| সাহিত্য

রেশমা [দ্বিতীয় পর্ব]

সাজিয়া আফরিন সোমাঃ
পঠিত হয়েছে ২৫৬ বার। প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০১৮ । আপডেট: ২৭ জুলাই ২০১৮ ।

মেয়েটার আম খুব পছন্দ,গাছ ভরা আম দেখে এতো খুশি হয়েছিলো! এবার গাছভরা আম এসেছে,পাতায় পাতায় আম ধরেছে যেনো। বাড়ির ভিতর বাহিরে,বাগানে সবখানে আম আর আম। আমগুলো এখন রং ধরেছে। কে খাবে আমগুলা? রইসউদ্দিন খান- রেশমার বাবা খুব শখ করে গাছ লাগিয়েছিলো। বাড়ি ভরা ছেলে-মেয়ে থাকবে তার। আম,জাম এ বাড়ি ভরে যাবে,ছেলে-মেয়েরা আনন্দ করে খাবে-এমনই স্বপ্ন ছিলো তার। লিচু,কাঁঠাল,জামরুল,আতা সব ফলগাছ নিজেই লাগিয়েছিলো।

ওই কামরাঙ্গা গাছের ছায়ায় বসে মেয়েটা খেলতো। রান্না করতো আর একটু পর পর সালেহাকে এনে দিয়ে বলতো- বড় মা দেখো আমি রানছি।
সালেহা খাওয়ার অভিনয় করে বলতো লবন ঝাল সব ঠিক হইছে,আরো বেশী করে রান্ধো। মেয়েটা খুশি হয়ে আবার খেলতে বসতো। সালেহা দু-চোখ ভরা ভালোবাসা নিয়ে তাকিয়ে থাকতো রেশমার দিকে।

কামরাঙ্গা গাছ ভরে গেছে কামরাঙ্গায় কেউ খাওয়ার নাই। ছোট বউ থাকলে সবার জন্য বিকেলে কামরাঙা মাখাতো,সবাই মিলে খাওয়া হতো,কিন্তু এখন? পাখিরাও যেনো আর খেতে আসে না!

সব ফল পরে আছে,আজ না আছে রেশমা,না আছে তার বাবা। পাকা আম সব গাছ থেকে আসতে শুরু করেছে। রেশমার দাদি,বড় মা কেউ ছুঁয়েও দেখছেনা। ওগুলার দিকে তাকালেই বুকে ফেটে যাচ্ছে তাদের।

৮ শতকের উপর বিশাল দোতলা বাড়ি। বাড়ির সামনে সান বাধানো পুকুর ঘাট। পুরাটাই এখন শূন্য। পুরা বাড়ি নিস্তব্ধ ঠিক যেমন ছয় বছর আগে ছিলো। রেশমা যাওয়ার পর লাইলী নাতনীর শোকে বিছানা নিয়েছে। সালেহা দিন-রাত দরজা থেকে চোখ ফিরায় না। এই বুঝি রেশমা এসে "বড় মা" বলে ডাকবে! ভাবতে ভাবতে সালেহা ফিরে যায় অতীতে-

রইসউদ্দিন তার বাবা-মার একমাত্র ছেলে। তার বাবা ছোটবেলাতেই মারা গেছে। মা তার একমাত্র ছেলের জন্য নাম ডাকওয়ালা বাড়ির একমাত্র সুন্দরী স্কুল পড়ুয়া মেয়েকে বউ করে আনে। সুখের সংসার তাদের। বউ,ছেলে নিয়ে এমন সুন্দর দিন কাটবে তাদের এমনই স্বপ্ন লাইলীর চোখে।

বিশাল বাড়িতে বাড়ির মানুষ নাই বললেই চলে আর এক কাজের লোক তার বউ আর ৫ ছেলে-মেয়ে নিয়ে থাকে। সাথে থাকে হাস্না নানী। হাস্না নানী সেই আমলের মানুষ। রইসউদ্দিনকে কোলে পিঠে মানুষ করেছে। বিধবা মানুষ তাই এই বাড়িতেই জীবন কাটিয়ে দিলো কারণ তার যাওয়ার কোন জায়গা নাই। বুড়িটা কানে শোনেনা। কিছু বলে লাভ হয়না,তার যা মন চায় তাই করে দিন পার করে। ইদানিং সালেহাকে বলতে শুরু করেছে- নাতবৌ? তুই আর হামি ছোলকোনাক এন্যা দেকে আসি চল? আর থ্যাকবার পারি না ওই চাঁদ মুক না দেকে।

সালেহা শোনে আর বুকের ভিতর দুমড়ে মুচড়ে যায়। তাই তো কতদিন হয় তার আদরের সন্তান তার কাছে নাই! কিন্তু তাকে শুধু দেখলেই কি সালেহার বুকের ক্ষত সারবে?!

