| সাহিত্য

রেশমা

সাজিয়া আফরিন সোমাঃ
পঠিত হয়েছে ২৫৮ বার

সাড়ে চার বছরের ছোট্ট মেয়েটা গুটি গুটি পায়ে সদ্য বিধবা মা'র হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে। জানে না কোথায় যাচ্ছে তবে সাথে মামা-মামি, নানা থাকায় সে অনেকটা খুশি। অনুমান করছে নানা বাড়ি যাচ্ছে সে।

কদিন ধরে বাড়িতে শুধু কান্না কাটি ছাড়া আর কিছুই হয়নি। ছোট্ট রেশমার শুধু মনে আছে রাতে বাবার পাশে খেতে বসেছিলো সে। রাজহাঁস রানা করেছে বাসায়।বাবা খেতে খেতে বললো বুকে ব্যথা হচ্ছে,পানি দাও রেশমার মা! এরপর আর কিছু মনে পরছে না রেশমার।

দুপুর বেলা বাবাকে কারা যেনো সাদা কাপড়ে করে নিয়ে গেলো। একটা জায়গায় অনেক লোকের ভিড়। নানার কোলে করে রেশমা ভিড়ের ভিতর গেলো,নানা ওর হাতে একটু মাটি দিয়ে সেটা আবার অনেক মাটির উপর ফেলে দিলো। তারপর নানার কোলো করে বাজারে গেলো,নানা চকলেট বিস্কিট কিনে,এদিক ওদিক ঘুরে সন্ধ্যায় বাড়ি নিয়ে এলো।

বাবা আর আসেনি,রাতে আসেনি, খেতে আসেনি। আর এলোনা কেনো এটা বলতে গেলেই মা,দাদি শুধু কাঁদতো। এঘর ওঘর ঘুরে বেড়ায় রেশমা,কেউ তার খবর রাখতোনা, সারাদিন খেলতো কেউ ডাকতো না। সবাই মুখ কালো করে ছিলো এই কয়দিন। বাড়ির মেহমান কমে গেলো ধীরে ধীরে। ছোট মা'র কাছে থাকলো মেজো মামী। তারপর নানা এলো একদিন, মেজো মামা, পাশের বাড়ির সোলেমান চাচা, সবাই অনেক কথা অনেক বোঝাপড়া করলো। ছোট্ট রেশমা সে সবের কি বোঝে? সে খেলায় ব্যস্ত। শুধু দেখলো বড় মাকে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচলে বার বার চোখ মুছতে। আর ছোট মা পাথর হয়ে বসে আছে জলচৌকিতে। তারপর হঠাৎ একদিন সকালে ওরা সবাই রওনা হলো।

দাদী মুখ চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিলো রেশমার। বুকে জড়িয়ে অনেক কাঁদলো। রেশমা কিছু মনে হচ্ছে না। কারন নানা বাড়ি যেতে কান্নার কি আছে। এইতো চলে আসবে কদিন পর।

বড় মা রেশমাকে কাপড় পরালো নিজ হাতে। চুলগুলা বেধে দিলো,সব কাপড় গুছিয়ে তুলে দিলো। ঠিক দরজা দিয়ে বেরুনোর সময় বড় মার চিৎকার করে কান্না শুনতে পেলো। বড় মা কাঁদছে আর বলছে রেশমাকে দিয়ে যা ছোট বউ। আমার বুক ফাঁকা করে দিস না। তুই সব পাবি,সব,আর আমি কি পেলাম? আমাকে একবার দয়া কর।

রেশমা হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে মা এর হাত ধরে। মা এর মুখ শুকনা, কিছু বলছে না,চোখ ছল ছল করছে। পুকুর পাড়ে কি জানি এক পাখি ডেকে যাচ্ছে। এই ডাক রোজ শোনা খুব চেনা তার। বড় মার সাথে রেশমা পুকুর পাড়ে প্রায় আসে। রেশমা খেলে আর বড় মা ওকে চোখে চোখে রাখে। বড় মা'র একটাই পৃথিবী আর সেটা রেশমা। রেশমা জানে তার মা- বড় মা,আর ছোট মা সে তো ছোট মা। বড় মাকে ছাড়া তার ঘুম হয় না,বড় মা না খাওয়ালে ওর খাওয়া হয় না। তাই নানা বাড়ি থেকে যখন আগে ঘুরে বাড়ি আসতো বড় মা তাকে কোলে নিয়েই বলতো "আহারে না খেয়ে খেয়ে কত শুকায় গেছে মেয়েটা"! রেশমার পছন্দের সব খাবার হাজির করতো।

রেশমা যাচ্ছে নানা বাড়ি, বড় মার জন্য মন খারাপ হচ্ছে। এতো কান্নাকাটি করছে কেনো? দাদীর গলা শোনা যাচ্ছে। দাদী ডাকছে- ছোট বউ ওরে একটু দয়া কর,ওর জন্যই তুই এই বাড়ির বউ হইছিস,এতো সম্মান পাইছিস,বড় বউ সব তোরে ছাইড়া দিছে কোনদিন নিজের কথা কয় নাই। একবার ওর কথা ভাব? রেশমারে দিয়া যা। কি নিয়া বউটা বাঁচবে তুই কয়্যা যা? আমি কি নিয়া থাকমু বল?

ছোট মা এবার রেশমার হাত শক্ত করে ধরে তাড়াতাড়ি হাঁটতে শুরু করলো। (চলবে)

মন্তব্য