| প্রচ্ছদ

বগুড়ায় ফসলি জমি কেটে মাটি-বালু লুটের মহোৎসব

শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি
পঠিত হয়েছে বার। প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২১ ১২:৪৭:০২ ।

বগুড়ার শেরপুরে ফসলি জমি কেটে মাটি ও বালু লুটের মহোৎসব চলছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীসহ সব মহলকে ম্যানেজ করে অনেকটা দাপটের সঙ্গেই মাটি-বালু লুটের প্রতিযোগিতায় মেতেছেন প্রভাবশালী বালুদস্যুরা। তাই স্থানীয় প্রশাসন বারবার অভিযান চালিয়েও তাদের থামাতে পারছেন না। বরং বালুখেকোরা আরও বেপরোয়া। দিনে-রাতে সমানতালে ড্রেজার ও খননযন্ত্রের মাধ্যমে ফসলি জমির বুক চিরে অবৈধভাবে মাটি-বালু উত্তোলন করে চলেছেন। এতে করে শতশত বিঘা কৃষি জমি বিনষ্ট হচ্ছে। ফলে কমতে শুরু করেছে খাদ্য উদ্বৃত্ত এই উপজেলার আবাদি জমির পরিমান।


এদিকে কৃষি জমি সর্বনাশ করে অবাধে কাটা মাটি যাচ্ছে বিভিন্ন ইটভাটায়। অতিরিক্ত মাটি পরিবহন আর ওভারলোড ড্রাম ট্রাক ও ট্রাক্টর চলাচলের ফলে নষ্ট হচ্ছে গ্রামীণ সড়ক। এছাড়া ধুলা-বালিতে পরিবেশ মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। সাধারণ মানুষও অতিষ্ঠ। 


সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, এই উপজেলার দশটি ইউনিয়নে অন্তত চল্লিশ থেকে পঞ্চাশটি জায়গায় খননযন্ত্রের মাধ্যমে ফসলি জমি কেটে মাটি-বালু লুটে নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া আরও আট থেকে দশটি জায়গায় জলাশয় সংস্কারের নামে মাটি কেটে বিক্রির পাশাপাশি ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। আর এই কাজে জড়িত শতাধিক প্রভাবশালী বালুদস্যু। এদের রাজনৈতিক পদ-পদবি না থাকলেও সবাই ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ ও বিএনপির কর্মী-সমর্থক। তাই প্রশাসনসহ সব মহলকে ম্যানেজ করতে তেমন বেগ পেতে হয় না তাদের। প্রভাবশালী এই দস্যুবাহিনী প্রথমে বিশাল মাঠের মাঝখানে কমদামে জমি কিনে থাকেন। এরপর সেই ফসলি জমি থেকে শুরু করেন মাটি বিক্রি। সেইসঙ্গে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে রাতের আঁধারে তোলা হয় বালু। তৈরী হয় বিশাল আকারের গর্ত। স্বাভাবিক কারণেই আশপাশের জমি ভাঙতে শুরু করে। এরপর ভয় দেখিয়ে ওইসব ফসলি জমি কিনে শুরু করা হয় মাটি-বালু উত্তোলন। এভাবে মাটি-বালুর লোভে কৃষি জমির সর্বনাশ করা হচ্ছে।


স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফসলি জমি কেটে মাটি ও বালু লুটের মহোৎসবে মেতেছেন উপজেলার খামারকান্দি ইউনিয়নের শুভগাছা এলাকায় লাভলু মিয়া, ভাতারিয়া ও বোয়ালমারিতে বিধান চন্দ্র, কাফুড়া নিসকিপাড়ায় আইয়ুব আলী, খামারকান্দির বড়বিলায় নান্নু মিয়া, গাড়ীদহ ইউনিয়নের দামুয়া গ্রামে আব্দুল খালেক, চন্ডিজান এলাকায় আনোয়ার হোসেন, মির্জাপুর ইউনিয়নের রাজবাড়ী ও শংকরহাটা গ্রামে আব্দুল মজিদ, দড়িমুকন্দ্র ও মাকোরকোলায় আব্দুল খালেক মিয়া, খানপুর ইউনিয়নের ভস্তাবিলে নজরুল ইসলাম ও বেল্লাল হোসেন, কুসুম্বী ইউনিয়নের পানিসারা হিন্দুপাড়া গ্রামে শ্যাম ঠাকুর, দক্ষিণ আমইনে আব্দুল মান্নান মিয়া, নামা জামুর গ্রামে হেলাল উদ্দিন। এছাড়া ভবানীপুর ইউনিয়নের বড়াইদহ, ছোনকা ইটভাটার পাশে, কুসুম্বী ইউনিয়নের বাঁশবাড়িয়া-উঁচুলবাড়িয়া, ধাওয়াপাড়া, টুনিপাড়া, হাপুনিয়া বটতলা, আলতাদিঘী বোর্ডের হাটসহ আরও অন্তত বিশটি পয়েন্টে ফসলি ও জলাশয় সংস্কারের নামে বালু উত্তোলন ও মাটি কাটার অবৈধ উৎসব চলছে বলে জানান তাঁরা।


