| প্রচ্ছদ

২ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকার বড় ধরনে প্রকল্প

বগুড়াসহ তিন জেলার মধ্য দিয়ে বইয়ে যাওয়া বাঙালি করতোয়া ফুলজোড় ও হুরাসাগর নদী খনন শুরু হচ্ছে

পুণ্ড্রকথা রিপোর্ট
পঠিত হয়েছে ২৪৪ বার। প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারী ২০১৯ । আপডেট: ১৫ জানুয়ারী ২০১৯ ।

উত্তরের তিন জেলা গাইবান্ধা, বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া ২১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঙালি, করতোয়া, ফুলজোড় ও হুরাসাগর নদী ড্রেজিং, পুনঃ খনন এবং তীর সংরক্ষণের কাজ চলতি বছরই শুরু হতে যাচ্ছে। ২ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া ওই প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদনের মাত্র দুই মাসের মাথায় গত ১০ জানুয়ারি প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, চার বছর মেয়াদী ওই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য খুব শিগগিরই টে-ার আহবান করা হবে। এজন্য সব ধরনের প্রস্তুতি এরই মধ্যে সম্পন্নও হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পের অধীনে প্রথমে ড্রেজিংয়ের কাজ শুরু হবে। পাশাপাশি তীর সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় কংক্রিটের ব্লক (সিসি ব্লক) তৈরির কাজও এগিয়ে নেওয়া হবে।
নদী খননে বড় ধরনের প্রকল্প গ্রহণের খবরে বাঙালি, করতোয়া, ফুলজোড় ও হুরাসাগর তীরবর্তী লোকজন আনন্দিত। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, বালি আর পলি জমে নদীগুলোর তলদেশ ক্রমশ উঁচু হয়ে গেছে। আর কোন বাঁধ না থাকায় প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টির পানিতই নদীগুলো ভরে যায় এবং দু’কূল উপচানো পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে এবং শত শত একর ফসলী জমির আবাদ নষ্ট করে। খনন করা হলে বন্যার কবল থেকে ফসল যেমন রক্ষা পাবে তেমনি নদীতে পানি ধরে রাখার মাধ্যমে শুস্ক মৌসুমে ফসল সেচসহ মাছের উৎপাদনও বাড়বে।
পাউবোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জে কাটাখালি ও এলাই নদীর মিলনস্থল থেকেই ‘বাঙালি’ নদীর উৎপত্তি। এরপর সেটি উত্তর থেকে দক্ষিণে বগুড়ার সোনাতলা, সারিয়াকান্দি ও ধুনট উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শেরপুর উপজেলার খানপুরে করতোয়া নদীতে গিয়ে মিলেছে। সেখানে নদীটির নাম হয়েছে ‘করতোয়া’। এরপর ওই নদীটি সিরাজগঞ্জের নলকায় গিয়ে ‘ফুলজোড়’ নাম ধারণ করে শাহজাদপুর উপজেলার বাঘাবাড়ির দক্ষিণে হুরাসাগর নদীতে গিয়ে মিশেছে। তারপর সেই নদীর নাম হয়েছে ‘হুরাসাগর’- যেটি যমুনা নদীতে গিয়ে মিলেছে। উৎপত্তিস্থলে নদীটির গড় প্রশস্ততা ৯০ মিটার আর শেষ প্রান্তে সেই প্রশস্ততা বেড়ে হয়েছে ২০০ মিটার। প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নদীর বিভিন্ন অংশে ৩ থেকে ৫ মিটার পর্যন্ত গভীর করা হবে।
মূলত নাব্য ফেরানো, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ভাঙন রোধ এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি ধরে রাখার মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিসহ জীববৈচিত্র সংরক্ষণের জন্য পাউবোর পক্ষ থেকে গেল বছরের মাঝামাঝি ‘বাঙালি-করতোয়া-ফুলজোড়-হুরাসাগর নদী সিস্টেম ড্রেজিং/পুনঃখনন ও তীর সংরক্ষণ’ নামে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। যাচাই-বাছাই শেষে ২ হাজার ৩৩৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয় সাপেক্ষ প্রকল্পটি গত ৭ নভেম্বর একনেকে অনুমোদন দেওয়া হয়।
২১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীর মধ্যে গাইবান্ধা সীমানায় ২৪ কিলোমিটার, বগুড়া সীমানায় ৯৯ কিলোমিটার এবং সিরাজগঞ্জে বাকি ৯৪ কিলোমিটার অংশ ড্রেজিং অথবা পুনঃ খনন করা হবে। এর পাশাপাশি ভাঙ্গণ প্রবণ হিসেবে চিহ্নিত বগুড়া ৩২টি পয়েন্টে ১৯ দশমিক ৫৭ কিলোমিটার এবং সিরাজগঞ্জের ২২টি পয়েন্টে আরও ১৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার অংশে তীর সংরক্ষণ (সিসি ব্লক ফেলে মুড়িয়ে দেওয়া) করা হবে।
বাঙালি নদী তীরবর্তী বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার নারচী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলতাব হোসেন বান্টু জানান, নদী খনন এবং তীর সংরক্ষণের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করায় সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘এক কালের খর¯্রােতা বাঙালি এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। যদি নদীটি খনন করা হয় তাহলে এর নাব্যতা যেমন ফিরে আসবে তেমনি শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি দিয়ে কৃষক ফসলের সেচও দিতে পারবে।’ একই উপজেলার পারতিতপরল গ্রামের কৃষক রনজু মিয়া বলেন, ‘নদী যদি সত্যিই খোঁড়া হয় তাহলে হামাগেরে ধানের আবাদ আগার চ্যায়্যা বাড়বি (আগের চেয়ে বাড়বে)। কারণ বন্যায় ধান আর নষ্ট হবি না।’ ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ছাইহাটা এলাকার জেলে গিজেন্দ্র নাথ বলেন, নদী খুঁড়বি-এডা তো হামাকেরে জন্যি খুশির খবর। কারণ বর্ষা বাদে সারা বছরই নদীটাত পানি থাকে না। তাই হামরা মাছও পাই না। যদি নদী খোঁড়া হয় তাহলে হামরা সারা বছরই মাছ পামো (পাবো)। হামাকেরে কষ্টও আর থাকপি না’
পাউবো বগুড়া বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ জানান, প্রকল্পের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এখন টে-ারের মাধ্যমে শুধু কাজটা শুরু করা বাকি। ধারণা করা হচ্ছে এপ্রিলের মধ্যেই কাজ শুরু হয়ে যাবে। তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নদীটি এই অঞ্চলের আরও অন্তত ৫টি নদীর পানি বাঙালি, করতোয়া, ফুলজোড় ও হুরাসাগর ধারণ করতে পারবে। এর ফলে একদিকে যেমন বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে তেমনি শুস্ক মৌসুমে নদীতে পানি ধরে রাখাও সম্ভব হবে। ফলে মাছের উৎপাদন বাড়বে যার ফলে এ অঞ্চলের জীববৈচিত্র সংরক্ষণ করাও সহজ হবে।’

মন্তব্য