| প্রচ্ছদ

বগুড়ায় হাতে লেখা পাঁচটি কোরআন শরীফের সন্ধান মিলেছে

আব্দুর রহিম বগরাঃ
পঠিত হয়েছে ৯৬৯ বার। প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০১৮ । আপডেট: ২৪ জুলাই ২০১৮ ।

হাতে লেখা পাঁচটি কোরআন শরীফের সন্ধান মিলেছে বগুড়ায়। এর মধ্যে চারটিই পাঠযোগ্য। একটির পাতাগুলো ছিঁড়ে গেছে। পাঁচটি কোরআনের মধ্যে চারটিই মিলেছে জেলার কাহালু উপজেলার মুরইল ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসায়। বাকি একটি পাওয়া গেছে পার্শ্ববর্তী বগুড়া সদর উপজেলার এরুলিয়া ইউনিয়নের ঈদগাহ্ মাঠপাড়া গ্রামে।
কাহালুর মুরইলে পাওয়া কোরআর শরীফের পাতাগুলো এখনও বেশ মসৃন এবং রঙও চকচকে। তবে এরুলিয়ার গ্রামে পাওয়া কোরআন শরীফের পাতাগুলো একেবারেই বিবর্ণ এবং ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। ফলে কাছাকাছি দুই এলাকায় পাওয়া বিরল ওই কোরআন শরীফগুলো যে এক সময়ের লিখিত নয় সেটা স্পষ্ট বোঝা যায়।
সংরক্ষণকারী এবং স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী এরুলিয়ার ঈদগাহ্্ মাঠপাড়া গ্রামে পাওয়া কোরআন শরীফের বয়স ৩০০ বছর হতে পারে। অন্যদিকে কাহালুর মুরইল মাদ্রাসায় পাওয়া অপর চারটি কোরআন শরীফ কত আগের সে সম্পর্কে কেউ ধারণা দিতে পারেন নি। অবশ্য স্থানীয়রা বলছেন, মাদ্রাসাটি যেহেতু প্রায় এক শ’ বছর আগে ১৯২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত তাই কোরআর শরীফগুলো তারও ১০-১৫বছর আগের হতে পারে।
মুরইল ইসলামিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার শিক্ষকদের বর্ণনা অনুযায়ী শুরুর দিকে যারা প্রতিষ্ঠানটিতে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তারা ভারতের দেওবন্দ এবং সাহারানপুর মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেছেন। শিক্ষাজীবন শেষে দেশে ফেরার পথে তারা হয়তো হাতে লেখা কোরআন শরীফগুলো সঙ্গে এনেছেন।
হাতে লেখা কোরআন শরীফের প্রচলন কিভাবেঃ
প্রায় সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগে যখন শেষ নবী ও রাসুল হযরত মুহাম্মদের (সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপর পবিত্র কোরআন-এর আয়াত নাজিল হত তখন তিনি তা মুখস্ত রাখতেন। পরে তার কাছ থেকে সাহাবীরা শুনে মুখস্ত করতেন এবং চামড়া, পাথর ও গাছের বাকলে লিখে রাখা হত।
খলিফা হযরত ওসমানের (রাদীআল্লাহ্ তা’আলা আনহু) শাসনামলে পবিত্র কোরআনের সমস্ত আয়াত একত্রিত এবং সংকলিত করা হয়। ওমাইয়া শাসনামল- হাজ্জাজ বিন ইউসুফের সময় কাগজে কোরআন শরিফ লেখা শুরু হয়। হাতে লেখা কোরআন শরিফের শুরুটা ছিল তখন থেকে। তা চলেছে ছাপাযন্ত্র আবিস্কারের আগ পর্যন্ত। ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনামলের ইতিহাসে দিল্লীর বাদশাহ নাসির উদ্দিন ও মোঘল সম্রাট মহীউদ্দিন আলমগীর আওরঙ্গজেব পবিত্র কোরআন শরিফ লেখার জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। অষ্টাদশ শতকের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা হাতে লেখা কোরআন শরীফ শিক্ষা ও নিয়মিত তেলওয়াত করতেন। আর কোরআন শরীফের শিক্ষাটাও হয়েছে তখন বিভিন্ন ওলি আউলিয়া, পীর ও বুজুর্গানে দ্বীনের খানকায়।

