| সাহিত্য

রেশমা [তৃতীয় পর্ব]

সাজিয়া আফরিন সোমাঃ
পঠিত হয়েছে ১৭৬ বার

সুফিয়ার বাবা বসির উদ্দিন মন্ডলের সামনে বসে আছে সালেহা। বসির উদ্দিন বেশ খুশি মনে আছে কারন তার বাসায় রইস উদ্দিনের স্ত্রী তার মেয়ের বিয়ের কথা নিয়ে এসেছে। আস পাশের গ্রামের সবাই রইস উদ্দিনকে এক নামে চেনে। সম্ভ্রান্ত পরিবার,৭ গ্রামের মানুষের বিচার-শালিস, সব রকম সাহায্য করে রইস উদ্দিন। তার কাছে গিয়ে কেউ কোনদিন খালি হাতে ফিরেনি। বসির উদ্দিন একটু সংকোচ নিয়েই জানতে চাইলো-

বসির উদ্দিন- তো মা আপনি যে পাত্রের জন্য আমার মেয়েকে যোগ্য মনে করলেন সে পাত্র কি করে? আপনার কি কেউ হয়? আপনার পরিবারের পরিচিত হলে আমি নিশ্চিন্ত হবো।

সালেহা উঠে বসির উদ্দিন এর হাতটা ধরলো,নিজের চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পরতে লাগলো,এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না ডুকরে কেঁদে উঠলো সালেহা।

সালেহা- বাবা আপনার মেয়েটাকে আমাকে দেন,আমি ওকে নিজে হাতে সাজায়ে নিয়ে যাবো,ওর কোন ইচ্ছা,চাওয়া অপূর্ণ রাখবো না,আমি ওর জীবনে কোনদিন দুঃখ আসতে দিবো না। শুধু মেয়েটাকে দেন।

বসির উদ্দিন- মা আপনি শান্ত হন,মেয়ে হয়ে যখন জন্মেছে তখন স্বামীর ঘরে যেতেই হবে। ভালো থাকা না থাকা সেটা তার ভাগ্য।

সালেহা- খান বংশের বাতি চাই আমি,আপনি এই নিস্ব মানুষটাকে দয়া করেন বাবা।

সালেহার এমন আকুতি দেখে বসিরউদ্দিনের চোখ ভিজে গেলো। সালেহা কে একটু শান্ত করে বললো-

বসির উদ্দিন- মা সব বুঝলাম,আমার আপত্তি নাই,তবে পাত্রকে একবার দেখতে পারলে মনের শান্তি মিলতো।

সালেহা- বাবা আপনি ছেলেকে চিনেন। "রইসউদ্দিন খান"। আমি তার জন্য আপনার মেয়েকে চাইতে আসছি।

বসির উদ্দিনের চেয়ারটা যেনো নড়ে উঠলো। "কি? এইটা আপনি কি বলেন মা? এটা আমি কি করে করি? তিনি নামী মানুষ,সবাই তাকে চেনে,আমি তার ঘরে মেয়ে দিতে পারলে ধন্য হতাম। কিন্তু মা আমি সেটা পারবো না।"

"আমার একমাত্র মেয়ের জীবন নষ্ট হোক সেটা আমি চাইনা। আপনি চলে যান।"

সালেহা আর পারছে না। কান্না থামিয়ে নিজেকে শান্ত করে বললো-"বাবা আমার বাবা মারা গেছেন অনেক আগে,আমি আপনাকে বাবা ডাকছি, এই মেয়ের কথাও একবার ভাবেন। আমি মা ডাক শোনার জন্য আমার স্বামীকে আবার বিয়ে দিচ্ছি,আমাকে কেউ এই কাজে বাধ্য করেনি। আমি নিজের ইচ্ছাতেই আপনার কাছে আসছি। আমার বাড়ি ভরে উঠবে বাচ্চাদের কথায়-কান্নায়,হাসিতে শুধু এটাই আমার চাওয়া। এর জন্য যদি আপনারা চান তাহলে আমি সুফিয়ার নামে ৫ বিঘা জমি লিখে দিবো। বাড়ি,পুকুর,বাগান ওর নামে দিয়ে দিবো। ওর ছেলে- মেয়েদের আমি আমার নিজের সব জায়গা- জমি লিখে দিবো। আমি কথা দিচ্ছি কোনদিন আমি ওকে সতীনের চোখে দেখবো না। আমার বোন হয়ে থাকবে।

বসির উদ্দিন- আমি পরিবারের সাথে কথা না বলে মত দিতে পারবো না, দেখি তারা কি বলে, কি চায়!

