| প্রচ্ছদ

পরামর্শক নিয়োগ না হওয়ায় আটকে আছে সবকিছু

বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ কাজ শুরু হবে দুই বছর পর!

বিশেষ রিপোর্ট
পঠিত হয়েছে ৭৩৩ বার। প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০১৯ । আপডেট: ২৭ মার্চ ২০১৯ ।

বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটি প্রায় পাঁচ মাস আগে অনুমোদন পেলেও তা বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত কোন অগ্রগতি নেই। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পরামর্শক এবং প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না হওয়ার কারণে ভূমি অধিগ্রহণ ও টে-ার প্রক্রিয়া শুরু করা যাচ্ছে না। ফলে বড় ধরনের ওই প্রকল্পের কাজও দৃশ্যমান হচ্ছে না।
উত্তরাঞ্চলে যোগাযোগ খাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুত বড় ধরনের ওই প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়। বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ এবং বগুড়ার কাহালু থেকে প্রস্তাবিত রাণীরহাট রেলওয়ে জংশন পর্যন্ত ৮৪ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ রেল লাইন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ভারতীয় ঋণে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। 
রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত পরামর্শক নিয়োগ না হওয়ায় আনুষঙ্গিক কাজগুলো শুরু করা যাচ্ছে না। যেহেতু প্রকল্পটি ভারতীয় ঋণে (এলওসি-লেটার অব ক্রেডিট) বাস্তবায়িত হবে তাই শর্ত অনুযায়ী তারাই পরামর্শক নিয়োগ দিবে। কিন্তু কবে নাগাদ পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হবে সেটা তাদের জানা নেই। 
তবে রেলওয়ের প্রকৌশল শাখার কর্মকর্তাদের ধারণা, পরামর্শক এবং প্রকল্প পরিচালক নিয়োগসহ টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দেড় বছর থেকে দু’বছর লেগে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে ২০২১ সালের আগে কাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম। রেলপথ মন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন অবশ্য দ্রুত কাজ শুরু করার আশাবাদ ব্যক্ত করে পুণ্ড্রকথা সম্পাদককে বলেন, ‘ভূমি অধিগ্রহণসহ অনেক কাজ করতে হবে। এজন্য একটু সময় প্রয়োজন। তবে দ্রুতই কাজ শুরু হয়ে যাবে।’
বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। এ নিয়ে আন্দোলনও হয়েছে অনেক। ওই দুই জেলার মধ্যে সরাসরি রেল পথ না থাকায় এ অঞ্চলের ট্রেনগুলোকে বর্তমানে সান্তাহার, নাটোর এবং পাবনার ঈশ্বরদী হয়ে প্রায় ১২০ কিলোমিটার ঘুর পথে চলাচল করতে হচ্ছে। বাড়তি ওই পথ ঘুরতে একদিকে যেমন সময়ের অপচয় হচ্ছে তেমনি বেশি ভাড়াও গুনতে হচ্ছে। বগুড়া থেকে যেখানে সড়ক পথে ঢাকা পৌঁছাতে লাগে ৭ ঘন্টা সেখানে ট্রেনে ঘুরপথে যেতে লাগে ১০ থেকে ১১ ঘন্টা।
২০০৫ সালের মাঝামাঝি বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে প্রথম একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে রেলপথ নির্মাণের প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে জমি অধিগ্রহণের জন্য সে সময় প্রাথমিক জরিপও চালানো হয়। তবে বগুড়া থেকে নির্বাচিত তৎকালীন বিএনপি দলীয় প্রভাবশালী এক সাংসদের (পরিবহন ব্যবসায়ী) নানামুখী বাধার কারণে প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায়।
তার প্রায় ৬ বছর পর ২০১১ সালের ৯ এপ্রিল সিরাজগঞ্জে এক জনসভায় ভাষণদানকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ স্থাপনে প্রতিশ্রুতি দেন। তারপর নতুন করে চিঠি চালাচালি শুরু হয়। আশায় বুক বাঁধেন দুই জেলার মানুষ। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই তৎপরতা ঝিমিয়ে পড়ে। ফলে আবারও শুরু হয় আন্দোলন। উত্তরাঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দাবিতে নতুন করে সোচ্চার হয়ে ওঠেন দুই জেলার মানুষ। ফলশ্রুতিতে ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর বগুড়ায় দলীয় এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর পুরানো প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। 
কিন্তু অর্থের কোন সংস্থান করতে না পারায় প্রকল্পটি এতদিন ফাইলবন্দী হয়েই পড়ে ছিল।  তবে ২০১৭ সালের ৪ অক্টোবর ঢাকায় বাংলাদেশে যোগাযোগ অবকাঠামো এবং বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তৃতীয় ক্রেডিট লাইনের (এলওসি) বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণে ঋণ দিতে সম্মত হয়। মূলত তার পর পরই গুরুত্বপূর্ণ ওই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ডেভলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রফাইল (ডিপিপি) প্রণয়নসহ নকশা তৈরি, স্টেশনের সংখ্যা নির্ধারণ এবং রেলপথ নির্মাণে প্রয়োজনীয় জমির মূল্য নির্ধারণের কাজও চুড়ান্ত করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় ডুয়েল গেজের দু’টি রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। একটি হলো- বগুড়া স্টেশন থেকে আড়াই কিলোমিটার পশ্চিমে ছোট বেলাইল এলাকা থেকে সিরাজগঞ্জের এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত ৭২ কিলোমিটার এবং অপরটি হলো বগুড়ার কাহালু স্টেশন থেকে রাণীরহাট পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার রেলপথ। এজন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ ১৫ হাজার টাকা। মূলত সান্তাহারের দিক থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী এবং ঢাকা থেকে ছেড়ে সান্তাহার হয়ে দিনাজপুরের পার্বতীপুরগামী ট্রেনগুলো যাতে বগুড়া স্টেশনকে এড়িয়ে সরাসরি চলাচল করতে পারে সেজন্য কাহালু-রাণীরহাট রেলপথটি নির্মাণ করা হচ্ছে। 
দু’টি রেলপথ মিলিত হওয়ার কারণে বগুড়া শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে রাণীরহাটে একটি জংশনও নির্মাণ করা হবে। এছাড়া নতুন ওই রেলপথে আরও ৫টি স্টেশন স্থাপন করা হবে। এগুলো হলো: শেরপুর, চান্দাইকোনা, রায়গঞ্জ, কৃষাণদিয়া ও সদানন্দপুর। প্রস্তাবিত ৮৪ কিলোমিটার রেলপথের জন্যমোট ৯৬০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে বগুড়ার সীমানায় ৫২ কিলোমিটার রেলপথের জন্য ৫১০ একর এবং সিরাজগঞ্জ অংশের ৩২ কিলোমিটার অংশের জন্য প্রয়োজন আরও ৪৫০ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ ওই প্রকল্পটির সর্বশেষ অবস্থা জানার জন্য রেলওয়ের মহাপরিচালক কাজী রফিকুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি রেলওয়ের পঞ্চিমাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। পরে প্রধান কৌশলী মোঃ আফজাল হোসেন জানান, প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদিত হলেও এখন পর্যন্ত পরামর্শক নিয়োগ হয়নি। ফলে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং ভূমি অধিগ্রহণসহ আনুষঙ্গিক কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। কবে নাগাদ এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে রেলপথ নির্মাণের মূল কাজ শুরু হবে-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের ধারণা দেড় থেকে দু’ বছর লেগে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে মূল কাজ শুরু করতে দুই বছর লাগতে পারে।’
 

মন্তব্য