এরুলিয়ায় ৩০০ বছর আগের হাতে লেখা কোরআন এলো যেভাবেঃ বগুড়া সদরের এরুলিয়া গ্রামে হযরত শাহ মিসকীন মাহমুদ (রহ.) নামে এক বুজুর্গ ওলি ছিলেন। তাঁর খানকায় তখন দ্বীন শিক্ষা দেওয়া হতো। ইলমে দ্বীনের প্রচার-প্রসারে ওই ওলির খানকা এই অঞ্চলের দ্বীনদার মুসলমানদের কাছে প্রসিদ্ধ ছিল। তা’লীম-তারবিয়ত এবং দ্বীন শিক্ষা ও তার প্রচার-প্রসার কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য হযরত শাহ মিসকীন মাহমুদের (রহ.) খানকার নামে বিপুল পরিমাণ নিস্কর জমি ছিল। ব্রিটিশ শাসনামলে সিএস খতিয়ানে হযরত শাহ মিসকীন মাহমুদ (রহ.) দরগার নামে নিস্কর জমির উল্লেখ রয়েছে। গবেষকদের মতে এটা হতে পারে শেলবর্ষ পরগণার (বর্তমান বগুড়া অঞ্চল) মুসলিম জমিদার সৈয়দ আহম্মদের সময়। সৈয়দ আহম্মদ ছিলেন বগুড়ার নবাব (কুন্দগ্রাম), সাতানী জমিদার, কাথহালি জমিদার, শিবগঞ্জ চৌধুরী জমিদার পরিবারের পূর্বপুরুষ। বর্তমনি কাহালু উপজেলার কালাই রাজবাটিতে বিরাট এলাকা জুড়ে তাঁর প্রাসাদ ছির। তিনি ১৬৭০-১৬৭৫ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে স¤্রাট আওরঙ্গজেবের সাক্ষরিত সনদমূলে শেলবর্ষ পরগণার (বগুড়া অঞ্চল) জমিদারি লাভ করেন। তখন এই অঞ্চলে ভারতবর্ষের পশ্চিম এলাকা যথা দিল্লী, আজমির, পাঞ্জাব, সেরহিন্দ সহ বিভিন্ন স্থান থেকে ওলি, আওলিয়া, বুজুর্গানে দ্বীনের আগমণ হয়। তারা তখন ইসলাম ধর্ম প্রচার-প্রসারে পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। হযরত মিসকিন মাহমুদ (রহ.) তাদেরই একজন হবেন।    
এরুলিয়া ইউনিয়নের ঈদগাহ মাঠ পাড়ার আবু তালেব ফকিরের পূর্ব পুরুষ আব্বাস ফকির ওই দরগার খাদেম ছিলেন। আবু তালেব ফকির জানান, তাদের বংশের পাঁচ পুরুষ থেকে তাদের বাড়িতে হাতে লেখা কোরআন শরিফ ও পীরের ব্যবহৃত পায়ের খড়ম সংরক্ষণ করা হচ্ছে। তবে সংরক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থার অভাবে অনেক আগেই কোরআন শরীফটির মলাট ও বাঁধাই খুলে গেছে। পাতাগুলোও আলাদা আলাদা হয়ে গেছে। এই লেখক ২০০৫-২০০৬ সালে একাধিকবার হাতে লেখা কোরআন শরিফটি দেখেছেন। তখন পবিত্র কোরআন শরীফটি তালেব ফকিরের বড় ভাই আব্দুল খালেক ফকিরের হেফাজতে ছিল। তিনি প্রায় দশ বছর আগে ইন্তেকাল করেছেন। তার আগে তার বাবা মরহুম আত্তার আলী ফকির কোরআন শরীফটি তার বাবা হযরত মিসকিন মাহমুদ (রঃ) এর দরগার খাদেম মরহুম আব্বাস ফকিরের ওছিয়ত মতে সংরক্ষণ করেন। ওই মাজারে প্রাচীন এক জোড়া খড়মও মিলেছে। যা এখনও সংরক্ষিত রয়েছে। তাদের আশা ছিল ধর্মপরায়ণ ও ঐতিহ্য অনুরাগী মানুষ এই হাতে লেখা কোরআন শরীফটি সংরক্ষণে এগিয়ে আসবেন। এই লেখক বর্তমানে কোরআন শরীফটি যে অবস্থায় দেখেছেন তা থেকে প্রায় এক দশক আগে অনেক ভালো ছিল। তবে বিশেষ ব্যবস্থায় বাঁধাই করে হাতে লেখা এই দূর্লভ কোরআন শরীফটি সংরক্ষণ করা সম্ভব বলে মনে হয়েছে।
ওই মাজারের খাদেম মরহুম আব্বাস ফকিরের পরিবার ও গ্রামের অনেকের বিশ্বাস যে, হাতে লেখা কোরআন শরীফ ও পীরের ব্যবহৃত পায়ের খড়ম হযরত শাহ মিসকীন মাহমুদের (রহ.) এবং তা কমপক্ষে ৩০০ বছরের আগের হবে বলে তারা মনে করেন। কালের গর্ভে হযরত শাহ মিসকীন মাহমুদের (রহ.) খানকা হারিয়ে গেলেও খানকাটির সামনে ছিল সান বাঁধানো দিঘী। সান এবং সিঁড়ি না থাকলেও দিঘীটি এখনও আছে। দিঘীর উত্তর পশ্চিম পার্শ্বে ছিল মসজিদ। তা বহু বছর আগে কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। তবে মসজিদের গুম্বজের ইটের পাঁজরে ঠাঁই নিয়ে বেড়ে ওঠা পাকুর গাছটি মসজিদের স্মৃতি ধরে রেখেছে।

