| সাহিত্য

রেশমা [অষ্টম পর্ব]

পঠিত হয়েছে ২৪৪ বার

সালেহা? সালেহা? খোল আমি?

সালেহা ভাবে সেকি স্বপ্ন দেখছে নাতো? কি করে সম্ভব?সালেহা দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলে দিলো। বাহিরে তার সেই প্রানপ্রিয় মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। সালেহার মন কেঁদে উঠলো,দু-চোখ ভিজে গেলো।

রইস- আমি জানি তুমি আজ ঘুমাবে না,বন্দুক নিয়ে আছো কেনো, মারবে? মারো। মারার আর বাকী কি রেখেছো?

সালেহা- মারবো না,আপনাকে বাঁচাবো বলেই তো নিজেকে কষ্ট দিয়ে এইসব করা।

রইস- বাঁচতে দিচ্ছো কই? এই মাঝরাতে এতো পথ পায়ে হেঁটে বাড়ি এলাম,এ কি বাঁচানোর লক্ষণ?!

সালেহা - রোকন রইস উদ্দিন খান অথবা রেশমা রইস খানম বাঁচবে আপনার নাম নিয়ে,এটাও কি বাঁচা না?

রইস- সালেহা এতো স্বপ্ন দেখো ন। জানি না তোমার স্বপ্ন পুরন করতে পারবো কিনা? তুমি এর ভিতর নামও ঠিক করে ফেলছো!!!

সালেহা- অনেক পথ কষ্ট করে আসছেন। ঘরে যান, ঘুমান। আর নতুন বউ আর তার বাড়ির লোকেরা কি মনে করলো বলেন?

রইস- আমি বলেই আসছি। বলেছি একটা দরবার আছে গ্রামে,বেশী রাত হলে আর ফিরবো না। তুমি বসো আমার পাশে,আজ আকাশ দেখবো। আর কিছু খাবার থাকলে দাও।

সালেহা- আপনি না খেয়ে আছেন? কেনো কিছু খান নি।আপনার তো ঔষধ খেতে হয়!

রইস- আমার জন্য আনতে বলিনি। তুমি খাওনি কিছু তাই যাও নিয়ে আসো একসাথে খাই।

রইস আর সালেহা পান নিয়ে বসেছে। কথায়-কথায় ভোর হয় হয়।  

সালেহা- আপনি  এবার ঘুমান আমার অনেক কাজ।

রইস ঘুমাতে চলে গেলে সালেহা শাশুড়িকে ডাকতে যায়। তাকে অজু করাতে হবে।

সকাল বেলা মন্ডল বাড়ির নাসিরের বউ বুলী ছুটতে ছুটতে আসলো সালেহার কাছে।

বুলী- মামী, ও মামী একনই চলেন বাড়িত,শেলীর অবস্থা ভালো লয়।

সালেহা- কি কস মা? আমি না কছলাম নির্মল ডাক্তারকে আগেই কয়া থুস,একন তাক কই পাবু?

বুলী- আপনি আগে চলেন। আপনি থাকলে সাহস পায় আম্মা। আর আপনার ভাগনা সানু বুবুক ডাকবার গেছে।

শেলী মন্ডল বাড়ির ছোট মেয়ে। দেখেশুনে ভালো ছেলে দেখেই শেলীর বিয়ে দিয়েছিলো। মেয়েটি কখনও কোন অভিযোগ করেনি বাবা- মার কাছে। মেয়েটার বাচ্চা হবে ৭ মাসে পরেছে,তাই বড় ভাবী বুলী আর ভাই নাসের বোনকে আনার কথা বলতে গেলো। ওরা শেলীর শশুড় বাড়ির গেটে দাঁড়াতেই চিল্লাচিল্লি আর কান্নার শব্দ পেলো। মনটা অস্থির হয়ে উঠলো ওদের। ভিতরে ঢুকে ওরা যা দেখলো তাতে ওই অবস্থায় এক কাপড়ে ওরা শেলীকে বাড়ি নিয়ে আসলো। মেয়েটাকে ওরা যেভাবে মারতে দেখেছে তাতে ওকে আর শশুড় বাড়ি পাঠানোর কোন ইচ্ছাই নাই।

