| সাহিত্য

রেশমা [ত্রয়োদশ পর্ব]

পঠিত হয়েছে ২৫৬ বার। প্রকাশ: ১৩ অগাস্ট ২০১৮ । আপডেট: ১৩ অগাস্ট ২০১৮ ।

হাস্না নানী দরজার তালা খুলে জোরে ধাক্কা দিলো। কচ কচ শব্দে দরজা খুলে গেলো। পুরা বাড়িতে আম আর কাঁঠালের গন্ধে ভরা। ওদের দেখেই দুইটা বেজী পালিয়ে গেলো। সালেহার ঘরের মেঝে ভরা আম আর আম। দুই বাগানের আম এসে ভরে গেছে। কাঁঠালও এতো হয়েছে এবার!! পাকা আমগুলা বেছে নিয়ে যেতে হবে। তাশলী খালার বাড়ি জামাই-মেয়েতে ভরে গেছে। এই আম কাঁঠালেই তাদের আপ্যায়ন করা হবে। হাস্না নানী এখন দেখবে কতগুলা আম পেকেছে।

কামরাঙা গাছে অনেক কামরাঙ্গা হলুদ হয়ে আছে,পারবে কে গাছ থেকে? কুয়োর কাছে গিয়ে বালতি ফেলতেই ঝপাত করে শব্দ হলো, এর ভিতর বাড়িতে মানুষের চলাফেরা শুনে একটা বড় মোটা সাপ উঠানের ভিতর দিয়ে বাহিরে বের হয়ে যাচ্ছে!

হাস্না নানীইইইইইইইইই??????

রেশমার চিৎকার পুরা বাড়িতে প্রতিধ্বনী হয়ে আবার ফিরে এলো কুয়োর কাছে। হাস্না নানীর কোমর বাঁকা হয়ে গেছে,হাঁটতে কষ্ট হয়,তাও রেশমার ডাকে ছুটে এলো।

রেশমা- নানী এত্তো মোটা একটা সাপ গেলো ওই দিক দিয়ে।

হাস্না- তুই এটি কি করিস একলায়? আয় সাথে আয়,আম দেখি।

রেশমা- তুমি দেখো,বলে সাড়ে ছয় বছরের রেশমা পশ্চিমের প্রাচিরের দিকে গেলো।  ইটের উপর ইট দিয়ে একটু উচু করে রেখেছে রেশমা,সেটার উপর উঠে একটু পা উচু করলেই কবরগুলা দেখা যায়।

ওই দিক থেকে প্রথমে বাবার কবর,তারপর বড় মা আর তার পর দাদী। তিন জনের কবর সারি করে দেওয়া। রেশমা যখনই বাড়িতে আসে এদিক দিয়ে কবর দেখে। বাহিরে থেকে ভালো দেখা যায় না গাছ,আর জঙ্গলের জন্য।

আম দেখা শেষ,এক ডালা আম নিয়ে হাস্না নানী গজ গজ করতে করতে বের হচ্ছে ঘর থেকে।

রেশমা- নানী আবার কি হলো? গজ গজ করো ক্যান?

হাস্না- এতো শয়তান মানুষ হামি দেকিনি। এতো শয়তান হয়? যকনই এ বাড়িত আসি হামার মাতা গরম হয়্যা উটে। মনে হয় হ্যাসা লিয়া ওই তাশলীর গলাত ফোঁচ দেই। হামার সামনে সালেহা তোর জন্যি বানানা মাকড়ি, পাশা আর মালা খাটের খুরার নিচে পুঁতে থুলো,তোর দাদীর সামনে হামাক আর তাশলীক ডাকলো -

সালেহা- হাস্না নানী,তাশলী ভাবী আমার শরীর ভালো না কখন কি হয় জানি না। এই খাটের খুরার নিচে একটা কৌটার ভিতর রেশমার জন্যি গয়না থুলাম,রেশমা একটু বুঝবার শিকলে ওক এগুলা ব্যার করা দিবেন। হাস্না নানী আর আপনাক দুই জনেকই কয়্যা থুলাম য্যান আমার ছোল রেশমা তার হক বুঝা পায়।

সুফিয়াও দেখবার আচ্চিলো তকন ওর হাতে কিচু প্যাঠা দিচি রেশমার নানার বাড়িত। ওর বড় মামীর কাচে, সেগুলাও রেশমা একটু বড় হলে দিবি তারা।

সুফিয়ার কাছে দিলাম রাখবার কিছু যেনো রেশমাকে দেয়। সব জায়গাত অল্প অল্প করা থুলাম। এক জন দুইজন হক মারতে পারে সগ্গুলি তো ছোলের হক মারবি না।

হাস্না- তোর বড় মা,তোর জন্যি কি করবি আর করবি না সেডা মরার সময়ও ভাবিচে।

আর দেক ওই শয়তান কখন কোন ফাঁকে সব লিয়া গেলো,বুঝবার পারনু না। মানুষ এতো বড় হারামী হয় তা তাশলীক না দেকলে বুঝবার পারবে না। মরার পর হামি কি জবাব দিমু?

