| প্রচ্ছদ

আর্জেন্টিনা: পশ্চিমে নিভন্ত এক ঝলসানো আভা!

জুবায়ের হাসান:
পঠিত হয়েছে ৩৫০ বার। প্রকাশ: ২৪ জুন ২০১৮ । আপডেট: ২৪ জুন ২০১৮ ।

পাকশি থেকে ভেড়ামারা। আমার ছেলেবেলার (১৯৮০-৮১) দূরন্ত এক ফেরি পারাপার। প্রমত্ত পদ্মার ঢেউয়ের তোড়ে পানির ছটা গায়ে এসে পড়ত। শক্ত হাতে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম। চোখ মেলে তাকাতাম দূরের নৌকাগুলোর দিকে। প্রবল ঢেউ ধাক্কা দিয়ে নৌকাগুলোকে কাত করে ফেলে দিতে চাইত। মাঝির পানিতে পড়ে যাওয়ার কল্পিত দৃশ্যে ভয়ে শিহরিত হয়ে পড়তাম। পদ্মা নদীর মাঝিদের ক্লান্তি-ক্লেশে আহরিত রূপালি ইলিশ এক সময় কলকাতার বাবুদের ভোজন রসিকতা মেটাত। এরপরও জীবন যুদ্ধে পরাজিত মাঝি গেয়ে উঠত-‘মন মাঝি তোর বৈঠা নে রে, আমি আর বাইতে পারলাম না।’ আমার ছেলেবেলার দেখা পদ্মা নদীতে এখন আর মাঝি দেখা যায় না। সে স্থলে দেখা মেলে গরু-ছাগলের পাল ও রাখাল। তেমনি আমার কৈশোরে দেখা (১৯৮৬) আর্জেন্টিনারও দিন পাল্টাচ্ছে। এই দলটাকে নিরাপদে পারাপার করাবার মত মাঝি আর বুঝি নেই। বৈঠা বাওয়ার শক্তি কোচ থেকে শুরু করে কোন খেলোয়াড়ের মাঝেই যেন নেই।
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে দুর্বল হাড্ডিসার আর্জেন্টিনাকে দেখা গেল (আজেন্টিনা-০: ক্রোয়েশিয়া-৩, ২১-০৬-১৮)। হ্যাভিয়ার ম্যাস্চেরানো (জার্সি নম্বর-১৪) এবং ওটামেন্ডিকে (জার্সি নম্বর-১৭) সারাক্ষণ রক্ষণভাগ সামলাতে ব্যাস্ত থাকতে হচ্ছে। অথচ এই দুই জনের অন্যতম কাজ মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আক্রমণের উৎস তৈরি করা। গোলরক্ষক রোমেরোর অনুপস্থিতি ও রক্ষণভাগের অনভিজ্ঞ সতীর্থদের উপর ভরসা করতে না পেরে এ দু’জন গুরুত্বপূর্ণ কুশলী খেলোয়াড় উপরে উঠে গিয়ে খেলতে পারছেন না। এটাই আর্জেন্টিনার হেরে যাওয়ার প্রধান কারণ।

আর্জেন্টিনা গতিময় ফুটবল খেলে না, কাউন্টার অ্যাটাকেও যায় না। সে খেলে যথেষ্ট স্কিলের উপর। স্কিল দেখিয়ে গোল আদায় করতে হলে চাই মাঝ মাঠের নিয়ন্ত্রণ। তাই রক্ষণভাগের অন্তত দু’জন খেলোয়াড়কে প্রয়োজনে মাঝ মাঠে এসে খেলতে হয়, আবার রক্ষণভাগও সামলাতে হয়। এর জন্য প্রয়োজন অফুরন্ত দম। ম্যাস্চেরানোর যথেষ্ট বয়স হয়েছে। তিনি আর এতটা ওঠা-নামা করতে পারবেন না। সুতরাং কোচের উচিত তাঁকে শুধু মাঝ মাঠের খেলোয়াড় হিসাবেই খেলানো। নাইজেরিয়ার বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনাকে জিততেই হবে। তাই রক্ষণভাগের দিকে তাকিয়ে আর লাভ নেই। এই পরিস্থিতিতে আর্জেন্টিনার মূল কৌশল হওয়া উচিত-‘অফেন্স ইজ দ্যা বেস্ট ডিফেন্স- আক্রমণই উত্তম প্রতিরক্ষা।’ এটা আধুনিক ফুটবলের ফলদায়ক কৌশল। যেসব দল টুর্নামেন্টে খাদের কিনারে পড়ে যায় তাদেরকে এই কৌশল প্রয়োগ করতে হয়। মেসি (জার্সি নম্বর-১০) এবং আগুয়েরোর (জার্সি নম্বর-১৯) সাথে দিবালা-কে (জার্সি নম্বর-২১) নামালে শাণিত আক্রমণ হবে। ফ্রি-কিক বা পেনাল্টির যে কোন একটি আসবে।আর্জেন্টাইন থিংক ট্যাংক নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন, এবারের বিশ্বকাপে সেটপিসের ফ্রি-কিক থেকে গোল বেশি আসছে। কারণ ভিডিও রিপ্লেতে ধরা পড়ার ভয়ে জটলার মধ্যে ধাক্কা-ধাক্কি করার সুযোগ কম। নাইজেরীয় খেলোয়াড়দের খেলার ‘অ্যাকাডেমিক সেন্স’ এবং স্বাভাবজাত ‘সিক্স সেন্স’ এখনো কম। ড্রিবলিং করে, ভড়কে দেয়া যেতে পারে। সুতরাং অতি আক্রমণাত্মক কৌশল আর্জেন্টিনাকে জয় এনে দিতে পারবে। এর ব্যতিক্রম হলে সেই প্রমাদ রাজ্যেই বাস করতে হবে, আর জিততে পারবে না।
আর্জেন্টিনা-নাইজেরিয়া (২৬-০৬-১৮ তে অনুষ্ঠিতব্য) ম্যাচ নিযে আমি যে চিন্তার উদ্্গীরণ করলাম তার প্রয়োগ করাটাই আসল ব্যাপার। আইডিয়া জেনারেট করা সহজ কিন্তু এক্সিকিউট করাটা কঠিন। আমার মন বলছে আর্জেন্টিনা জিতবে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে। কিন্তু মাথাটা তাতে খুব কমই সায় দিচ্ছে। বারবার যেন দুর্ভাবনায় মূষঢ়ে পড়ছি। স্মৃতি রোমন্থন মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। বিষাদময় ঘটনার পূর্বাভাসে হেমন্ত মুখার্জির গানটিকে বেশ মনে পড়ছে-

‘মুছে যাওয়া দিনগুলি আমায় যে পিছু ডাকে
স্মৃতি যেন আমার এ হৃদয়ের বেদনার
রঙে রঙে ছবি আঁকে।
ভেঙে গেছে হায়! ভেঙে গেছে হায়!
ভেঙে গেছে আজ সেই হাসি আর রঙের খেলা।
কোথায় কখন কবে কোন্ তারা ঝরে গেল
আকাশ কি মনে রাখে?’

মন্তব্য