| প্রচ্ছদ

উডবার্ণ সরকারি গণগ্রন্থাগার: পড়া আর জানার নেশায় দিন ফুরিয়ে যায় যেখানে

মুজাহিদুল ইসলাম জাহিদঃ
পঠিত হয়েছে ৮০০ বার। প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০১৮ । আপডেট: ১২ জুলাই ২০১৮ ।

বাংলা বিভাগের ছাত্র মিরাজুলের সম্বল একটি রিকশা-ভ্যান। যাতে করে তিনি ফল বিক্রি করে নিজের ও পরিবারের খরচ যোগান। সরকারি একটা চাকরি তার স্বপ্ন। কিন্তু সেই চাকরির প্রস্তুতির জন্য যেসব বই নিয়মিত পড়া দরকার সেগুলো কেনার সামর্থ তার নেই। তবে এখানে- সেখানে ঘুরে তিনি জানতে পেরেছেন ‘জব কর্ণার’-এর কথা। এক সময় যাওয়া-আসা শুরু করেন মিরাজুল। চাকরি বিষয়ক অনেক বই পড়ার সুযোগ পেয়ে তিনি দারুণ খুশি। রফিকুল ইসলাম নামে অপর এক ব্যক্তি বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। একসঙ্গে অনেকগুলো পত্রিকা পড়ার সুযোগ থাকায় টিফিন পিরিয়ডে তিনিও ছুটে যান। বলছি-‘উডবার্ণ সরকারি গণগ্রন্থাগার’-এর কথা। স্থানীয়দের কাছে বগুড়া উডবার্ণ পাবলিক লাইব্রেরী হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানের পাঠককের তালিকায় শিশু থেকে বৃদ্ধ-সবাই রয়েছেন। বেকার কিংবা চাকরিজীবী এমনকি স্বল্প শিক্ষিত থেকে শুরু করে প্রখর মেধাবী-কে যায় না সেখানে?
সকাল ১০টায় প্রবেশ করার পর কখন যে দুপুর গড়িয়ে ছ’টা বেজে যায় সেটা কেউ মনে না করিয়ে দিলে টেরই পাওযা যায় না। সময় শেষ, তবু গল্প শেষ না হওয়ার আক্ষেপ থেকে যায় অনেকের। কারো কারো প্রত্যাশা থাকে ইশ্! রাত পর্যন্ত পর্যন্ত যদি খোলা থাকতো তাহলে কতই না ভাল হতো! সেখানে সময়টা দ্রুত ফুরিয়ে যায় বলে নির্ধারিত সময়ের আগেই হাজির হন জব কর্ণারের পাঠকরা। শিশুরা ছোটে ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ আর ‘গোপাল ভাঁড়’-এর টানে। স্কুল ছাত্ররা ঢুঁ মারে পাঠ্য বইয়ে পড়া অধ্যায়গুলোর আরও বাড়তি তথ্যের খোঁজে। আর বয়স্কদের অধিকাংশই যান একাধিক দৈনিকের তাজা খবর পড়ার নেশা কাটাতে। একদিন না আসতে পারলে অস্থির লাগে অনেকের। বলা যায় বই আর পত্রিকা পড়ার নেশায় আসক্তদের ঠিকানা হয়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠানটি।
কালের সাক্ষী এ গ্রন্থাগারটি ইতিহাস ধারন ও লালন করে আসছে। বঙ্গভঙ্গ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ-কী নেই সেখানে? প্রায় ৫০ হাজার বই রয়েছে ওই গ্রন্থাগারে। উডবার্ণ সরকারি গণগ্রন্থাগারের প্রধান গ্রন্থাগারিক রোকনুজ্জামান জানিয়েছেন, প্রতিষ্ঠানটিতে লেখক, গবেষক এবং সাধারণ পাঠকদের জন্য আলাদা সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।

