| সাহিত্য

রেশমা [সমাপ্ত]

সাজিয়া আফরিন সোমাঃ
পঠিত হয়েছে ৪৬১ বার। প্রকাশ: ১৯ অগাস্ট ২০১৮ । আপডেট: ১৯ অগাস্ট ২০১৮ ।

রেশমা একটু বড় হতেই তাশলী তাকে বুঝাতে শুরু করলো যে তার বিয়েটা এই গ্রামেই হওয়া উচিত,এতে সালেহা বরং খুশিই হবে। সে তো রেশমাকে সব সময় এখানেই রাখতে চাইতো। কিন্তু রেশমা ততোদিনে জেনে গেছে তার প্রতি মানুষের ভালোবাসার কারণ। সাবই ভালোবাসে শুধু তার সম্পত্তি।

তাশলী- রেশমা,তোর বড় মা থাকলে আমার কামালের জন্যি তোক লিয়া আসলামনি। একন তোর বড় মা নাই,তাই তোর মত তোকই দেওয়া লাগবে মা। আমার কাছে সারাজীবন তোক থুবার চাই। কামালেরও বিয়া দেওয়া লাগবে,বাইরে থ্যাকা মেয়ে আনার চেয়ে ঘরের ছোল ঘরেত থাকলে দোষ কি?

রেশমা- খালা এখন আমার অনেক পড়া,বিয়ার কতা পরেও কওয়া যাবে।

আর কামাল ভাই এর জন্য দেখেশুনে মেয়ে আনা ভালো। আমার মত নাই এখন বিয়াতে। বড় মার খুশির জন্য আর তার শান্তির জন্য আমি সব ব্যবস্থা করবো যেখানেই থাকি। আর আমার মামারা আছে আমার বিয়া নিয়া ভাবার জন্য।

রেশমার মুখে এমন কথা শুনে তাশলী আর কোন কথা বাড়ানোর সাহস করেনি। কারন এতোদিনে তাশলীও জেনে গেছে রেশমার জেদ আর একরোখা স্বভাবের কথা।

এদিকে রেশমাও জানে এতোগুলা বছর তাশলী তার পরিবার আর তার সাথে কি করেছে! সে জানে তাশলী সালেহার খুশির কত মূল্য দেয়! রেশমার গহনা গুলা যখন লুকিয়ে লুকিয়ে নিজের মেয়েদের দিয়েছিলো রেশমা সব দেখেছিলো। দাদীর হাতের পানের বাটা সেটারও লোভ সামলাতে পারেনি তাশলী আর সেটা দেখে রেশমার চোখ ভিজে গিয়েছিলো সেদিন। বড় মার হাতের সেই বিশাল পাথরের পাটা সেটাও যেদিন ডলির বিয়ের বাহানায় বাড়িতে নিয়ে আসলো সেদিন রেশমা জেনে গেছে আর কিছু বাকী নেই আনার। দাদীর হাতের কড়ির প্লেট,বাটি সব তাশলী খালার বাড়ির মেহমানদের জন্য বরাদ্দ করা হলো।

দুলু ফুপু হঠাৎ একদিন এসে তাশলী খালার বাসায় এসে হাজির হলো। অনেক বছর পর! রেশমার দাদী লাইলী মারা যাবার পর আর আসেনি একবারও। আজ এতো বছর পরে হঠাৎ রেশমার কথা মনে পরেছে জেনে বেশ অবাক রেশমা। সাথে তার বড় মেয়ে। পরে রেশমা জেনেছে দুলু ফুপু তার ছেলে ফিরোজের জন্য মেয়ে দেখতে এসেছিলে আর সেই মেয়ে রেশমা।
সুফিয়ার কাছেও চিঠি লিখে দুলু জানিয়েছে রেশমার বিষয়ে। তাই সুফিয়া রেশমার সাথে কথা বলার জন্য এলো একদিন।

সুফিয়া- মা তোর দুলু ফুপু চিঠি লিখচে,ফিরোজ চাকুরী পাচে। বিয়া দিবে,তোর কতা কয়? আমি কিচু কইনি একনও।

রেশমা- মা বিয়া নিয়া এখন ভাবার দরকার নাই, আর দুলু ফুপুর চিঠির উত্তর দিও এটা কয়ে যে আমার মত নাই। আর তুমি তোমার মেয়ে-ছেলেদের বিয়ার জন্য কতা কও,আমার বিয়ার কতা কওয়ার জন্যি মামারা আছে।

আর একটা কতা,রহিম মন্ডলের মেজো ছেলে,পড়াশুনা করে। রহিম মন্ডলের কতা তো জানোই। খুব অভাবী,কিন্তু ছেলে পড়ালেখাত ভালো। তুমি যদি কও তো তোমার মুন্নীর জন্য কতা কও। মুন্নী দেখাশুনা বা পড়া কোনটাতেই ভালো না। এই ছেলের সাতে বিয়া দিলে আমি ওদের ভবিষ্যতে ৫ বিঘা জমি আর ছোট পুকুর লিখা দিমু,খালি শর্ত একটাই ওদের খাঁ বাড়িত থাকা লাগবে। দরকার হলে খাঁ বাড়িও মুন্নির নামে দিমু। ওর যে ছেলে- মেয়ে হবে সবগুলার পড়ালেকা-বিয়ার খরচ সব আমি দিমু।

তুমি মুন্নির সাথে কতা কও,রাজি থাকলে হাস্না নানী রহিম মন্ডলের সাথে কতা কবে। রহিম মন্ডল অমত করবে না।

ওর জন্যই চিন্তা বেশী। ওর আব্বা ওদের আমার হাতে তুল্যা দিয়া গেচে। আমি সেই দায়িত্ব আগে পালন না করতে পারলে তো হবি না।

