| প্রচ্ছদ

কোরআন নাযিলের ইতিহাস: ১

জুবাইর হাসান মোহাম্মদ জুলফিকার আলী
পঠিত হয়েছে ১৮৯ বার। প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০১৯ । আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০১৯ ।

আউযুবিল্লাহে মিনাশ শায়তানির রাজীম। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। লেখার শুরুতেই আল্লাহ্র দরবারে মোনাজাত করি -“হে আমাদের মালিক, যদি আমরা কোথাও কিছু ভুলে গিয়ে থাকি কিংবা কোথাও যদি আমরা কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি করে বসি- তুমি তার কোনোটার জন্যেই আমাদের পাকড়াও করো না। তুমি আমাদের শাস্তি দিয়ো না।”  
কোরআন নাযিলের ঘটনায় ইতিহসের গতিধারা বদলে গেল। এটা ছিল এক অলৌকিক আলোক শিখার আবির্ভাব। সেই আলোক শিখায় গোমরাহী পথ ভ্রষ্টতার অন্ধকার তিরোহিত হতে লাগল। কোরআন নাযিলের ইতিহসের ধাপগুলো খুবই বিস্ময়কর, রোমাঞ্চকর, শিহরণে ভরপুর। যেমন-
ওহী আসার পূর্ব মুহূর্ত:
মুহাম্মদ (সা:)-এর বয়স চল্লিশ-এর কাছাকাছি হয়ে গেল। এতদিনে তাঁর চিন্তা চেতনার সাথে কোরায়েশদের চিন্তা চেতনার দূরত্ব অনেক বেড়ে গেল। রাসূল (সা:) তখন নিঃসঙ্গ প্রিয় হয়ে ওঠেন। তিনি ছাতু ও পানি নিয়ে মক্কা থেকে ২ মাইল দূরে হেরা গুহায় সময় কাটাতে লাগলেন। রাসূল (সা:) পুরো রমযান মাস এই গুহায় সময় কাটাতেন। পথচারী মিসকীনদের খাবার খাওয়াতেন। বাকী সময় আল্লাহর এবাদতে কাটাতেন। জগতের দৃশ্যমান বস্তুসমূহ নিয়ে চিন্তা করতেন। সৃষ্টির পেছনে যে অদৃশ্য শক্তির হাত রয়েছে তার অভিনব কুদরতের কারিশমা বিষয়ে গভীর চিন্তা করতেন। কোরায়েশদের শেরকপূর্ণ বিশ্বাস দেখে তিনি মোটেই শান্তি পেতেন না। কিন্তু তাঁর সামনে সুস্পষ্ট কোনো পথ ছিল না। তিন বছর ধরে প্রতি রমযান মাসে তাঁর এই নি:সঙ্গপ্রিয়তার মধ্য দিয়ে তিনি সঠিক পন্থা খুঁজছিলেন। প্রকৃত পক্ষে তাঁর এই নি:সঙ্গপ্রিয় হয়ে ওঠা আল্লাহ্পাকের কর্মকৌশলের অংশ। রাসূল (সা:)-কে একাকী থাকতে দিয়ে আল্লাহ্ তাঁকে ভবিষ্যতের গুরু দায়িত্বের জন্য তৈরি করছিলেন। প্রকৃতপক্ষে যে রাসূল (সা:) মানব জীবনে বাস্তব সম্যসার সমধান দিয়ে মুক্তির পথ দেখাবেন, যিনি মানুষের জীবন ধারায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার জন্য কাজ করবেন তাঁকে আল্লাহ্ দীর্ঘ তিন বছর প্রতি রমজান মাসে নির্জনতার মাঝেই রাখলেন। ফলে আল্লাহ্র ইচ্ছায় তিনি জাগতিক অবস্থা, পারিপার্শ্বিক হৈ চৈ হট্টগোল, দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা থেকে সম্পূর্ণ কোলাহলমুক্ত পরিবেশে রইলেন। রাসূল (সা:) যেন কোরআনের মতো মহা আমানতের বোঝা বহন করতে পারেন, পৃথিবীতে পরিবর্তন সাধন করতে পারেন এবং ইতিহাসের মোড় পরিবর্তন করতে পারেন সেজন্যই আল্লাহর পক্ষ থেকে উক্ত নির্জন বসবাস শুরু হয়েছিল। তিনি তৃতীয় ও শেষ বছরে দীর্ঘ একমাস পর্যন্ত সৃষ্টি জগতের স্বাধীন আত্মার সাথে বিচরণ করতেন এবং গায়েবী জগত সম্পর্কে গবেষণা করতেন। তিনি এমনটা করতেন যাতে করে আল্লাহ্ অনুমতি হলে তাঁর নির্দেশিত পথে কাজ করতে পারেন।