মুরইল সিনিয়র মাদ্রাসায় মিলেছে চারটি হাতে লেখা কোরআন শরীফঃ লোকমুখে শোনার পর খোঁজ করতে গিয়ে কাহালু উপজেলার বড়মহর গ্রামে মোঃ আকরাম হোসেন নামে এক মাদ্রাসা শিক্ষকের বাড়িতে মিললো দুটি হাতে লেখা প্রাচীন কোরআন শরীফ। একটিতে রয়েছে উঁই পোকা খাওয়ার চিহ্ন। তবে আয়াত ও আরবি ক্যালিওগ্রাফিতে লেখা হরফগুলো ঠিক আছে। মোঃ আকরাম হোসেন জানান, কোরআন শরিফ দুটি তিনি মুরইল ইসলামিয়া সিনিয়র মাদরাসার লাইব্রেরির বাতিল কাগজের স্তুপ থেকে সংগ্রহ করেছেন। এর আগে মাওলানা আ ন ম আজিজুর রহমান ও কবি মোঃ গাজিউল হক মুরইল মাদরাসায় হাতে লেখা কোরআন শরিফ থাকার খোঁজ দিয়েছিলেন। তাদের কথা অনুযায়ী চলতি বছরের ১৪ জুলাই শনিবার ওই মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা যায়, হাতে লেখা আরও দুটি কোরআন শরীফ লাইব্রেরি কক্ষের সেলফে বাঁধাই করা অবস্থায় সংরক্ষণ করা হয়েছে।

হাতে লেখা কোরআন শরীফগুলো কিভাবে এ মাদ্রাসায় এলোঃ  বর্তমান অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল কালাম আব্দুল হক জানালেন, দ্বীনি এই প্রতিষ্ঠানটি ১৯২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত।  শুরুতে মুরইল মুসলিম জমিদার পরিবারের অনেক অবদান ছিল। অনেকের ধারনা মুসলিম জমিদার পরিবারে অনেক দ্বীনদার মানুষ ছিলেন। যাদের সংগ্রহে হাতে লেখা প্রাচীন কোরআন শরিফ ছিল- যা তারা এই মাদরাসায় দান করেছেন। এছাড়া মাদরাসায় প্রথম দিকে বেশ ক’জন অধ্যক্ষ ছিলেন যারা লেখাপড়া করেছেন ভারতের বিখ্যাত  দেওবন্দ এবং সাহারানপুর মাদ্রাসায়। তাঁর ধারণা শিক্ষাজীবন শেষ করে  দেশে ফেরার পথে তারা সেখান থেকে নিদর্শন স্বরূপ হাতে লেখা কোরআন শরীফগুলো এনেছেন। 

[ লেখকঃ সাংবাদিক ও গবেষক, যোগাযোগ: [email protected], ০১৭ ১৭ ২৫ ৯০ ৮২ ]

মন্তব্য