| প্রচ্ছদ

‘একটি পুলিশীয় গল্প’

নাগরিক সাংবাদিকতাঃ
পঠিত হয়েছে ৩০০ বার। প্রকাশ: ১১ অগাস্ট ২০১৮ । আপডেট: ১১ অগাস্ট ২০১৮ ।

[‘মানুষ সামাজিক জীব’- এটা সবার জানা। একজনের সহযোগীতায় অন্যরা পাশে দাঁড়াবে- ছুটে যাবে। অন্যকে বাঁচাতে প্রয়োজনে নিজের জীবনটাও উৎসর্গ করতে দ্বিধা করবে না- এমন গুণাবলী রয়েছে বলেই মানুষের উপাধি হয়েছে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব। কিন্তু আজকাল অপরের বিপদ দেখে তাকে উদ্ধারে এগিয়ে যাওয়া তো দূরের কথা বরং দেখেও না দেখার ভান করা এমনকি মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার ভয়ঙ্কর এক প্রবণতা তৈরি হয়েছে মানুষ নামক জীবের মধ্যে। 

এমন পরিস্থিতিতে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যত পেশা রয়েছে তার মধ্যে সুযোগ পেলেই যাদের প্রতি আমরা আমাদের সব ঘৃণা উগলে দিই- উর্দি পরা সেই মানুষগুলোকেই যখন দেবদূতের ভূমিকায় দেখা যায়- তখন ‘লজ্জা’ নামের অনুভূতিটাকেও যেন নতুন করে খুঁজতে হয়। বলছি একদল পুলিশ সদস্যের কথা। সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা যা করিনি-পারিনি; দায়িত্ববোধেরও উর্ধে উঠে তাই করিয়ে দেখিয়েছেন সম্প্রতি ছাত্র আন্দোলনে ‘চ’ আর ‘ব’ বর্গীয় শব্দের বিশেষণ হজম করা আমাদের সেই পুলিশ বাহিনী। 

ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে রক্তাক্ত এক রিকশা চালক যখন ও নেগেটিভ গ্র্রুুপের রক্তের অভাবে মাঝ রাতে মরতে বসেছেন তখন তাকে বাঁচাতে একদল পুলিশের সেকি প্রাণান্ত চেষ্টা! বগুড়া পুলিশের মিডিয়া বিভাগের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সনাতন চক্রবর্তীর বয়ানে উঠে এসেছে মানবিক সেই কাহিনী। যা তিনি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লিখে শেয়ার করেছেন। পুণ্ড্রকথার পাঠকদের জন্য পুলিশ কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তীর লেখাটি হুবহু তুলে ধরা হলো]

১০ আগস্ট রাত দশটা। শুক্রবার। অফিসে বসে আসন্ন পরিদর্শনের কাজ করছি। এমন সময় পুলিশের বেতার যন্ত্রে শোনা গেল মেডিকেল ফাঁড়ির ইনচার্জ আজিজ মন্ডলের কণ্ঠস্বর। শহরের কৈগাড়ি মৎস্য অফিসের পিছন থেকে একজন ছুরিকাহত অজ্ঞাত ব্যক্তিকে দুইজন রিক্সাচালক জরুরি বিভাগে ভর্তি করে দিয়ে গেছে। রোগীর অবস্থা সিরিয়াস, প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে, নাড়ি-ভুড়ি বের হয়ে গেছে। ছুটলাম ঘটনাস্থলের দিকে। যাবার পথে আজিজ মন্ডলের সাথে কথা বললাম। রোগীর সর্বশেষ অবস্থা কেমন জানার চেষ্টা করলাম। রক্তের গ্র্রুুপ কি জানতে চাইলাম। তিনি জানালেন যে রক্ত পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। আসলেই জানাবেন। ঘটনাস্থলে গেলাম। আমার আগেই সেখানে পৌঁছে গেছেন শাজাহানপুর থানার অফিসার ইনচার্জ জিয়া লতিফুল ইসলাম এবং ফাঁড়ির ইনচার্জ মিজান। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি ছোপ ছোপ তাজা রক্ত তখনো পড়ে আছে। এতোগুলো পুলিশ দেখে আশেপাশের বাড়ির লোকজন একটু জানালা খুলে জিজ্ঞাসাও করলেন না যে,- কি ব্যাপার ঘটেছে, কেন এতো পুলিশ এসেছে। এমনকি কাউকে ডেকেও পাওয়া গেল না।


