| প্রচ্ছদ

মহাসড়কের গোবিন্দগঞ্জ ও পলাশবাড়ি অংশে বেশি দূর্ঘটনা ঘটে যে কারণে

অরূপ রতন শীলঃ
পঠিত হয়েছে ২৩৯ বার। প্রকাশ: ১৮ অগাস্ট ২০১৮ । আপডেট: ১৮ অগাস্ট ২০১৮ ।

ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থেকে পলাশবাড়ি অংশকে দূর্ঘটনা প্রবণ উল্লেখ করে বগুড়ায় পশ্চিমাঞ্চল হাইওয়ে পুলিশ সুপার মোস্তাাফিজুর রহমান বলেছেন, ‘গোবিন্দগঞ্জ থেকে পলাশবাড়ির মধ্যে ভোরে নয়তো সকালের দিকেই দূর্ঘটনাগুলো বেশি ঘটে।’ শনিবার বগুড়ায় ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ শীর্ষক এক গোল টেবিল আলোচনায় তিনি ওই তথ্য জানান। কেন মহাসড়কের ওই অংশে ওই সময়ের মধ্যে বেশি দূর্ঘটনা ঘটে তার কারণও তিনি ব্যাখ্যা করেছেন।
শহরের বড়গোলায় রোটারি ক্লাব অব বগুড়ার নিজস্ব মিলনায়তনে ওই সংগঠন আয়োজিত গোল টেবিল বৈঠকে মুল প্রবন্ধ পাঠ করেন রোটারি ক্লাব অব বগুড়ার সভাপতি অধ্যাপক ডা. মইনুল হাসান সাদিক। তিনি তার প্রবন্ধে সড়ক দূর্ঘটনায় ১৯টি কারণ এবং তা বন্ধে ২৬টি সুপারিশ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সড়ক দূর্ঘটনার যতগুলো কারণ রয়েছে তার ৭০ শতাংশই মানুষের সৃষ্টি। ২৩ শতাংশ দূর্ঘটনা ঘটে সড়ক-মহাসড়কের কারণে এবং যানবাহনের কারণে আরও ৭ শতাংশ দূর্ঘটনা ঘটে।
গোল টেবিল বৈঠকে হাইওয়ে পুলিশ সুপার মোস্তাফিজার রহমান ২০১০ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত মহাসড়কগুলোতে সংঘটিত সব দূর্ঘটনার তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের কথা জানিয়ে বলেন, ‘তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে আমরা গবেষণা করেই ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের গোবিন্দগঞ্জ থেকে পলাশবাড়ি অংশে সংঘটিত দূর্ঘটনার একটি কারণ খুঁজে পেয়েছি। সেটি হলো-রংপুর ও দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলগামী নৈশ কোচগুলো সাধারণত রাত ৮/৯টার মধ্যে ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করে। রাত ২টা-৩টার দিকে বাসগুলো বগুড়া সীমানায় পৌঁছে এবং চালকরা হাইওয়ের পাশের হোটেলগুলোতে রাতের খাবার খান। এরপর আবার গন্তব্যের দিকে রওনা হন। এক থেকে দেড় ঘন্টার মধ্যে তারা যখন গোবিন্দগঞ্জ থেকে পলাশবাড়ি সীমানায় পৌঁছান তখনই তাদের চোখে ঘুম এসে যায়। ফলে তারা গাড়ি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন না।’ তিনি বলেন, ‘ক্লান্ত আর ক্ষুধার্ত পেটে যখন খাবার পরড়ে তখন চোখে ঘুম আসবেই-এটা প্রমাণিত। এজন্য কোচগুলোতে বদলী চালকের ব্যবস্থা রাখতে হবে।’
তিনি চালকদের প্রশিক্ষণ জরুরী উল্লেখ করে বলেন, ‘চালক ফিট আর যানবহানের ফিটনেস ঠিক থাকলে সড়ক দূর্ঘটনা ৫০ শতাংশ হ্রাস পাবে। তিনি পুলিশ সদর দপ্তরের সাম্প্রতিক নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমদের বলা হয়েছে লাইসেন্সবিহীন এবং ফিটনেসবিহীন কোন গাড়ি সড়ক-মহাসড়কে আর চলবে না। আমরা সেই নির্দেশনা বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছি।’ পুলিশ সুপার আক্ষেপ করে বলেন, ‘প্রাইভেট কার চালকদের জন্য প্রশিক্ষণের অনেক সুযোগ থাকলেও বাস-মিনিবাস চালকদের কোন ইন্সটিটিউট বা প্রতিষ্ঠান নেই। যে কারণে হেলপাররা তার ওস্তাদ বা চালকের গাড়ি চালানোর কৌশল দেখে দেখে চালক হচ্ছেন।’ সড়ক দূর্ঘটনা প্রতিরোধে বিআরটিএ, সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, বিআরটিএ’র ফিটনেসে বাসের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতার কথা বলা আছে। কিন্তু বাসের বডি কি দিয়ে তৈরি হবে তার কোন নীতিমালা নেই। এগুলো দেখতে হবে।’