ভুক্তভোগী কৃষক আব্দুল হামিদ বলেন, আমার পাশের ছয় বিঘা জমি কিনে মাটি-বালু উত্তোলন করছে প্রভাবশালী বালুদস্যুরা। এ কারণে সেখানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এজন্য আমার দুই বিঘা ফসলি জমিও ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এছাড়া সড়কের পাশের জমিগুলোতেও ট্রাক থেকে মাটি-বালু পড়ে সবজি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু বলার কিছুই নেই। নিষেধ করলে জমি বিক্রি করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। এমনকি বেশি বাড়াবাড়ি না করার জন্যও এলাকার চিহিৃত ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে হুমকি-ধামকি দেওয়া হয়। তাই ভিটেমাটি নিঃশেষ হয়ে গেলেও তাদের মতো গ্রামের সাধারণ মানুষের পক্ষে করার কিছুই নেই বলে আক্ষেপ করেন তিনি।


খানপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম রাঞ্জু অভিযোগ করে বলেন, সরকারি আইনকে বৃদ্ধাঙলি দেখিয়ে ফসলি জমি কেটে অবাধে মাটি-বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। আর এসব মাটি পরিবহনের ওভারলোড ট্রাকের কারণে গ্রামীণ পাকা সড়ক নষ্ট হচ্ছে। বিষয়টি প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্তা ব্যক্তিদের জানানোর পর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মাটি-বালু উত্তোলন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর দু-একদিন বন্ধ থাকলেও আবারও আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে ওদের। হয়তো বালুদস্যুদের খুঁটির জোর শক্ত। তাই প্রশাসনও নির্বিকার। কোনো বাধাই মানছেন তারা। অবাধে মাটি-বালু উত্তোলন করায় কৃষি জমি ও পাকা সড়কের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। এ অবস্থায় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই জনপ্রতিনিধি।


উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মাসুদ আলম বলেন, ফসলি জমির মাটি কাটার কোনো সুযোগ নেই। জমির উপরিভাগের মাটি কাটার কারণে উর্বরতা শক্তি হ্রাস পায়। আর বালু উত্তোলন করা হলে ধ্বসে গিয়ে বড় বড় গর্ত হয়ে বিনষ্ট হবে। তাই যেকোনো মূল্যে কৃষি জমি রক্ষা করতে হবে। কারণ কৃষি জমি কমে গেলে খাদ্য উদ্বৃত্ত এই উপজেলায় খাদ্যের সংকট দেখা দেবে। বিষয়টি সবাইকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখার জন্য অনুরোধ করেন তিনি।


এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিয়াকত আলী সেখ বলেন, অনুমতি ছাড়া জমির শ্রেণী পরিবর্তন করা আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ। তাই ফসলি জমি কেটে মাটি-বালু উত্তোলন করার খবর পেয়েই একাধিকবার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। জরিমানাসহ বেশকয়েকটি খননযন্ত্রও জব্দ করা হয়েছে। এই অভিযান চলমান রয়েছে। এখানে অবৈধভাবে মাটি-বালু উত্তোলন করার কোনো সুযোগ নেই। তাই খোঁজখবর নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করে অবৈধ মাটি-বালু উত্তোলন সব বন্ধ করে দেওয়া হবে দাবি করেন এই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

মন্তব্য