| সাহিত্য

কেবিন নম্বর চব্বিশ [প্রথম পর্ব]

অসীম কুমার কৌশিক
পঠিত হয়েছে ১২০ বার। প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারী ২০১৯ । আপডেট: ২৫ জানুয়ারী ২০১৯ ।

এই সেই চব্বিশ নাম্বার কেবিন। যেখানে আজ থেকে পাঁচ বছর আগে এসেছিলাম।এভাবেই দাঁড়িয়েছিলাম দরজার এপাশে।ভেতরে যাওয়ার সাহস হয় নি সেদিন।মনের ভেতর টা কুড়ে কুড়ে খেয়েছে অজানা এক ভয়। আপনজনকে হারানোর ভয় যে মানুষকে এতটা অসহায় আর স্বার্থপর করে তোলে আগে বুঝিনি।হ্যাঁ অনেকটা স্বার্থপর হয়েছিলাম সেদিন। আমার হৃদয়ে যার জন্য অকৃত্রিম ভালোবাসা, সে যদি হাসপাতালের বিছানায় প্রসব বেদনায় ছটফট করে আমি ভাই হয়ে কেমন করে স্বার্থপর না হয়ে পারি।সৃষ্টিকর্তার কাছে আমার সকল চাওয়া সেদিনের পর থেকে তার জন্যই ছিলো,এখনো আছে।

মৃত সন্তানের জন্ম হয়েছিলো সেদিন।অনেক্ষণ পর জ্ঞান ফেরে অণুর। অণু আমার চেয়ে কয়েক ঘণ্টার বড়। অনেকে আমাদের জমজ ভাই বোন বলে। কিন্তু আমাদের মুখের তেমন কোনো মিল ছিলো না।

অণু হয়েছিলো বাবার মতো আর আমি মামার মতো।ওর পুরো নাম অণুরাধা হলেও ছেলেবেলা থেকেই আমি ওকে অণু বলে ডাকতাম। আর ও আমাকে কাসু বলে ডাকতো। আমার নাম কাসিরাম রেখেছিলো আমার মামা। চেহারাগত একটু মিল থাকার কারণে মামার উপরই আমার নাম রাখার দায়িত্ব পড়ে। ছেলেবেলা থেকেই আমরা দুজনই অনেক দুষ্ট ছিলাম।তবে আমি বেশি মার খেতাম।

অণু কেঁদে কেঁদে মায়ের কাছে নালিশ করতো আর তার ফল আমার পিঠে পরতো।একদিন হয়েছে কি! তখন আমরা সাত -আট বছরের হবো।অণু বসে মাথায় তেল দিচ্ছিলো। আমি পেছন থেকে গিয়ে সব তেল ওর মাথায় ঢেলে দিয়ে এক দৌড়ে পালিয়েছি। বেলা পড়ে গেলে এসেছি। ভেবেছিলাম এতক্ষণে মায়ের রাগ নিশ্চয় কমে যাবে।কিন্তু বাড়িতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আমার গালে, পিঠে অনেক গুলো চড় পড়লো।আমি ঘরে গিয়ে বিছানায় সুয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছি। একটু পর পিঠে জলের অনুভব পেলাম।দেখি অণু আমার পাশে বসে কাঁদছে। আমি ওর দিকে তাকাতেই আমাকে জড়িয়ে ধরে আরো জোড়ে কেঁদে উঠে অণু।আমার সব ব্যাথা যেনো ভালো হয়ে গেলো।

অণুটা এরকমই।এরকম আরও অনেক ভালোবাসার ঘটনা আছে আমাদের।আরেকদিন বলবো অণুর কথা লিখতে বসে হাত কাপছে। বুকের ভেতরটায় কে যেন সজোরে আঘাত করছে।কলুম ফুল অণুর খুব প্রিয়। আমাদের পুকুর পাড়ে অনেক কলুম ছিলো। অনেক অনেক ফুল ফুটতো সেগুলোতে।যখন ফুল ফুটতো সবচেয়ে খুশী হতাম আমি। কারণ অণুটা প্রতিদিন পুকুর পাড়ে এসে দেখতো ফুল ফুটেছে কিনা।তখন আমি ভোর হতেই বিছানা থেকে লাফ দিয়ে নেমে পুকুর পাড়ে আসতাম অণুর জন্য কলুম ফুল তুলতে।ও তখনো ঘুমাতো। আমি ঘরে গিয়ে আলতো করে ওর মাথার ছোট্ট খোপায় দুটো কলুম ফুল গুজে দিয়ে আবার ঘুমিয়ে যেতাম। উঠে দেখতাম অণু আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।আমি চোখ খোলা মাত্র ও আমার কপালে চুমু দিয়ে বলতো আমায় কেমন লাগছে ভাই।আমি বলতাম রাক্ষসীর মতো।অমনি অণু রেগে আমায় তাড়া করে ধরে ফেলতো।দুহাত দিয়ে আমার গাল খামছে ধরে বলতো হাউ মাউ খাউ কাসুর গন্ধ পাউ।আমি ভয়ে বলতাম আমায় খাবেন না আমায় খাবেন না রাক্ষসী।আমি মরে গেলে আমার বোন অনেক কষ্ট পাবে।অণু তখন আমায় বুকের মধ্যে চেপে ধরে বলতো এরকম কথা ফের যদি বলিস তোর একদিন কি আমার একদিন।অণুটা এরকমই।এরপর অনেকটা সময় কেটে যায় এভাবে।

অণুর বিয়ে হয় খুব ধুমধাম করে।

মন্তব্য