| প্রচ্ছদ

ভাঁড়-ভাক্কা-ভাতার : নেইমার-মেসি তবে খালি গায়ে খেলুক!

জুবায়ের হাসান
পঠিত হয়েছে ৩২৪ বার। প্রকাশ: ২১ জুন ২০১৮ । আপডেট: ২১ জুন ২০১৮ ।

VAR-‘ভিডিও অ্যাসিসটেন্ট রেফারি!’ রাশিয়া-২০১৮ বিশ্বকাপ খেলায় এই প্রযুক্তির ব্যবহার ইতিমধ্যেই অনেক দর্শক দেখে ফেলেছেন। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে VAR এর সাহায্যে রেফারি ইচ্ছা করলে নিতে পারেন কিম্বা নাও নিতে পারেন। তবে মাঠের বাইরে ওপরের বক্সে বসে থাকা VAR স্বপ্রণোদিত হয়ে রেফারিকে তাঁর সিদ্ধান্ত পাল্টাতে বাধ্য করতে পারেন। গোল সঠিক হওয়া না হওয়া, পেনাল্টি দেওয়া না দেওয়া এবং লাল কার্ড দেখানো না দেখানো-এই তিনটি ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত দেবার জন্য VAR মূলত কাজ করে থাকে। খেলার স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি চমৎকার ব্যবস্থার প্রচলন বলে মনে হয়। কিন্তু যদি এমন হয় রেফারি কোন ভুল সিদ্ধান্ত দিলেন এবং সেই ভুল সিদ্ধান্ত সম্পর্কে VAR নিশ্চুপ রইলেন, তখন কি হবে?
ক্ষতিগ্রস্ত দলের খেলোয়াড় অথবা কোচ যদি আঙুল দিয়ে ‘রিপ্লে সাইন’ দেখিয়ে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন, তবে বিধি মোতাবেক তিনি হলুদ কার্ড পাবেন। অর্থাৎ ক্রিকেট খেলার মত এখানে খেলোয়াড়দের DRS ‘ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম’-এর জন্য আবেদন করার বিধান নেই। অতএব ফুটবল খেলায় রেফারির সিদ্ধান্ত ও VAR-এর নির্লিপ্ততা মেনে নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দলকে খেলা চালিয়ে যেতে হবে। ক্রিকেট খেলায় দলের ক্যাপ্টেনকে রিভিউ নেয়ার ক্ষমতা একদিনেই দেয়া হয়নি। নব্বই দশকের শেষ দিকে সর্বপ্রথম ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে শুধুমাত্র রান আউট দেখার জন্য টিভি থার্ড অ্যাম্পায়ার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। তখনো অন্য সব ব্যাপারে যেমন নো বল লাইন, এলবিডব্লিউ, কট বিহাইন্ড, বাম্ফ ক্যাচ ইত্যাদি ব্যাপারে টিভি রিপ্লে দেখার নিয়ম ছিল না। তাছাড়া খেলোয়াড় কর্তৃক আম্পায়ারের কাছে ‘টিভি রিপ্লে’ দেখার আবেদন করাটাও আইন বিরুদ্ধ ছিল। পাকিস্তানের লেগ স্পিনার মোস্তাক আহমদ একবার আম্পায়ারের কাছে আঙুল দিয়ে ‘রিপ্লে সাইন’ দেখিয়ে জরিমানা গুণেছিলেন। কিন্তু কালক্রমে প্রয়োজন মেটানোর দাবির মুখে আজ ক্রিকেট খেলার সব বিভাগেই ‘টিভি রিপ্লে’-এর আবেদন করতে পারছে। খেলোয়াড়রা খেলার মূল অংশ। তাদের আবেগ-আবেদন অনুযোগসমূহকে এড়িয়ে গিয়ে খেলার স্বচ্ছতা- সৌন্দর্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই ফুটবলে যে VAR-এর  ব্যবহার শুরু হয়েছে সেটাও একদিন উন্মুক্ত হয়ে যাবে।
ইংরেজ ও অন্যান্য পশ্চিম ইউরোপীয়রা ফুটবল-ক্রিকেট-হকি-রাগবি প্রভৃতি খেলা তাদের কলোনিয়াল দেশগুলোতে রপ্তানি করেছে। দাসদের সাথে এসব খেলা খেলতে গিয়ে তারা যথেষ্ট বিনোদন উপভোগ করতো। পরাজিত হয়ে বিষাদের ঘটনা যেন না ঘটে, সেজন্য খেলার বাইরে গিয়ে নানাবিধ বিধিমালা তৈরি করে খেলার বিচারকের  (রেফারি-আম্পায়ার) উপর প্রভাব বিস্তার করে থাকত। এই মাত্র সেদিন পর্যন্ত ইংল্যান্ড আইসিসি-এর উপর কতই না ছড়ি ঘুরিয়েছে। কিন্তু ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলংকার শ্রেষ্ঠত্বের কাছে আইসিসি-কে অবশেষে হার মানতে হয়েছে। DRS সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ায় ক্রিকেট এখন একটি স্বচ্ছ খেলায় পরিণত হয়েছে।