একটু ইতিহাসঃ ১৮৫৪ সালে তৎকালীন বগুড়া জেলা কালেক্টরাল সি এস লরকিন ও নওয়াব পরিবারের সহায়তায় এ গ্রান্থাগারটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে তৎকালীন বৃটিশ গভর্ণর জন উডবার্ণ-এর নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। শহরের কেন্দ্রস্থল সাতমাথার দক্ষিণে এডওয়ার্ড [রাণী ভিক্টোরিয়ার পুত্র। ১৮৪১ সালে জন্মগ্রহণকারী সপ্তম এডওয়ার্ড ১৯০১ সালের ২২ জানুয়ারি থেকে ১৯১০ সালের ৬ মে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বৃটিশ ভারতের রাজা ছিলেন] পার্কের ভেতরে নির্মিত লাইব্রেরিটির প্রথমে নামকরণ করা হয় ‘উডবার্ণ পাবলিক লাইব্রেরী’। ২০০৪ সালে ওই পার্কের পশ্চিম কোণে (বাংলা স্কুলের বিপরীতে) পার্কের ৪০ শতাংশ জায়গায় লাইব্রেরির জন্য পৃথক ভবন নির্মাণ করা হয় ২০১২ সালে এটি পুর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হয়। সরকারিকরণের পর এটির নামকরণ বর্তমান নামে করা হয়।
যে
 ধরনের বই মিলবে সেখানেঃ সমসাময়িক বইয়ের পাশাপাশি দুষ্প্রাপ্য অনেক বইয়ের দেখা মিলবে সরকারি এ গ্রান্থাগারটিতে। হস্তলিখিত ৩ টি পাণ্ডুলিপি [১.গোবিন্দকথামৃত (রাজা গৌর গোবিন্দও প্রশংসামূলক বই)। ২. পদ্মপূরান (দেবী মনসাকে নিয়ে লেখা) এবং ৩. হিরণ্যকশিপুর (বারতের হিরণ্য নামকস্থান নিয়ে লেখা)]। এছাছাড়াও বগুড়ার আঞ্চলিক ইতিহাস, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, অর্থনীতি, ইতিহাস, সাহিত্য-সংস্কৃতি, উপন্যাস, আইন, ধর্মীয় বই, ভ্রমণ, নাটক, ছড়া, কবিতা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, শিল্প, ম্যাগাজিন, জার্নাল, কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স ও ট্যাবলয়েড পত্রিকার পাশাপাশি বিদেশী লেখকদেরও বই রয়েছে সেখানে।
পত্রিকা ও সাময়িকীঃ বগুড়া উডবার্ণ সরকারি গণগ্রন্থাগারে বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিকগুলোর পাশাপাশি সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, ষান্মাসিক এবং বাৎসরিক পত্রিকা ও সাময়িকী পাওয়া যায়। আরও রয়েছে চাকুরীর খবর। এছাড়া এখানে পাঠকের প্রয়োজন ও চাহিদার দিক বিবেচনা করে পুরনো পত্রিকাও সংরক্ষণ করা হয়।
ভেতরের পরিবেশঃ নিরিবিলি ও কোলাহলমুক্ত পরিবেশে বই পড়ার মজা নিতে হলে বগুড়া উডবার্ণ সরকারি গণগ্রন্থাগারে যেতেই হবে। বসার জন্য আরামদায়ক চেয়ার-টেবিল যেমন রয়েছে তেমনি আলো ও বাতাসের জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত লাইট এবং বৈদ্যুতিক পাখা। সদস্যরা প্রয়োজনে বই তাদের বাসায় নিয়ে যেতেও পারবেন।
সদস্য এবং বই ধার নিতে পারেন যেভাবেঃ গ্রন্থাগারে বসে বই পড়া সবার জন্য উন্মুক্ত। তবে বই বাসায় নিতে চাইলে সদস্য হতে হবে। এ নিয়মের আওতায় ২টি বই ১৫ দিন রাখা যাবে। সদস্য হতে চাইলে গ্রন্থাগার থেকে দশ টাকার বিনিময়ে ফরম নিতে হবে। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সেখানে জামানত হিসেবে রাখতে হবে। শিশুদের জন্য জামানতের পরিমাণ ২০০ টাকা, ছাত্র ৩০০ টাবা এবং এই দুইয়ের বাইরে অন্যদের জামানত নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০০ টাকা।
গ্রন্থাহার ভবনের যেখানে যা রয়েছেঃ চারতলা গ্রন্থাগার ভবনের নিচতলায় বিশাল মিলনায়তন রয়েছে। ১০০ আসন বিশিষ্ট এ মিলনায়তন যে কোন অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (বর্তমানে এসগিুলো সচল নয়) মিলনায়তনটির ভাড়া অর্ধদিবসের জন্য ১হাজার ৫০০ টাকা আর পূর্ণ দিবসের জন্য ২ হাজার টাকা। ভাড়ার সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত হবে। দ্বিতীয় তলাটি পাঠাগার, যা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। এখানে এক সঙ্গে ৭০জনের বসার ব্যবস্থা রয়েছে। তৃতীয় তলা মূলত ‘জব কর্ণার’ হিসেবে পরিচিত। এক সঙ্গে আশি জন বসতে পারেন সেখানে। এ স্থানটি চাকরি প্রত্যাশীদের জন্য প্রবেশের অগ্রাধিকার রয়েছে। চার তলায় পুরাতন বইসহ পত্র-পত্রিকা সংরক্ষণাগার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
জব কর্নারে নিয়মিত যারাঃ গ্রন্থাগারটি সকাল ১০টায় খোলার আগেই কিছু পাঠক প্রধান ফটকের সামনে হাজির। হাতে বই-খাতা আর চোখে মুখে আকাক্সক্ষা। তারা মুলত জব কর্ণারের পাঠক। পরে গেলে জায়গা হারাতে হতে পারে বলেই একটু আগে প্রবেশের চেষ্টা! এখানে মুলত বিসিএসসহ সব প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বই পাওয়া যায়। গ্রন্থাগার থেকে বই দেওয়া হলেও সেখানে নিজস্ব বই নিয়ে গিয়েও পড়া যায়।  
শিশু কিশোরঃ শিশু কিশোরদের জ্ঞানের বিকাশ ও বিনোদনের বিষয়টিকে সেখানে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফলে গ্রন্থাগার ভবনের পাশের ভবনে শিশু-কিশোর গ্রন্থাগার গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে শিশুতোষ বই, ম্যাগাজিন ও পত্রিকা পাওয়া যায়।
প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানঃ বিশেষ দিনগুলোতে সেখানকার মিলনায়তনে চিত্রাঙ্কন, রচনা ও অন্যান্য বিষয়ের উপর প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে থাকে গ্রন্থাগার কর্তৃপক্ষ।
বাড়তি কিছু সেবাঃ পাঠকদের জন্য বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, ওয়াই-ফাই সুবিধা, ফটোকপি করার সুযোগ এবং ওয়েট মেশিনে বিনামূল্যে ওজন মাপারও সুবিধা রয়েছে।

