| প্রচ্ছদ

প্রসঙ্গ স্বপ্নপুরী ও বগুড়ায় বিনোদন কেন্দ্রের দীর্ঘ শূন্যতা

জাকির আরেফিন শুভ
পঠিত হয়েছে ৫৭৫ বার। প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারী ২০১৯ । আপডেট: ৩১ জানুয়ারী ২০১৯ ।

পিকনিকের ঘোষণা হতেই বগুড়ার একটি বেসরকারী হাসপাতালের কর্মচারীরা হৈ হৈ করে উঠলো। কোথায় যাবে, কি খাবে-সেসব নিয়ে দিনভর চললো আলোচনা আর গুঞ্জন। দিনশেষে সবাই সিদ্ধান্তে পৌঁছুলো-গন্তব্য এবার স্বপ্নপুরী।
মজা করার কত আয়োজনই না আছে সেখানে। একবারটি গেলে পয়সা পুরোই উসুল! 
কিন্তু বিধি বাম। হাসপাতালের জরুরী সার্ভিস ফেলে অত দূরে যাওয়া যাবে না-কর্তৃপক্ষের এমন নির্দেশে বেড়ানোর ইচ্ছার ভবলীলা সাঙ্গ হলো তাদের। কিন্তু মনের মধ্যে একটা আক্ষেপ রয়েই গেল। 
“আহা! বগুড়াতেই যদি স্বপ্নপুরীর মত কোন বিনোদন কেন্দ্র থাকতো তাহলে কত মজাই না হতো!”  
বগুড়াবাসীর প্রাণখুলে হৈ-হুল্লোর করার মত সত্যিই কোন জায়গা নেই। সম্বল বলতে মান্ধাত্বা আমলের এডওয়ার্ড পার্ক (পৌরপার্ক) আর হাল আমলের ওয়ান্ডার ল্যান্ড। আর আছে মহাস্থান। কিন্তু মহাস্থানে আর কতই যাওয়া যায়। সেখানকার ইট-পাথর, গাছ-পালা সবই যেন মুখস্ত হয়ে গেছে এ অঞ্চলের মানুষের। 
“বিনোদন” শুধুমাত্র নিরীহ একটি শব্দ নেই আর। গোটা বিশ্বে এটি এখন শক্তিশালী একটি ব্যবসায়ীক প্লাটফর্ম। যার হাওয়া লেগেছে বাংলাদেশেও। উদাহারণ হিসাবে দিনাজপুরের স্বপ্নপুরীর কথাই ধরা যাক। 
কৃত্রিম চিড়িয়াখানা, বাগান আর সীমিত আবাসিক সুবিধা নিয়ে স্বপ্নপুরীর যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে। পেরিয়ে গেছে ত্রিশ বছর। বর্তমানে আনুমানিক ১৩০ একর জায়গার উপর স্বপ্নপুরীর বিস্তৃত প্রজেক্ট। ধীরে ধীরে সেখানে গড়ে উঠেছে কৃত্রিম ও জীবন্ত চিড়িয়াখানা, রংধনু গ্যালারী, বরফ ঘর, ভুতের বাড়ী, ওয়ান্ডার হুইল, স্পিডবোর্ড, ট্রেন, কেবল কার, রোলার কোষ্টার এমনকি নভোথিয়েটারের মত ব্যতিক্রমী ইভেন্ট। 
পরিবার পরিজন নিয়ে আনন্দের একটি দিন উপভোগ করতে মানুষের আর কি চাই! দিনাজপুরের আনকোরা একটি জায়গায় ছোট্ট পরিসরে শুরু হওয়া স্বপ্নপুরী আজ দেশসেরা এমিউজমেন্ট পার্ক ও পিকনিক ষ্পটের মধ্যে একটি। 
অপরদিকে বগুড়ার কথা ভাবা যাক। বগুড়া উত্তরবঙ্গের রাজধানী। উদ্যোক্তাদের দৃপ্ত পদচারণায় মুখরিত একটি ব্যবসা প্রধান শহর। এই জেলার ভৌগলিক অবস্থান যেকোন বিনিয়োগের জন্য খুবই অনুকুল। যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিভিন্ন স্তরের আবাসিক হোটেলের সহজলভ্যতা এবং জেলার পাশেই মহাস্থানের অবস্থান দেশী-বিদেশী পর্যটকের কাছে এই শহরের আকর্ষন বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুন। সব মিলিয়ে স্বপ্নপুরীর মত একটি বিনোদন প্রকল্পের জন্য বগুড়ার মাটি যথেষ্ট উপযুক্ত ছিল বললে অত্যুক্তি হবে না। 
প্রশ্ন জাগে, এখানকার কোন উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠান এই ৩০ বছরে বগুড়ায় আরও একটি স্বপ্নপুরী তৈরী করলো না কেন! জেলায় জেলায় গড়ে ওঠা বিনোদন প্রকল্পগুলো দেখে তারা অনুপ্রাণিত হলো না কেন! স্বপ্নপুরীতো স্থানীয় উদ্যোক্তাদেরই দূরদর্শীতার ফসল। বগুড়ার স্থানীয় উদ্যোক্তারা এতদিন কি করলো তবে? আক্ষেপ নয়, আবেগের জায়গা থেকেই প্রশ্নগুলি মনে উদিত হয়।