গোল টেবিল বৈঠকে বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল মালেক নিরাপদ সড়কের জন্য সচেতনতা সৃষ্টির তাগিদ দেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে, তাহলেই সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে।’
বৈঠকে বগুড়া জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নান সড়ক দূর্ঘটনার জন্য সড়কের দুরাবস্থা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের চাঁদাবাজির প্রবণতাকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, যারা ট্রাকে কাঁচামাল পরিবহন করেন তাদের প্রতিদিন ভোর ৪টার মধ্যে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানোর বাধ্যবাধকতা থাকে। কিন্তু ওই ট্রাকটি রওনা হওয়ার পর যানজটে ২/৩ ঘন্টা আটকে থাকে। এরপর যানজটের কবল থেকে মুক্তি পেলে চালক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পৌঁছানোর জন্য ট্রাকের গতি কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। এমন পরিস্থিতিতে আবার যখন পুলিশ ট্রাকটি থামিয়ে চাঁদাবাজি করে তখন ওই চালক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তখন তার মাথা বিগড়ে যায়-এভাবেই দূর্ঘটনাগুলো ঘটে থাকে।’
বৈঠকে সিএনজি চালিত অটোরি রিকশা মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব শেখ বিআরটিএ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে বলেন, ‘সিএনজি অটোরিকশার ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন প্রদানের ক্ষেত্রে তারা অনিয়ম করে থাকেন।’
অভিযোগের জবাবে বিআরটিএ বগুড়া কার্যালয়ের যানবাহন পরিদর্শক ফয়েজ আহমেদ বলেন, সিএনজি চালিত অটোরিকশা রেজিস্ট্রেশন প্রদানের বিষয়টি তাদের একক এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। তিনি তাদের দপ্তরে জনবল সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, ৩৫ বছর আগে যখন বগুড়ায় এ দপ্তরের কার্যক্রম শুরু হয় তখন যে লোকবল ছিল এথনও তাই রয়েছে। সেই ৯জনের বেশি লোকবল একজনও বাড়েনি। অথচ ততদিনে বগুড়ায় যানবাহনের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে। তিনি বলেন, লোকবল বাড়ানো সম্ভব হলে সব ধরনের সেবার মান বাড়ানো সম্ভব হবে।
গোল টেবিল বৈঠকে বগুড়া পৌরসভার মেয়র অ্যাডভোকেট একেএম মাহবুবর রহমান, বগুড়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি দৈনিক করতোয়া সম্পাদক মোজাম্মেল হক লালু, দৈনিক বগুড়া সম্পাদক রেজাউল করিম বাদশা, রোটারি ক্লাবের সাবেক সভাপতি মোস্তাফিজার রহমান, রেজাউল হক রানু, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি ডা. সামির হোসেন মিশু, বগুড়া জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল মান্নান, সিএনজি চালিত অটোরিকশা মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব শেখ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বগুড়ার পরিদর্শক ফয়েজ আহমেদসহ আইনজীবী, ব্যাংকার ও গণমাধম্য কর্মীরা অংশ নেন।

মন্তব্য