রেশমা- নানী গহনা দিয়া কি করমু? ওই দেখো বাবা,বড় মা,দাদী ওই খানে থ্যকা তোমার কতা সবই শুনচে,তালে আর তোমাক জবাব দেওয়া লাগবি ক্যা?

হাস্না- তোর বড় মার হাতের সব বাটি,প্লেট তাশলী নিয়া গেলো,কয় রেশমা বড় হলে সংসার হলে দিমু। সেদিন দেকি তার বড় বেটি যাওয়ার সময় তোর বাপের চায়ের কাপ দিলো লুকাই। আর ফিস ফিস করে কলো,জামাই চা খায়,এডাত করা চা খাবার দেস।

রেশমা-আমি তো সব জানি নানী!!!

হাস্না- হামার রইস এর গায়ের সাল!! ছোল হামার শক করা কিনছিলো,সেডাও ওই শয়তান চুপ করা বেটিক দিলো। কোন দুঃখে যে তুই ওর কাচে থাকবার রাজি হলু?

গোলা ভরা ধান,কয় রেশমার খরচা বেশী তাই বছরে কিছুই থাকেনা।

আরে ঐ জমির ধান আর টেকা দিয়া পুরা গুষ্টি চলিচে,এতিমরা খাইচে। আর আজ সেই টেকা আর ধান বলে সব লাগে রেশমার!!!

মানুষকি জানে না? বোঝেনা কিচুই? আল্লাহ ওগেরেক মাফ করবিনা। এতিম ছোলডার টেকা ম্যারা খাচ্চে।

রেশমা- ওই নানী চলো,ইস্কুলেত লিয়া যাবানা নাকি?

হাস্না- ইস্কুলেত যাবু ককন,খাবু ককন? শোন মা তোর টেকা,তোর ধান,তোর মাছ,তুই তোর মতো খাবু। তোর মাও ব্যাঁচা থাকলে আজ তোর কোন দুঃখ থাকলোনি?

রেশমার ছোট্ট মাথায় এতো কিছু ঢোকেনা। শুধু এটা মাথায় আছে,আর তা হলো- তাকে এখানেই এই গ্রামেই থাকতে হবে,না হলে তার বাবার বাড়ির বাতি কে দিবে?

একদিন সকালে বড় "মা"র অসুখ বেশী হয়ে গেলো,বাড়িতে ডাক্তার আসলো। স্যালাইন দিয়ে রাখা হলো। ঔষধ নিতে দৌড়াদৌড়ি শুরু করলো যে যে ভাবে পারে। খবর পেয়ে সুফিয়া আর তার নতুন জামাই এসেছে সালেহাকে দেখতে। সালেহার কাছে-কাছেই থাকছে সুফিয়া। রাতে সালেহা আরো অসুস্থ হয়ে গেলো। রেশমা ভোরে কান্না-কাটির শব্দে জেগে উঠলো।

সুফিয়া চোখ মুছতে মুছতে রেশমাকে কোলে করে বাহিরে নিয়ে গেলো। চারিদিকে রাতের কালো অন্ধকার সরে দিনের আলো ধরতে শুরু করেছে। বাড়িতে অনেক লোক। কাঁদছে সবাই। সুফিয়া রেশমাকে উঠানে রাখা খাটিয়ার কাছে নিয়ে গেলো। মুখের উপর থেকে কাফনের কাপড় সরাতেই রেশমা বড় মা বলে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। রেশমার চিৎকার করে কান্নায় পুরা বাড়ির সব মানুষ যেনো নিঃস্তব্ধ হয়ে গেলো কিছুক্ষণের জন্য .........

বড় আভিমান হয় বড় মার উপর। বড় মাও এভাবে তাকে ফেলে চলে গেলো! (চলবে)

মন্তব্য