| সাহিত্য

রেশমা [পঞ্চদশ পর্ব]

পঠিত হয়েছে ২৫৯ বার। প্রকাশ: ১৭ অগাস্ট ২০১৮ । আপডেট: ১৭ অগাস্ট ২০১৮ ।

এটা রেশমার প্রথম আসা সুফিয়ার সংসারে। গ্রামের বউ,মেয়েরা ছুটে এসেছে রেশমাকে দেখতে। কত কত প্রশ্ন কত কথা রেশমার সাথে।
যেনো তাকে কতদিন ধরে চেনে!

সব ছেড়ে আগে দেলোয়ারের সাথে দেখা করতে গেলো রেশমা-

দেলোয়ার - মা রেশমা,তুমি আসবা এটা আমি ভাবিনি। এতো বছর তোমাকে অনেকবার আনার চেষ্ট করেও আনতে পারিনি। তাই এবারও ভাবলাম তুমি আসবা না। তোমার প্রতি আমি কোন দায়িত্ব পালন করতে পারিনি। তোমার মা তোমার কথা ভেবে সব সময় কষ্ট পেতো।

আমার শরীরের অবস্থা আর ভালো না। এখন মুখ দিয়ে রক্ত আসা শুরু হইছে। ডাক্তার বলে টিবি। বাঁচার কোন লক্ষণ নাই। গতকাল থেকে আরও বেশী খারাপ লাগছে,তাই তোমাকে আসতে বলা। তোমাকে কিছু দায়িত্ব দিয়ে যেতে চাই আমি,যদি তোমার আপত্তি না থাকে।

রেশমা- আপনি বলেন,

দেলোয়ার- তোমার ছোট ভাইবোন মুন্নি শিমু শরীফ সাব্বির এখন ছোট,ওদের জন্য আমি তেমন কিছু করতে পারিনি। মুন্নি,শিমুর বিয়েও দিয়ে যেতে পারবো বলে মনে হয় না। মা রেশমা তুমি আমার অবর্তমানে ওদের দেখাশোনার দায়িত্ব নিও। ওদের দিকে নজর দিও। আমি চাই তুমি তোমার মা আর ভাই বোনদের পাশে থাকো।

এই মানুষটার উপর রেশমার কোন রাগ নাই,কারণ মুন্নির বাবা দেলোয়ার রেশমাকে তার বাড়িতে রাখার অনেক চেষ্টা করেছিলো,কিন্তু রেশমা রাজি হয়নি। রেশমা তাদের কাছে ছিলো না ঠিকই কিন্তু দেলোয়ার মন্ডল প্রতি মাসে রেশমাকে দেখতে যেতো।পিঠা,মুড়ি,গাছের ফল কোনটাই দিতে ভুলতো না। সব জায়গায় তার পরিবারের বড় মেয়ে বলে রেশমাকে পরিচয় করিয়ে দিতো।

রেশমা দেলোয়ারের পাশে গিয়ে বসলো। দেলোয়ারকে বললো-

রেশমা- আব্বা আপনি চিন্তা করবেন না। আমি ওদের সব দায়িত্ব পালন করবো,বড় বোন হয়ে। আপনি সুস্থ হয়ে উঠেন তখন আবার কথা বলা যাবে।

দেলোয়ার - মা তুমি আজ আমাকে আব্বা ডেকে আমার মনের বোঝা হালকা করলে। তোমার মা এর উপরও কোন কষ্ট বা রাগ পুষে রাখবা না। তোমার যেমন মনে কষ্ট অনেক,তারও মনে তেমনই অনেক কষ্ট,তোমাকে না পাওয়ার ব্যথা।

রেশমা ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে বসে। সেই শুধু জানে তার কষ্টের কারণ! রাতে দেলোয়ার বেশী অসুস্থ হয়ে পরে। গ্রাম থেকে হসপিটালে নেওয়ার সময় মারা যায় দেলোয়ার।

এদিকে চারিদিকে যুদ্ধের খবর ছাড়া আর কিছু নাই। সবার মুখে মুখে একই কথা। স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে,শহর থেকে দলে দলে লোক গ্রামে চলে আসছে। তাশলীর বাড়ি ভরা লোকজন,আত্মীয়,মেয়ে জামাই। পা ফেলার জায়গা নাই। রেশমাদের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলো তাশলী,কিন্তু কেউ থাকতে রাজি না ভয়ে। তাই এক বাড়িতেই চাপাচাপি করে থাকা।

রেশমাদের গ্রামটা নদীর ধারে আর নদী পার হওয়ার জন্য কোন ব্রিজ ছিলো না তাই গ্রামটা নিরাপদ ছিলো।

এরই ভিতর পাশের গ্রামে পাক বাহিনী হানা দিলো। ঐ গ্রামের ছেলে লালু ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে সেদিনই ফিরেছিলো। রাজাকাররা সেই খবর দিলে পাকবাহিনী হাজির হয় মাঝ রাতে। গ্রামের যেসব বাড়িতে বড় বড় মেয়ে ছিলো সেসব বাড়িতে আগে প্রবেশ করে ওরা। কান্নাকাটি, চিৎকারে পুরা গ্রাম এক ভয়ঙ্কর রুপ নেয়। গ্রামের সিদ্দিকের বউ বন্দুক চালানো শিখেছিলো শখ করে। চারিদিকে চিৎকার,কান্নাকাটির শব্দে সে আর ঘরে চুপ থাকতে পারেনি,সে বন্দুক নিয়ে গুলি করতে শুরু করে দেয়,এইসময় পাকবাহিনীও পাল্টা গুলি করে। লালু সহ গ্রামে যে কয়জন প্রশিক্ষণ নেওয়া যোদ্ধা সেদিন ফিরেছিলো তারাও গুলি ছুড়তে থাকে। গোলাগুলি চলে বহু সময় ধরে।