ওহী নিয়ে জিবরাইল (আ:)-এর আগমন:
চল্লিশ বছর বয়স হচ্ছে মানুষের পূর্ণতা ও পরিপক্কতারর বয়স। বলা হয়ে থাকে নবী-রাসূলগণ এ বয়সেই ওহী প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। রাসূল (সা:)-এর বয়স চল্লিশ বছর পূর্ণ হওয়ার পর তাঁর জীবন দিগন্তে নবুয়তের নিদর্শন চমকাতে লাগলো। নির্জন বসবাসের তৃতীয় বছরে সত্যস্বপ্নের মাধ্যমে তাঁর নবুয়তের সূচনা হয়। ছয়মাস যাবৎ তিনি বিভিন্ন সত্য স্বপ্ন দেখতেন। এ সম্পর্কে হযরত আয়েশা (রা:) বলেন-
রাসূল (সা:)-এর ওপর ওহী নাযিলের সূচনা সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে হয়েছিল। তিনি যে স্বপ্ন দেখতেন তা শুভ্র সকালের মতো প্রকাশ পেতো। এরপর তিনি নির্জনতা প্রিয় হয়ে পড়েন। তিনি হেরা গুহায় এবাদত বন্দেগীতে কাটাতে থাকেন। এসময় একাধারে কয়েক রাত পর্যন্ত ঘরে ফিরতেন না। তাই তিনি পানাহার সামগ্রী সাথে করে নিয়ে যেতেন। যে কয়েকদিন হেরা গুহায় অবস্থান করছিলেন ঠিক সে কয়েকদিনের খাবার নিয়ে পুনরায় সেখানে ফিরে যেতেন। 
এমনি করে এক পর্যায়ে তাঁর কাছে সত্যের আবির্ভাব ঘটে। ফেরেস্তা জীবরাঈল (আ:) এসে তাঁকে বলেন ‘ইকরা’ পড়ুন। হুজুর (সা:) বললেন ‘আমি তো পড়তে জানি না’। রাসূল (সা:)-এর জবাব শুনে ফেরেস্তা তাঁকে জড়িয়ে ধরে জোরে চাপ দেন। রাসূল (সা:) অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এরপর ফেরেস্তা তাঁকে ছেড়ে দিয়ে আবার বললেন-পড়ুন। মুহাম্মদ (সা:) বললেন-‘আমিতো পড়তে জানি না।’ পুনরায় ফেরেস্তা তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে চাপ দেন। রাসূল (সা:)-এর সব শক্তি যেন নিংড়ে শেষ হয়ে গেল। এরপর তৃতীয় বার ফেরেস্তা তাঁকে বুকে জড়িয়ে চাপ দেন এবং হুজুর (সা:) চরম ক্লান্তি অনুভব করেন। অতপর জীবরাঈল (আা:) তাঁকে ছেড়ে দিয়ে বলতে লাগলেন-
“পাঠ করুন, আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট বাধাঁ রক্ত থেকে। পড়–ন এবং আপনার পালন কর্তা অত্যন্ত অনুগ্রহপরায়ণ। যিনি শিক্ষা দিয়েছেন কলমের সাহায্যে। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে-যা সে জানতো না।” -সূরা আলাক: ১ - ৫, [আলাক শব্দের অর্থ এঁটে থাকা বস্তু, নিষিক্ত ডিম্ব, জমাট বাঁধা রক্তের পিণ্ড। ]  চলবে...

 

মন্তব্য