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষ বিকল্প সঠিক পথ না পেয়ে বিপথে পা বাড়াবে। তাতেই সমস্যার সম্মুখিন হবে দেশের ব্যবসায়ীসহ বন্দর ব্যবহারকারীরা।’

বেনাপোল কাস্টম হাউজের সহকারী কমিশনার উত্তম চাকমা বলেন, ‘আমরা কাস্টম হাউজ খোলা রেখে কাজ করে চলেছি। আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা পণ্য নিতে চাইলে আমরা দ্রুত সেটা শুল্কায়ন শেষে খালাসের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। আমাদের সব কর্মকর্তা প্রস্তুত।’ খবর বাংলা ট্রিবিউন

মন্তব্য