পাক সেনারা গ্রামে আগুন লাগিয়ে দেয়। ঘড় বাড়িতে আগুন লেগে যায়। দুই পক্ষের গোলাগুলিও থামেনা। গোলাগুলির এক পর্যায়ে লালুর বুকে গুলি লাগে,লালুর সেখানেই মৃত্যু হয়। বাসেদের গালে গুলি লেগে যায়।রন্জুর পেটে গুলি লেগে নাড়ি বেড়িয়ে আসে। মরনাপন্ন অবস্থা হয় রন্জুর। এমন অবস্থায় যোদ্ধারাও থেমে থাকেনি,তাদের আক্রমনে কয়েকজন পাকসেনা সেখানেই মারা যায়। আর এরকম অবস্থায় এক সময় পাকবাহিনী গ্রাম ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।

পাশের গ্রামে সারারাত এমন তান্ডবে রেশমাদের গ্রামেও সারারাত একটা ভীতি ছিলো। সারা গ্রামের ছেলে মানুষরা নদীর ধারে পাহারায় বসেছিলো। নারী পুরুষ বাচ্চারা দলে দলে রাতের অন্ধকারে পাশের গ্রাম থেকে রেশমাদের গ্রামে চলে আসে। যে যে ভবে পেরেছে চলে এসেছে।
রন্জুকে কয়েক জন মিলে ধরে নিয়ে এসেছে,ডাক্তার নিয়ে এলো কয়েকজন গিয়ে। বাঁচানো যাবে ধরেই নিয়েছে ডাক্তার, তবুও চেষ্টার কোন কমতি করা যাবে না।

তাশলীর বাড়িও রাতে ভরে গেছে পাশের গ্রামের আত্মীয়তে। ভয় আর আতঙ্কে সারারাত জেগে ভোরে চোখ লেগে যায় রেশমার।

সকালে উঠে দেখে বাড়িতে বিশাল বিশাল পাতিলে রান্না হচ্ছে। রেশমার পুকুরের মাছ তোলা হয়েছে মেহমানদের জন্য। সবাই ব্যস্ত,সব বয়সের মানুষ এসে বাড়ি ভরে গেছে। সবার মুখে কাল রাতের গল্প।

আজ রেশমার খুব ইচ্ছা হচ্ছে সবার কবর দেখতে। চাবি হাতে আজ সে একাই যাচ্ছে। কারণ হাস্না নানী খুব ব্যস্ত কাজে। দরজার কাছে আসতেই দেখে দরজার তালা খোলা,রেশমা ভাবে কোন কাজে ওই বাড়ির কেউ হয়ত এসেছে। রেশমা দরজা খুলে ঢুকে পরে বাড়িতে। দাদীর ঘরের দরজাও খোলা,কে আসলো তাহলে? তাশলী খালা আর হাস্না নানী ছাড়া বাকী সবাই এই বাড়িতে আসতে ভয় পায়। আর ওরা আসবে কি করে,ওই বাড়িতে তো কাজ করতে দেখে এলো তাদের রেশমা!  

রেশমা দাদীর ঘরের দরজার কাছে যেতেই চমকে উঠে ইউনুস চাচাকে দেখে। ইউনুস চাচা রেশমাকে দেখে যেনো একটু নিশ্চিন্ত হয়। চাচার পাশদিয়ে ভিতরে উকি দিয়ে রেশমা দেখে সুঠাম দেহের একজন বিছানায় শুয়ে আছে,পাশে বন্দুক!

রেশমার বুঝতে বাকী থাকেনা,তাদের বাড়িতে কে এসে আশ্রয় নিয়েছে। ইউনুস চাচা রেশমাকে বারান্দায় নিয়ে গিয়ে বললো-

ইউনুস- রেশমা মা,ইনি পাশের গ্রামে কাল রাতের যুদ্ধে অংশ নিছিলো,পুরা গ্রাম পুড়ে দিছে পাকীরা। তাই রাতে এখানে আশ্রয় নিছে। বাজারের খুব নাম করা পরিবারের ছেলে উনি। আজ সুযোগ মতো চলে যাবেন।

রেশমা- চাচা আপনাদের জন্য খাবার ব্যবস্থা করতে বলি?

ইউনুস- ভাই জানে আমরা আছি,তোক আর ব্যস্ত হওয়া লাগবে না মা। তুই বাড়িত যা।

রেশমা ঘর থেকে বেরিয়ে পশ্চিমের প্রাচিরের কাছে চলে যায়। কিছু সময় দাঁড়িয়ে সবার জন্য দোয়া করে দরজার দিকে ফিরতেই লক্ষ করলো মুক্তিযোদ্ধা লোকটা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে রেশমার দিকে তাকিয়ে আছে ! (চলবে)

মন্তব্য