সুফিয়াও এখন রেশমার সাথে পরামর্শ না করে কোন সিদ্ধান্ত নেয় না। তাই রেশমার এই প্রস্তাবও ফেলতে পারেনি।

মুন্নির বিয়ে হয় রহিম মোল্লার ছেলে আজগরের সাথে।রেশমার জমিগুলা আজগরকে দেওয়া হয় চাষ করার জন্য। আর কথা হয় সময় মতো মুন্নির নামে জমি লিখে দেওয়া হবে।খাঁ বাড়িতে তারা নতুন সংসার শুরু করে।

মুন্নিকে জমি বুঝিয়ে দেওয়া,বাড়ি পুকুর সব ওদের দিয়ে দেওয়ার কারনে রেশমাকে তার বাবা,বড় মা আর দাদীর সম্পত্তিগুলো দেখে নিতে হয় তাশলীর কাছে। কিন্তু তাশলী কখনই আশা করেনি এতো তাড়াতাড়ি রেশমা তার বিষয় সম্পত্তি বুঝে চাইবে। প্রায় ৯ বছরে তারা রেশমার টাকার কোন হিসাব রাখেনি। তারা জমির কাগজ আর বাড়ির চাবি ছাড়া আর কিছুই রেশমাকে বুঝিয়ে দিতে পারেনি। "রেশমা অনেক বেশী খরচ করে, রেশমা ঢাকা থেকে আনা কাপড়,জুতা ছাড়া পরেনা, তাই তার কোন গচ্ছিত টাকা নাই" - এটা তাশলীর আর তার পরিবারের কথা।

তবে তাসলী কে প্রায় কামালের বাবা বলতো - কামালের মা? রেশমার সব কিছুর হিসাব পাই-পাই করে খাতায় তুলে রাখবা। মেয়ে যোগ্য হলে যেনো সব বুঝাই দিতে পারি। রেশমা মা কে কোন কষ্ট দিবানা। আমাদের আজ এই অবস্থা শুধু রেশমার জন্য।

রেশমা শুনতো,মাঝে মাঝেই খালু এমন করে তাশলী খালাকে বলতো। কিন্তু ভালো মানুষগুলো বেশী দিন বাঁচেনা। খালুও ঠিক একদিন হঠাৎ করে চলে গেলো।

১০ রজমানে সবাই ইফতার নিয়ে বসেছে। আযান দিচ্ছে,সবাই পানি মুখে দিবে ঠিক তখনই খালু হঠাৎ পরে গেলো,পানি মুখে দেওয়ার আগেই সব শেষ।

এর পর রেশমা ছেড়েই দিয়েছে তার পাওনা বুঝে পাওয়ার বিষয়টা। কারন তাশলী কেমন সেটা রেশমার বোঝার বাকী নাই। এতো দিন রেশমা তাদের কাছে থেকেছে আর সেখানে থেকে বাপ,মা,দাদীর কবর দেখতে পেয়েছে সবসময় সেটার জন্য বরং রেশমা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পরই একদিন রেশমার মেজো মামা এসে রেশমাকে বলে তারা রেশমার বিয়ের কথা অনেকটা এগিয়েছে। ছেলে চাকুরী করে,সম্ভ্রান্ত পরিবার। রেশমা তার মামাকে তাদের মতো করে দেখতে বলেছিলো। কারণ রেশমা তাদের মতের বাহিরে যাবে না কখনই। এদিকে তাশলীও তার স্বামী মারা যাবার পর আরো বেশী লোভী হয়ে উঠছে দিন দিন। হাস্না নানী রেশমার পাওনা নিয়ে কথা বলে তাই তাশলী এখন হাস্না নানীকে তাড়াতে উঠেপরে লেগেছে। রেশমা বুঝে গেছে এই বাড়িতে আর তার থাকা ঠিক হবে না। তাই মামারা তার বিয়ের কথা বলায় সে আপত্তি করেনি।

ছোট মামার পরিচিত ছেলে। তাই মামা সব দিক দেখে বিয়েটা ঠিক করলো। ছেলের পরিবারের কোন আপত্তি নাই। তবে তারা কেউ দেখতে এলোনা মনে করে রেশমা একটু অবাকই হয়েছিলো। পরে জেনেছে স্কুল থেকে ফেরার পথে ছেলের বোন রেশমাকে দেখেছিলো। খুব ঘটা করে না হলেও বেশ ভালো ভাবেই রেশমার বিয়ে হয়ে গেলো। রেশমা ছেলের ছবিও দেখতে চায়নি বিয়ের আগে। কারন ছোট মামার পছন্দ ভালো এটা রেশমা জানে।

বিয়ের দিন রেশমা যেনো চমকে উঠেছিলো তার বর কে দেখে। এ কি করে সম্ভব? সেই দিনের সেই মুক্তিযোদ্ধা যে রেশমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলো সে আজ রেশমার স্বামী!? রেশমা ভীষন অবাক হয়েছিলো।

বিয়ের পর রেশমার প্রথম জীবন শুরু হয় শশুড় বাড়িতে। এর পর হাস্না নানী সহ চলে আসে শহরে, বাড়ির সব দায়িত্ব মুন্নি কে দিয়ে। ছোট দুই ভাইকে পড়াশুনা করিয়েছে রেশমা,তারা এখন ভালো চাকুরী করে,নিজেদের সংসারও গুছিয়েছে।

রেশমারও এখন ভরা সংসার। স্বামী,ছেলে,ছেলের বউ,মেয়ে-জামাই আর নাতী-নাতনীতে। আর সাথে তার ছোট মা।  (সমাপ্ত)

মন্তব্য