বেশ কয়েকবার গিয়ে শেষে সালেহা বসির উদ্দিনকে রাজি করায় এই বিয়েতে। সালেহা গ্রামের আলতাফ কে শহরে পাঠালো বিয়ের সবচেয়ে সুন্দর শাড়ী,ওড়না, ক্রিম,আলতা আর ঘর সাজানোর জরি আনতে। নিজের যত গহনা আছে সব সে সুফিয়া দিয়ে দিবে। কি হবে ওগুলা নিজের জন্য রেখে! হাসুলিটা গত বছরই বানানো। "রমজান সোনার"এর খুব নাম ডাক।এলাকায় সবচেয়ে ভালো গহনা বানায় সে। তার কাছেই ৭ ভরি দিয়ে বানানো হাসুলিটা। কানের মাদুলি জোড়াও ওই সময় বানানো। বাকী যা আছে সাথে সবই দিয়ে দিবে সালেহা। এসব কিচ্ছু চাইনা তার,শুধু একটা প্রদীপ চায় সে।

রইস উদ্দিন আগাগোড়ায় নাখোশ এই বিয়েতে তার একটা পরিচিতি আছে এলাকায়,তার নামে মানুষ খারাপ বলবে,তার উপর এতো ছোট একটা মেয়ে! কাল সারা রাত সালেহাকে বুঝিয়েছে যে তার বংশ প্রদীপ দরকার নাই। সালেহাকে নিয়ে সে অনেক সুখী। আর কি দরকার? "ছেলে মানুষি করো না সালেহা,সময় আছে এখনও তুমি মত বদলাও।" কিন্তু সালেহাকে কোন ভাবেই বুঝানো যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে তার এই পাগলামি মানতে হচ্ছে তা না হলে হয়ত একেবারেই বিছানা নিবে সালেহা।

সালেহার শাশুড়ি লাইলী কিছুই করতে পারছে না। সালেহাকে বুঝাতে গেলে সে উল্টা শাশুড়ি কে বুঝাতে বসে! সালেহা যে ভাবে সংসারটাকে আগলে রেখেছে তাতে তার উপর সব ভার নিশ্চিন্তে দেওয়া যায়। কিন্তু এখানে তার ছেলে আর ছেলের বউ এর ভালো থাকা না থাকা নির্ভর করছে। কে জানে তাদের সুখের সংসার এবার ভাঙ্গতে শুরু করবে কিনা! দেখতে দেখতে দিনগুলা পার হয়ে যাচ্ছে!

হাস্না নানী খুব কাজে ব্যস্ত আছে। খৈ,মুড়ি ভাজা,খই এ গুঁড় দিতে হবে। নারিকেলের নাড়ু বানাবে,আরো কত কাজ! নতুন বউ আসবে সেই ঘরটা ও তো নতুন করে গোছাতে হবে? আজ একটা দিনই সময়। বাড়িতে দূরের মেহমান আসা শুরু হয়ে গেছে।

ট্রাংক থেকে নিজের কাপড় বের করতে গিয়ে বিয়ের শাড়িটা চোখে পরলো সালেহার। জামছিলা রং এর শাড়ি,কলকাতা থেকে শাশুড়ি আনিয়েছিলো সোলাইমান ভাইজানকে দিয়ে। কত স্মৃতি! সালেহা নিজের জিনিসগুলা শাশুড়ির ঘরে পার করছে। তার আলাদা ঘরের কোন দরকার নাই। বউ শাশুড়ি গল্প করেই সময় পার করবে এক ঘরে। সালেহা তার ঘরে দাঁড়িয়ে আছে। আজ থেকেই ছেড়ে দিবে সে এই ঘর।

তাদের ঘরের খাট টা খুব পছন্দ করে সেগুন কাঠে বানিয়ে নিয়েছিলো। খাটের পাশে বিশাল আকারের একটা চেয়ার আর তার পাশে একটু ছোট আকারের আর একটা চেয়ার। সালেহা আর রইস মাঝে মাঝে পাশাপাশি বসে পান চিবাতো আর গল্প করতো। আজ সব কিছু ছুঁয়ে দেখছে সালেহা,আর এভাবে এ ঘরে কখনও ঢুকতে পারবে কিনা সে জানে না,আর সে নিজেও চায় না এ ঘরে বার বার এসে রইসকে বিব্রত করতে।  

হাস্না নানীর ডাকে সালেহার ঘোর কাটে। নিচে বসে,বিছানায় মাথা দিয়ে আছে সালেহা। কখন এভাবে সে বসেছে মনে নাই। চোখ থেকে যে বর্ষণ হয়েছে তা বিছানাকেও স্পর্শ করে গেছে। একই বাড়িতে থেকেও একজন মানুষ কাল থেকে পর হয়ে যাবে,যার উপর কোন অধিকার থাকবে না। জোর দিয়ে হয়ত আর কিছু বলতে পারবেনা। একসাথে বসে পান খেতে খেতে গল্প করা,মাঝ রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠে বসে থাকলে সেটা দেখে কেউ বলবেনা- "সালে আমি আছি তাও এতো দুঃখ পাও কেনো?" এটা কতটা কষ্টের তা আজ সালেহা খুব বুঝতে পারছে। (চলবে)

মন্তব্য