এতো বড় বাড়িতে নাই কোন হট্টগোল,নাই বাচ্চাদের হাসি-কান্না। রইস-সালেহার সংসারে গত ১২ বছরে ৫টা মৃত সন্তান জন্ম নিয়েছে। কোনটা জন্মের পরপরই আবার কোনটা জন্মের আগেই মারা গেছে। কোন ভাবেই তাদের বাঁচানো যায় নি। ডাক্তার,কবিরাজ, এ পুকুরের পানি তো ও বাড়ির পড়া খাবার কোনটাই বাদ রাখেনি সালেহা। কিন্তু নাহ্ এবার আর কোন আশা নাই। সালেহা টের পাচ্ছে সে আর সন্তান জন্ম দিতে পারবে না। দিন দিন ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে সালেহা। ঋতুস্রাব দিনের পর দিন তাকে ভোগাচ্ছে। পাশের গ্রামের নির্মল ডাক্তার তার চিকিৎসা করছে ঠিকই কিন্তু ভালো হওয়ার কোন আশ্বাস পায়নি সে। তাই সালেহা সব আশা ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু তার বাড়ি ভরা সন্তান চাই। মা বলে ডাকবে এমন কাউকে চাই। তার বুকে জড়িয়ে ধরার কেউ চাই। এই আশা নিয়েই দিন পার করছে।

শাশুড়ি,প্রতিবেশী,আত্মীয়রা বললো- "সালেহা কত পোলাপাইন আছে বাপ-মা মরা,এর থেকে পালব্যার নে। এতিম বাচ্চার ঝামেলা কম,কেউ লিব্যার আসবি না। আর তোরও বাচ্চার শখ মিটবি"। কিন্তু রইসউদ্দিন চান না এসব নিয়ে কথা বলতে। সালেহা তার প্রিয় স্ত্রী। সালেহা কোন ভাবে কষ্ট পাক সেটা সে চায়না। তাই এই ধরনের কথোপ-কথন থেকে নিজেকে দূরে রাখে। কিন্তু না,সালেহার চাই নিজের সন্তান,তার নিজ বংশের প্রদীপ,যে হবে সত্যিই তার পরিবারের কেউ। সালেহার মাথায় সারাদিন চলছে কি করবে সে,কি করে সম্ভব এটা?

এরই ভিতর গোপনে সালেহা মেয়ে দেখতে আর খুঁজতে শুরু করেছে। যেখানে যার বিবাহযোগ্যা মেয়ে আছে সেখানেই সে চলে যায়। স্কুল মাষ্টার যতিন এর কাছে একটা মেয়ের খবর পেলো। মেয়েটার নাম সুফিয়া। সালেহা বাড়িতে না বলে গোপনে একদিন সুফিয়াকে দেখতে গেলো। ১৩ বছরের ভীষন সুন্দরী মেয়ে সুফিয়া। বাবা অত্যন্ত পরহেজগার,সচ্ছল পরিবার। ৭ ভাই এর আদরের একমাত্র বোন সুফিয়া।

মেয়েকে যে দেখতে এসেছে সে হয়ত পাত্রের কাছের কেউ হবে ভেবে মেয়ে দেখা পর্ব শেষ হলো। সুফিয়াকে দেখে সালেহার মন আনন্দে ভরে গেলো। খান পরিবারের যোগ্য বউ হবে সে। সু-সন্তানে ভরে যাবে খান পরিবার। খুশিতে জড়িয়ে ধরলো সুফিয়াকে সালেহা। নিজের হাতের প্রিয় বালাজোড়া খুলে পরিয়ে দিলো সুফিয়ার হাতে। এই বালাটা রইস তাকে দিয়েছিলো নিজে পছন্দ করে। সালেহা ভাবে সে তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস এই মেয়েটিকে দিতে যাচ্ছে সেখানে এই বালা দুইটা কিছুই না।

তবে এসব না ভেবে এবার সবচেয়ে বড় কাজ করতে হবে তাকে আর তা হলো মেয়ের বাবাকে রাজি করানো আর তারপর দুনিয়ার সবচেয়ে কঠিন কাজ তার সামনে সেটা হলো নিজের স্বামীকে অন্যের কাছে সমর্পণ করা। ভীষন কষ্টের এটা যেকোন মেয়ের জন্য। সালেহার কাছে তার চেয়ে বড় কষ্ট আর অপমানের সেটা হলো-সে এখন পর্যন্ত একটাও সুস্থ সন্তান উপহার দিতে পারেনি ঐ পরিবার কে।

সালেহা মনে মনে ভাবে সব করবে সে শুধু তার বিনিময়ে তাকে মা বলে ডাকার কেউ আসুক পৃথিবীতে। মৃত্যুপুরীতে প্রান ফিরে আসুক,বাড়িটা আবার আলো ঝলমলে হয়ে উঠুক।  (চলবে)

মন্তব্য