এ প্রসঙ্গে কথা হয় বগুড়া চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ড্রাষ্টিজ-এর সভাপতি মাসুদুর রহমান মিলনের সাথে। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, অন্যান্য জেলার তুলনায় বগুড়ায় জমির মূল্য অনেক বেশী। এতবড় একটা প্রজেক্ট দাঁড় করানোর মত জায়গা পাওয়াটাও দুরুহ ব্যাপার। 
তিনি আরও জানান, বেসরকারী প্রতিষ্ঠান টিএমএসএস বগুড়া শহর হতে মাত্র ৭ কিলোমিটার দূরে ঠেঙ্গামারার ভাটিবালা গ্রামে মেগা এমিউজমেন্ট পার্ক ও পিকনিক ষ্পট নির্মানের কাজ শুরু করেছে। আর বগুড়ার শেরপুর উপজেলায় সাউদিয়া পার্ক সিটি নামে একটি পিকনিক ষ্পট অনেক আগে থেকেই আছে।
এ বিষয়ে বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষের সাথে এ প্রতিবেদকের কথা হয়েছে। দেরীতে হলেও টিএমএসএস’র এই উদ্যোগকে আবালবৃদ্ধবণিতা সকলেই সাধুবাদ জানান। 
আলাপচারিতায় কেউ কেউ এটাও বলেন, মহাস্থানের কারনেই এতদিন বগুড়ার উদ্যোক্তাদের মধ্যে একধরনের গা ছাড়া ভাব কাজ করেছে। তারা হয়তো ভেবেছেন পিকনিক করার জন্য মহাস্থানের বিশাল চত্বর, মিউজিয়াম, গোবিন্দভিটা, বেহুলার বাসরঘরতো রয়েছেই। আলাদাভাবে এমিউজমেন্ট পার্ক ও পিকনিক ষ্পট তৈরীর দরকারটা কি? 
কথাটা কতটুকু সত্য তা আমার জানা নেই।
আসলে শুধু পিকনিক ষ্পট থাকাটাই সব নয়। এর সাথে আধুনিক এমিউজমেন্ট পার্কের ধারণা ও বাস্তবায়ন, ব্যবসায়ীক প্রতিযোগিতা, জেলার সুনাম, কর্মসংস্থান, সৃজনশীলতা ও সর্বোপরি সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
পরিশেষে এই আশাই  করতে পারি-বন্ধাত্ব ঘুচুক। অচিরেই ‘শিল্পনগরী’ বগুড়া নির্মল আনন্দের একটি শহর হিসেবেও পরিচিতি লাভ করুক।
সেদিনের অপেক্ষায় রইলাম আমরা সবাই।

মন্তব্য