এরইমধ্যে ছুড়িকাহত সেই ব্যক্তির পরিচয় পাওয়া গেল। নাম পীযুষ পিতা দিলীপ। সে পেশায় একজন রিক্সা চালক, থাকে ঠনঠনিয়া বটতলা এলাকায়। তার বাড়ির লোকেশন সংগ্রহ করে একটি টিম পাঠানো হলো বাড়িতে খবর দেয়ার জন্য। মালতিনগর ফাঁড়ির একজন অফিসার তার বাড়ি সনাক্ত করে তার বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে দিয়ে এলো। তার বাবাও একজন রিক্সাচালক, একেবারে দীনহীন অবস্থা।

কিছুক্ষণ পর আজিজ মণ্ডলের কাছ থাকে জানা গেল আহত ছেলেটির রক্তের গ্র্রুুপ ‘ও নেগেটিভ’। রেয়ার গ্র্রুুপ। আমি তাঁকে বললাম ম্যানেজ করেন। মেডিকেল, সন্ধানী, আশেপাশের ব্লাড ব্যাংক যেখান থেকে পারেন। সে কিছুক্ষণ পর জানালো কোথাও ও নেগেটিভ গ্র্রুুপের রক্ত নাই। সে আরো জানাল ৫ ব্যাগ রক্ত লাগবে তাছাড়া রোগী বাঁচানো কঠিন হয়ে যাবে। জরুরি বিভাগের ডাক্তার তাই বলেছেন।

পুলিশের বেতার যন্ত্র সরব হয়ে উঠল। পুলিশ লাইনে অনেক ছেলে আছে। তাদের থেকে মিলতে পারে কাঙ্খিত গ্র্রুুপের রক্ত। পুলিশ লাইনের রেকর্ড দেখে জানা গেল বিপ্লব নামের একটা ছেলের রক্তের গ্র্রুুপ ও নেগেটিভ। লাইনের ইনচার্জ তার সাথে কথা বললেন। কিন্তু সে রাজি না। শেষমেষ আমি তার সাথে কথা বললাম। আমার কথায় সে রাজি হলো। আমার গাড়ি তার বাসায় পাঠিয়ে দিলাম তাঁকে নিয়ে হাসপাতালে গেল। তখন রাত প্রায় একটা বাজে। আজিজ মন্ডল তার রক্ত নেয়ার ব্যবস্থা করল।

বগুড়া অন লাইন রক্তদান সংগঠনকে জানানো হয়েছিল আরেকটু আগেই। তাদের একজন জানালো ডোনার আছে কিন্তু ধুনটে। রাতে আসা সম্ভব না। জানানো হলো আইয়ুব কে। কে একজন দেবদূতের মত আমাকে ফোন দিয়ে জানালো একজন ডোনার পাওয়া গেছে। সে থাকে জহুরুলনগর মেসে। এতো রাতে কিভাবে আসবে? আমি তার ফোন নম্বর নিয়ে কল করলাম। খুবই পজিটিভ ছেলে। নাম ফয়সাল। তাঁকে রেডি থাকতে বলে সদর থানার টহল গাড়ি পাঠালাম তার কাছে। তাঁকে নিয়ে হাসপাতালে গেল এসআই গাউস। আজিজ মন্ডল তার রক্তও নেয়ার ব্যবস্থা করলেন। এরইমধ্যে অন লাইন রক্তদান সংগঠনের আরেকটি ছেলে চলে এলো আজিজের কাছে। মোট তিন ব্যাগ। ডাক্তার বললেন, আপাতত চলবে। সাড়ে তিনটা পর্যন্ত এগুলো করে আজিজ বাসায় গেল।

সকালে ঘুম ভাঙার পর খুব ভয়ে ভয়ে আজিজকে ফোন দিলাম। না জানি কি সংবাদ অপেক্ষা করছে! দিলখোলা মানুষ আজিজ জানালো রোগীর জ্ঞান ফিরেছে। কথা বলেছে। মোটামুটি শংকামুক্ত।

যারা পুলিশকে চ বর্গীয় ব বর্গীয় শব্দের বিশেষণে অভিষিক্ত করেছেন তাদের জন্য বলছি, এরকম কাজ পুলিশ প্রতিদিনই করে থাকে। আমরা জেগে আছি রাতদিন, সাধারন মানুষের জন্য। আমরা কাজ করি নিজের বিবেকের দায়বদ্ধতা থেকে। রাত জেগে সেই আহত ব্যক্তির রক্তের ব্যবস্থা কোন আইনে নাই, বিধিতে নাই। তারপরেও পুলিশ এমন কাজ করে থাকে। মানুষ আমাদের গালি দেয়, দিক!দিনশেষে এরকম শান্তি নিয়ে ঘুমাতে যেতে পারি কিছু ত করেছি প্রান্তিক জনগণের জন্য।

মন্তব্য