প্রবেশ এবং অবস্থানের ক্ষেত্রে যেসব বিধি-নিষেধ মেনে চলতে হবেঃ গ্রন্থাগারের অভ্যন্তরে ধূমপান নিষিদ্ধ, ব্যাগ ও বই নিয়ে প্রবেশ করা যাবে না। পাঠ্যবই, ম্যাগাজিন ও অন্য কিছুর পাতা কাটা এবং ছেঁড়া নিষিদ্ধ। মূল্যবান সামগ্রী, নগদ অর্থ ও অন্যান্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র নিজ দায়িত্বে রাখতে হবে। মোবাইল ফোন সাইলেন্ট রাখতে হবে। এক শেলফ-এর বই অন্য শেলফ-এ রাখা যাবে না। এতকিছুর পরেও কোন পাঠকের সন্দেহজনক মনে হলে কর্তৃপক্ষ তার শরীর তল্লাশী করতে পারবেন।
ক্যাটালগ সিস্টেমঃ এ গ্রন্থাগারে কোন ক্যাটালগ সিস্টেম নেই। তবে প্রতিটি বিষয়ের জন্য রয়েছে আলাদা সেলফ। আর প্রতিটি শেলফে বিষয়ভিত্তিক বই সাজানো আছে।
বাড়তি কিছুঃ ‘বিব্লিউ থেরাপি’ নামক একটি বইয়ের মাধ্যমে মানসিক সমস্যার সমাধান করার এক আভিনব চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে ওই গ্রন্থাগারে। গ্রন্থাগারিক জানান, তারা বিনামূল্যে ওই চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। বাড়তি তথ্যের জন্য যোগাযোগ করতে পারেন- প্রধান গ্রন্থাগারিক রোকনুজ্জামান। ফোন: ০৫১-৬৬৭৮৫। ই-মেইল: [email protected]। এছাড়াও ভিজিট করতে পারেন ওয়েব সাইটেও। ঠিকানা:www.publiclibrary.bogra.gov.bd

মন্তব্য