ক্রিকেটের এতযুগ পরে হলেও ফুটবলে সবেমাত্র VAR এসেছে। তবে এই VAR এখন পর্যন্ত ভাঁড় হয়েই রয়েছে। যিনি স্থুল রসিকতা করেন এবং ক্রমাগত প্রবঞ্চনা করতে থাকেন, তাঁকে বাংলা ভাষায় ভাঁড় বলা হয়। ভাঁড়ের কর্মকাণ্ড মানুষকে না হাসিয়ে বরং ক্ষিপ্ত করে তোলে। কিন্তু ভাঁড়ের  সাথে ওপরতলার কর্তাব্যক্তিদের যোগাযোগ থাকায় নিরুপায় জনগণ তাঁকে ধোলাই দিতে পারে না। এজন্যই ভাঁড় যখন তখন যত্রতত্র বিচরণ করে। এই ভাঁড় এসে উপস্থিত হয়ে ফ্রান্সকে পেনাল্টি পাইয়ে দিল (ফ্রান্স-অস্ট্রেলিয়া ১৬-০৬-১৮)। ব্রাজিলের জেজুসকে যখন বক্সের মধে ফাউল করা হল, আবার ব্রাজিলের মিরান্দাকে ধাক্কা দিয়ে সুইস খেলোয়াড় জুবের যখন গোল করল তখন আর ভাঁড়ের দেখা নেই (ব্রাজিল-সুইজাল্যান্ড, ১৭-০৬-১৮)। এরপর মরক্কোর নূরেদিন আমব্রাত-কে (জার্সি নম্বর-১৬) পর্তুগালের ডিফেন্ডার সের্হিও বুশকেৎজ (জার্সি নং-৫) যখন বক্সের মধ্যে ফাউল করল তখন ভাঁড়ের দেখা নেই। ভাঁড় নিজেই শুধু উধাও হল না, একেবারে রেফারির কানের এয়ার ফোনের সংযোগ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন করে দিল। অতঃপর রেফারি এয়ার ফোনটি পরিবর্তন করে নিলেন (মরক্কো-পর্তুগাল, ২০-০৬-১৮)। অনেক খোঁজাখুঁজি করে ভাঁড়কে যখন পাওয়া গেল না তখন তিনি আবারো জিনের মত করে হাজির হলেন। তাঁর এবারের শিকার ইরান। ফ্রি কিকের জটলা থেকে ইরানের করা পরিষ্কার গোলটি বাতিল করলেন জটিল-দুর্বোধ্য অফ সাইড বিধির অজুহাতে (ইরান-স্পেন, ২০-০৬-১৮)। মরক্কো, ইরান ফুটবলের দুর্বল শক্তি। ভক্তকূলের সংখ্যা নগণ্য। তাই এসব নিয়ে হৈ চৈ হচ্ছে কম।
বগুড়া ও তার আশেপাশের বিস্তৃত অঞ্চলে বহুল প্রচলিত একটা শব্দ ‘ভাক্কা’। এর অর্থ ছলনাপূর্ণ আচরণ বা তামাশা। বিশ্বকাপের খেলায় এসব অবিচার দেখে মন বলে উঠছে ‘ভাঁড় তুই ভাক্কা করিস না’। বগুড়া অঞ্চলে আরো একটি শব্দের বিশেষ প্রয়োগ আছে। ‘ভাতার’-অর্থাৎ ভরণ করায় যে/ভাত দেয় যে। গ্রামাঞ্চলে কোন অসহায় নারী কোন পুরুষের সাহায্য প্রার্থী হলে, সমাজপতিরা মন্দ অর্থে ঐ নারীকে শাসিয়ে ধমক দিয়ে বলে-‘ঐ পুরুষটি কি তোর ভাতার’? প্রযুক্তি হাতের কাছে থাকতেও যে রেফারি তা ব্যবহার করেন না, তাঁকে তো দর্শকবৃন্দ এটাই জিজ্ঞেস করবে-‘ওই রেফারি! ফিফা কি তোর ভাতার?’ মাওলানা ভাসানী (জন্ম-মৃত্যু: ১৮৮০-১৯৭৬) বেঁচে থাকলে নিশ্চয় বলতেন ‘খামোশ!’
ভাঁড়ের ভাঁড়ামি দেখার অনেক বাকি আছে। কথাটি আগেভাগেই বলে রাখলাম। দুই বাংলা ও আসামের বাঙালির প্রাণের দল ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা। নেইমার-মেসি এখানকার দর্শকদের প্রাণপ্রিয় খেলোয়াড়। ভাঁড়-ভাক্কা-ভাতার-দের কারসাজিতে এদের বিদায় করাটা বাঙালি মেনে নিবে না, প্রতিবাদ করবে। ইউরোপে (ফ্রান্স-স্পেন-পর্তুগাল-ইংল্যান্ড) কাপ রেখে দেয়ার যে আয়োজন চলছে তার বিরুদ্ধে ল্যাটিন-ল্যাটিন ঐক্য চাই। মেসি-নেইমারের জার্সি টেনে ধরার বিহিত চাই। ছোট বেলায় জোছনা রাতে কাবাডি খেলতাম। বিপক্ষের খেলোয়াড় যেন ধরে আটকে রাখতে না পারে, সেজন্য খালি গায়ে তেল মেখে খেলতাম। কেউ আর আটকে রাখতে পারত না। তবে কি নেইমার- মেসি খালি গায়ে খেলবেন! [email protected]

মন্তব্য