| প্রচ্ছদ

স্নাতক পাশ করেও রিকশা-ভ্যান ছাড়তে পারছেন না: একটা চাকরির আকুতি ফরহাদের

পুণ্ড্রকথা রিপোর্ট:
পঠিত হয়েছে ৪৬৪ বার। প্রকাশ: ৩০ জুন ২০১৮ । আপডেট: ৩০ জুন ২০১৮ ।

আগে তাকে ডাকা হত ‘ফরহাদ’ নামে। কিন্তু ক’দিন হলো অনেকেই বিশেষ করে বয়স্ক লোকজন তাকে ডাকছেন ‘গ্রাজুয়েট ফরহাদ’ বলে। বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার ময়দানহাটা গ্রামের তালেব আলীর ছেলে ফরহাদের পুরো নাম আবু মুসা মোহাম্মদ মোস্তফা ফরহাদ। না, রিকশা-ভ্যান চালক বলে তাচ্ছিল্য করে নয়, বরং পড়ালেখার প্রতি ফরহাদের ব্যাপক আগ্রহ এবং শেষ পর্যন্ত স্নাতকে পাশের কৃতিত্ব অর্জনের কারণেই অনেকে তাকে নতুন এই নামে ডাকা শুরু করেছেন। গ্রামবাসীর মতে তারা তো ফরহাদকে তার চাহিদা মত চাকরি দিতে পারবেন না। সেই সামর্থ্যও তাদের নেই। কিন্তু তাকে তার পরিশ্রমের স্বীকৃতিটা তো দেওয়া যেতেই পারে।
গত ২৪ মে স্নাতক পাস কোর্সের ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই তার প্রশংসা সবার মুখে মুখে। প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। সোহেল রানা মিন্টু নামে স্থানীয় এক সাংবাদিক জানিয়েছেন, ফরহাদের নামে আগে ‘গ্রাজুয়েট’ শব্দটি জুড়ে দেওয়ার আরও একটি কারণ রয়েছে বলে গ্রামবাসী তাকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘গ্রামবাসী মনে করেন রিকশা-ভ্যান চালক ফরহাদকে গ্রাজুয়েট বলে ডাকলে তার সম্পর্কে বাইরের মানুষের আগ্রহী তৈরি হবে এবং সেই সুবাদে তার একটি চাকরিও জুটে যেতে পারে।’
ফরহাদ যখন নবম শ্রেণির ছাত্র তখনই তাকে প্রথম রিকশা-ভ্যানের হ্যান্ডেলে হাত রাখতে হয়েছে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত স্কুল আর তার পরে রিকশা-ভ্যান নিয়ে বেড়িয়ে পড়া-এটা তার রুটিন হয়ে গিয়েছিল। উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির পরেও সেই নিয়মের কোন ব্যতিক্রম ঘটেনি। তবে স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তির পর ক্লাশের চাপ কম থাকায় বেশি যাত্রী পাওয়ার আশায় দুপুরেই তিনি বেড়িয়ে পড়েছেন রিকশা-ভ্যান নিয়ে। স্নাতক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর থেকে সারাদিনই যাত্রী আনা-নেওয়া করছেন।
২২ বছর বয়সী ফরহাদ জানান, তার বাবা তালেব আলী এক সময় অবস্থা সম্পন্ন কৃষক ছিলেন। পারিপার্শ্বিক নানা কারণে তার বাবা নিঃস্ব হয়ে এক সময় মানসিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘অভাব অনটনের মধ্যেই আমাদের তিন ভাই-বোনের জন্ম। ব্ড় বোন বেশিদূর পড়ালেখা করতে পারেন নি। তাকে অনেক আগেই বিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার ছোট ভাই পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখার পর মজুরের কাজ খুঁজে নেয়। এক সময়ে বিয়ে করে সে আলাদাও হয়ে যায়। ফলে আমাকেই সংসারের হাল ধরতে হয়েছে।’
স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য আইনুল হোসেন জানান, ছোট বেলায় ফরহাদ মানুষের বাড়িতে কাজ করে সংসারের পাশাপাশি পড়ালেখারও খরচ চালিয়েছে। পরে কিছুদিন সে একটি নার্সারিতেও কাজ করেছে। অনেক দিনই সে না খেয়েও স্কুলে গেছে। পড়ার জন্য প্রয়োজনীয় বই-খাতা কিনতে পারেনি বলে বন্ধুদের সহযোগিতা নিত। সময়মত বেতন দিতে না পারায় শিক্ষকদের বকাও খেতে  হয়েছে তাকে। কিন্তু তার পরেও পড়ালেখা ছাড়েনি ফরহাদ। এভাবে ২০১১ সালে সে মানবিক বিভাগ থেকে এসএসসি এবং ২০১৩ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় সে। এরপর সে উপজেলা সদরে এম এইচ ডিগ্রী কলেজে স্নাতকে ভর্তি হয়।
ফরহাদ জানান, এসএসসি পাশ করার পর অনেকেই তাকে বলতো এত কষ্ট করে পড়ালেখা করে কি হবে। কে তাকে চাকরি দেবে? তিনি বলেন, ‘এধরনের কথা শুনে আমার খারাপ লাগলেও আমি হারতে চাইনি। তাই পড়ালেখা চালিয়ে গেছি।’ আগামীতে তিনি স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করতে চান। তিনি স্বপ্ন দেখেন সরকারি একটা চাকুরী জুটবে তার এবং বৃদ্ধ বাবা-মা’র মুখে হাসি ফোটাবেন। তিনি বলেন, ‘সরকারি অফিসে পিওন পদে চাকরি হলেও আমি করতে রাজি আছি। আমি জীবনের সবকিছুর বিনিময়ে বাবা-মার মুখে হাসি ফোটাতে চাই।’ স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য আইনুল হোসেন জানান, ‘আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আপনাদের মাধ্যমে ফরহাদের জন্য সহযোগিতা চাই। তাকে তার যোগ্যতা অনুযায়ী একটি চাকরি দিলে সে তার বাবা-মা নিয়ে বাকি দিনগুলো সুখে-শান্তিতেই বসবাসের সুযোগ পেত।’

মন্তব্য