| প্রচ্ছদ

শ্যামলিমা ব্রাজিল: বটবৃক্ষকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা!

জুবায়ের হাসান:
পঠিত হয়েছে ৭৩৯ বার। প্রকাশ: ২০ জুন ২০১৮ । আপডেট: ২০ জুন ২০১৮ ।

ফুটবলে ব্রাজিল প্রকা- এক বটবৃক্ষ, কলাগাছ নিশ্চয় নয়। মানুষ পরিবর্তন ও নতুনত্বকে স্বাগত জানায়। তবে তা হতে হবে যোগ্যতার দ্বারা নিয়মতান্ত্রিক পন্থায়। জোরপূর্বক বটগাছ উপড়ে ফেলার মত করে নয়। এমনটা করা হলে ছায়া-শীতলতা দানকারী বটগাছের স্থলে অসংখ্য আগাছা জন্মায়। সেসব আগাছা ¯িœগ্ধতা তো দিতেই পারে না বরং উল্টো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের হানি ঘটায়, জমিনকে করে অনুর্বর। কথাগুলো এজন্যেই বলছি, কারণ গত (১৭-০৬-১৮) ব্রাজিল-সুইজারল্যান্ড খেলায় কোটি মানুষের প্রিয় দল ব্রাজিলের প্রতি অন্যায় করা হয়েছে। কোন দলকে এমন অন্যায়ভাবে স্থানচ্যুত করতে চাইলে, সেই দলটি ভক্ত-সমর্থকদের হৃদয় কুঠোরে আরো উজ্জ্বল মনিরূপে গেঁথে যায়।
ফিফা’র সদর দপ্তর সুইজারল্যান্ডের জুরিখ শহরে। সেই যোগসূত্র থেকে সুইজারল্যান্ড রেফারিংয়ের সুবিধা পেয়েছে কি’না তার গবেষণা ও অনুসন্ধান ফুটবলমোদীরা নিশ্চয় করবেন। ব্রাজিলকে উপড়ে ফেলার আয়োজন করা হয়েছিল ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপেও। ইউরোপ চায়নি পেলে-ভাভা-গারিঞ্জার ব্রাজিল তৃতীয়বারের মত শিরোপা জিতে বিশ্বকাপটা চিরতরে নিজেদের করে নিক। ১৯৬৬-তে ব্রাজিল অন্যায় অবিচারের শিকার হয়ে ব্যর্থ হলেও, পরের আসর ১৯৭০’এ প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে উঠে চিরতরে ‘জুলেরিমে ট্রফি’ নিজের করে নেয়। বিশ্বজুড়ে ভক্তদের কাছে পেলে হয়ে ওঠেন ‘কালো মানিক’। সে সময় ইংরেজ ও ইউরোপীয় শেতাঙ্গরা বিশ্বের সব কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর যথেষ্ট পরিমাণে জুলুম নির্যাতন করত। দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা হয়েছিলেন বন্দী (১৯৬২)। সাদা চামড়ার শেতাঙ্গ মানুষগুলো তাদের পোষা কুকুরগুলোকে যতট না ভালবাসত, তার বিপরীতে অনেক নিষ্ঠুর আচরণ করত কালো বর্ণের নিগ্রো কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি। ভারতীয় উপ-মহাদেশের হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষেরা এই কৃষ্ণাঙ্গদের মুক্তি আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন।
মহাত্মাগান্ধী  তো বৃটেনে ব্যারিস্টারী পড়া শেষ করে জীবনের প্রথম অংশটাই দক্ষিণ আফ্রিকাতে কাটিয়েছেন কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার রক্ষার প্রচেষ্টায়। নেলসন ম্যান্ডেলা যেমন আমাদের দেশে জনপ্রিয় নাম, তেমনি সে সময় পেলের মাঝে কৃষ্ণাঙ্গদের মুক্তির দিশা খুঁজে পাওয়ায়, তিনিও হয়ে আছেন আমাদের প্রিয় মুখ। অনেকেই আজকাল ‘এর ওর’ একটু-আধটু খেলা দেখেই তাদেরকে ‘ফুটবল ঈশ্বর’ বলে হাঁকাহাঁকি-ডাকাডাকি করতে থাকেন। এরা যদি ‘ফুটবল ঈশ্বর’ হয়ে থাকেন, তবে পেলে হলেন সেই ফুটবল ঈশ্বরদের ‘বাপ’। অর্থাৎ ঈশ্বরদের ঈশ্বর। তাঁর ফুটবল রেকর্ড ঘাঁটলে এ কথাটা না মেনে আর উপায় থাকে না। বাবা-চাচাদের কাছে