মেয়েটা তখন থেকেই অসুস্থ। অনেক সমস্যা হচ্ছে তার পর থেকেই। সালেহা মাঝে মাঝেই যায় মেয়েটাকে দেখতে। কিছুই খেতে পারেন,তাই শরীরও দূর্বল। আজ সময়ের আগেই মেয়েটার পানি ভাঙ্গতে শুরু করেছে।হাতের কাছে কোন ডাক্তার নাই। শহরে নিয়ে যেতে দিনশেষে রাত হয়ে যাবে,তাও রাস্তা ভীষণ খারাপ। সানু দাই দেখে এসে যা জানালো তাতে ব্যথা না উঠলে সে কিছু করতে পারবেনা,আর যে ভাবে পানি ভাঙ্গছে তাতে বাচ্চা বাঁচবে কিনা কে জানে?

এদিকে মেয়েটার খুব জ্বর রাত থেকে। এখন আবার খিঁচুনি শুরু হয়েছে। নাসির গেলো কিছু একটার ব্যবস্থা করতে যেনো শেলীকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া যায়।

নাসির ফিরে আসার আগেই শেলী চলে গেলো। ১৩ বছরের মেয়েটা একাই সব সহ্য করে নীরবে চলে গেলো। সালেহা নিজে শেলীর গোসল করালো কাফন পরালো। তার কষ্টটা একটু বেশিই। তারও সন্তানরা এভাবে নীরবে চলে গেছে,পার্থক্য শুধু সে বেঁচে আছে,শেলীর মতো সেও সাথে যেতে পারেনি। এভাবে চলে যেতে পারলেই হয়ত বেঁচে যেতো - মনে মনে ভাবে সালেহা।

দুইদিন পার হয়ে গেলো,সুফিয়াকে আনতে যাওয়ার দিন আজ। কথা অনুযায়ী সালেহা সুফিয়াকে নিয়ে বাড়ি ফিরলো।

শেলী মারা যাবার পর কয়টা দিন থাকতে পারলে ভালো হতো,কিন্তু সালেহা নিরুপায়,তাকে আজই যেতে হবে, তাই লাইলীর ঘরে গিয়ে তাকে সালাম করলো সালেহা।

লাইলী- তুই সালাম করিস ক্যা বউ?

সালেহা- আম্মা অনেকদিন মা কে দেখিনি,কোন খবরও পাইনা। তাই আজ যাচ্ছি মাকে দেখতে। চিন্তা করেন না আম্মা ২/৩ দিন পরই চলে আসবো। হাস্না নানী সব দেখে রাখবে। মুন্সি চাচার পালকি,আমার কোন সমস্যা হবে না।

লাইলী- চোখ মুছতে মুছতে সালেহার মাথায় হাত রাখলো,সেতো সবই বোঝে,বলতে চায় অনেক কিছু। কিন্তু কিছুই বলতে পারলো না।

সালেহা পালকিতে উঠার সময় হাস্না নানীর হাতে একটা ভাঁজকরা কাগজ দিয়ে বললো-

"নানী এইডা তোমার নাতি খাঁ সাহেব কে দিও। আর আম্মার খেয়াল রাখবা,ছোট বউরে বাড়ির সব নিয়ম বুঝাই দিও। আমারে যে ভাবে শিখাইচো,বুঝাইচো সে ভাবেই ওরে শিখাইও। আমি কয়টা দিন পরই আসবো।

শ্রদ্ধেয় খান সাহেব,
আমার সালাম নিবেন,এই প্রথম আপনাকে চিঠি লিখছি। আগে কখনও প্রয়োজন হয়নি তাই। আপনাকে না জানিয়েই মা কে দেখতে যাচ্ছি। চিন্তা করবেনা,মা ভালো আছেন। অনেক দিন সেখানে যাওয়া হয়নি,আর বাড়িতে যেহেতু ছোট বউ এসে গেছে তাই ভাবলাম আমি সব দায়িত্ব থেকে একটু ছুটি কাটিয়ে আসি।

নিজেদের যত্ন নিবেন,আমাকে নিয়ে চিন্তা করবেন না,আমি ক-টা দিন থেকেই ফিরে আসবো।

ইতি
সালেহা

রইস হাস্না নানীর কাছে থেকে  সালেহার এই চিঠি পেয়ে সেটা হাতে নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে। এমন করে সালেহা চলে যাবে এটা রইস কখনই ভাবেনি।  (চলবে)

মন্তব্য