মন্তব্য শুনেছি যে, পেলে এমন একজন খেলোয়াড় যিনি ফুটবল মাঠে বৈষম্য-অবিচার-অবৈধ বল প্রয়োগ (ফাউল) ইত্যাদির সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও হাসিমুখে তা মেনে নিতেন। তাঁর খেলোয়াড়ী জীবন কোন লাল কার্ড, হলুদ কার্ড নেই। জানি না এসব প্রশংসা বাক্যের পেছনে তথ্যসূত্র আছে কি’না। তবুও বাবার দেওয়া তথ্যকে মেনে নিয়েছি। কারণ, পেলে পরবর্তী যুগে আজ অবধি ব্রাজিল দলে যাদেরকে খেলতে দেখলাম সত্যিই তাঁরা বিজয়ে বিনয়ী থাকে, অবিচারের মুখে ধৈর্য্যশীল থাকে, পরাজয়কে অবলীলায় মেনে নেয়। ‘পরাজয়ে ডরে না বীর’-একথাটি ব্রাজিল দলের সাথেই যেনো একমাত্র মানানসই।
আমার দেখা ব্রাজিলের খেলাগুলো নিয়ে ভাবতে গেলে বিভোর হয়ে যাই। জিকো-সক্রেটিস (’৮২-’৮৬) ক্যারেকা-ফ্যালকাও-অ্যালেমাও, দুঙ্গা, বেবেতো- রোমারিওদের (’৯৪) কথা। এরপর রোনালদো-রোনালদিনহো-রিভালদো-রবার্তো কার্লোসদের কথা। অর্থাৎ  একেবারে ১৯৮২ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ৯টি বিশ্বকাপের ৩৬ বছরের নান্দনিক কাব্য কথা। এদের কৃতিত্বের কারণ নিয়ে আজকাল গবেষণা করা হয়। এরা এমন ধরনের খেলোয়াড় ছিলেন, মাঠে শত অন্যায়ের মুখেও অশালীন-অশোভন অঙ্গভঙ্গি করেননি। সস্তা জনপ্রিয়তার অভিনয়ও করেননি। একদম যেনো ‘কালোমানিক’ খ্যাত পেলের যোগ্য উত্তরসূরী। তাইতো আজকের KGN-কুটিনহো (জার্সি নম্বর ১১) জেজুস (ইংরেজি উচ্চারণ, জার্সি নম্বর ৯)- নেইমার (জার্সি নম্বর ১০) বারবার বেধড়ক মার খায়, ছিটকে পড়ে যায়। তবুও কিছুমাত্র প্রতিবাদ করে না। তাঁদের আঘাত জর্জরিত দেহের ছোট্ট দু’চোখে ও ঠোঁটে শুধু স্মিত হাসি-কান্নার রেখা। এটার দ্বারা পেলের যোগ্য উত্তরসুরীরা সবাইকে উদ্দেশ্য করে ইশারায় যেনে বোঝাতে চাইছে- ‘আমরা যদি চলে যাই, তবে মুছে যাবে তোমাদের চোখের সমুখ থেকে পৃথিবীর সবুজ শ্যামলিমা। ফুটবল দিয়ে আমরা সুর-ছন্দের বাঁশি বানিয়েছি জগৎবাসীকে মুর্ছিত করতে, রণডঙ্কা বাজাতে আসিনি।’ পীড়িতদের এমন আর্তিতে প্রকৃত ফুটবলমোদীদের নির্লিপ্ত থাকার সুযোগ কোথায়?
ব্রাজিল ভক্ত সমর্থকদের ঠিকানাটা আঞ্চলিক নয় বরং বৈশ্বিক। ডাহা ডাহা ফাউল দেখেও সুইস বন্দনা এরা মেনে নিবেন না। আর্জেন্টিনার বিশাল সমর্থকগোষ্ঠী পাছে বেজার হয়, তাই সত্যকে এড়িয়ে গিয়ে নিরপেক্ষতার ভান করা-এটাও এই বৈশ্বিক ভক্ত সমর্থকরা ধরে ফেলবেন। অতএব সাধু সাবধান!
‘ফেয়ার প্লে’-এর ব্যানার প্রদর্শনকারী ফিফাকে আগামী ব্রাজিল-কোস্টারিকা (২২-০৬-১৮) ও ব্রাজিল-সার্বিয়া (২৭-০৬-১৮) ম্যাচগুলোতে সকলের জন্য সমভূমি নিশ্চিত করতেই হবে। কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীদের এটাই প্রত্যাশা। ব্রাজলীয় নন্দনকাননে ফোটা ফুলকে দর্শকরা উপভোগ করতে চায়। খেলাটা তাদের জীবনের অংশ। খেলার অপমৃত্যু তাঁদের জীবনকে থামিয়ে দেবে। প্রথম খেলা থেকে সৃষ্ট বেদনার যে ঢেউ রিও-ডি-জেনোরিও উপকূলে আছড়ে পড়েছে, তাতে করে  কোচ তিতে এখন শিষ্যদের এই মন্ত্রেই উজ্জ্বীবিত করতে চাইবেন- 

‘মৃত্যুর জানাজা আমি কিছুতেই করিবো না পাঠ,
কবরেরও ঘুম ভাঙ্গে জীবনের দাবি আজ এতই বিরাট”

[email protected]

মন্তব্য