| প্রচ্ছদ

কোরআন নাযিলের ইতিহাস-৬ঃ নবী করীম সা: চরম ধৈর্য্য সহিষ্ণুতার পরিচয় দিলেন

জুবাইর হাসান মোহাম্মদ জুলফিকার আলী
পঠিত হয়েছে ১১৮ বার। প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০১৯ । আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০১৯ ।

নবী করিম সা: -এর জীবনে নবুয়্যতের ১০ম বছরটি ছিলো অত্যন্ত কষ্টের সময়। কুরাইশদের সব কয়টি গোত্র ঐক্যবদ্ধ হয়ে বনু হাশিম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত তিন বছর যাবত বয়কট নীতি গ্রহণ করেছিলো। এ সময় নবী করীম সা: তাঁর বংশের লোকজন ও সংগী সাথীদের নিয়ে আবু তালিব মহল্লায় অবরুদ্ধ থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। কুরাইশরা চারদিক থেকে এই মহল্লাটিকে ঘেরাও করে রেখেছিলো। ফলে এ বেষ্টনী অতিক্রম করে কোনো খাদ্য রসদ ভিতরে পৌঁছাতে পারতো না। কেবলমাত্র ওকাজের মেলার সময় এইসব অবরুদ্ধ লোকেরা বাইরে এসে কিছু ক্রয় বিক্রয় করতে পারতো। কিন্তু আবু লাহাব যখন তাদের মধ্যে কাউকেও বাজারের দিকে কিংবা কোনো ব্যবসায়ী কাফেলার দিকে যেতে দেখতো তখনই ব্যবসায়ীদেরকে ডেকে বলতো, “এ লোকটি কিছু কিনতে চাইলে সেটার দাম এত বেশি দাবী করবে, যেন সেটা কেনা তার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। পরে আমি সেই জিনিস তোমাদের কাছ থেকে কিনে নেব এবং তোমাদের কোনো ক্ষতি হতে দেব না।” ক্রমাগত তিন বছর যাবত অব্যাহত এ বয়কট নীতি মুসলমান ও বনু হাশিমের মেরুদণ্ড একেবারে চূর্ণ করে দিয়েছিলো। এ সময় তাদেরকে এমন মারাত্মক অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো যে, কোনো কোনো সময় ঘাস ও গাছের পাতা খাওয়াও তাদের ভাগ্যে জোটে নাই।         

                                      
অনেক কষ্টের পর আল্লাহর অনুগ্রহে যে বছর এই বয়কট শেষ হয়, সে বছরই নবী করিম সা: -এর চাচা আবু তালিব ইন্তেকাল করেন। নবুয়্যতের দশ বছর ধরে এই আবু তালিবই ছিলেন নবী করিম সা: -কে দুর্গের দেয়াল তুলে আগলে রাখতেন। পিতৃ-মাতৃহীন এতিম রাসূল চাচা আবু তালিবের স্নেহেই লালিত-পালিত হয়েছিলেন। এই কারণে আবু তালিবের মৃত্যু রাসূল সা: -এর কাছে খুবই মর্মান্তিক হয়ে দেখা দিয়েছিলো। আবু তালিবের ইন্তেকালের দুমাস, একমাস বা শুধু তিনদিন পর উম্মুল মোমেনীন খাদিজাতুল কোবরা রা: ইহলোক ত্যাগ করেন। নবুয়্যতের ১০ম বর্ষের রমজান মাসে তাঁর ইন্তেকাল হয়। সে সময় তাঁর বয়স হয়েছিলো ৬৫ বছর। আর রাসূল সা: -এর বয়স পঞ্চাশ-এ পড়েছিলো।


রাসূল সা: -এর জন্যে হযরত খাদিজা রা: ছিলেন আল্লাহর এক মহামূল্যবান নেয়ামত। দীর্ঘ ২৫ বছর যাবত তিনি রাসূল সা: -এর জীবন সংগীনি ছিলেন। সুদীর্ঘকালীন সেই সময়ে তিনি রাসূল (সা:)-এর দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ মুসিবতে স্বামীর জন্যে বিচলিত হয়ে উঠতেন। বিপদে তাঁকে ভরসা-শক্তি দিতেন। রেসালতের প্রচার কাজে রাসূল সা: -কে সাহায্য সহযোগিতা করতেন। নিজের জানমাল দিয়েও তাঁর কল্যাণ কামনা করতেন এবং সমবেদনা প্রকাশ করতেন। রাসূল সা: নিজেই হযরত খাদিজা রা: সম্পর্কে বলতেন- “যে সময় মানুষ আমার সাথে কুফর করেছিলো, সে সময় খাদিজা আমার ওপর ঈমান এনেছিলেন, যে সময়ে লোকেরা আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিলো, তখন খাদিজা আমাকে সত্যবাদী প্রতিপন্ন করেছেন, যে সময় লোকেরা আমাকে বঞ্চিত করেছিলো, সে সময় তিনি আমাকে নিজের সম্পদে অংশীদার করেছেন। তাঁর গর্ভ থেকে আল্লাহ আমাকে সন্তান দিয়েছেন; অন্য স্ত্রীদের গর্ভ থেকে আমাকে কোনো সন্তান দেননি।”


সহীহ বোখারিতে হযরত আবু হোরায়রা থেকে বর্ণিত, হযরত জিবরাঈল আ: নবী করীম সা: -এর কাছে এসে বললেন- “হে আল্লাহর রাসূল দেখুন, খাদিজা আসছেন। তাঁর কাছে একটি বরতন রয়েছে। সে বরতনে তরকারি, খাবার অথবা পানীয় রয়েছে। তিনি এলে আপনি তাঁকে তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সালাম জানিয়ে জান্নাতের একটি মতিমহলের সুসংবাদ দেবেন। যে মহলে কোনো শোরগোল এবং ক্লান্তি-অবসন্নতা থাকবে না।” 


পর পর সংঘটিত আবু তালিবের মৃত্যু ও খাদিজা রা: -এর মৃত্যুর কারণে নবী করীম সা: যে দুঃখ-কষ্ট পেয়েছিলেন সে জন্য তিনি ঐ বছরটির নাম রেখেছিলেন ‘আমুল হোযন’ বা দুঃখের বছর। হযরত খাদিজা রা: ও আবু তালিবের ইন্তেকালের পর মক্কার কাফের সমাজ নবী করীম সা: -এর বিরোধিতায় ও শত্রুতায় অত্যধিক সাহসী হয়ে ওঠে। তাদের শত্রুতামূলক কার্যক্রম আগের থেকেও অনেক বেশি তীব্র ও ব্যাপক হয়ে ওঠে। 


আবু তালেবের ইন্তেকালের পর কোরায়েশরা নবী করিম সা: -এর ওপর এতো বেশি নির্যাতন চালিয়েছিলো, যা তাঁর জীবদ্দশায় তারা চিন্তাও করতে পারেনি। এমনকি কোরায়েশের এক বেকুব লোক সামনে এসে রাসূল সা: -এর মাথায় মাটি নিক্ষেপ করে। এই অবস্থাই তিনি ঘরে ফেরেন। তাঁর এক মেয়ে সে মাটি পরিষ্কার করে। মাটি পরিষ্কার করার সময় মেয়ে শুধু কাঁদছিলেন, আর রাসূল সা: তাঁকে সান্তনা দিয়ে বলছিলেন- “মা তুমি কেঁদো না। আল্লাহ্ তোমার আব্বাকে হেফাযত করবেন। এসময় তিনি এ কথাও বলেছিলেন, কোরায়েশরা আমার সাথে এমন কোনো খারাপ ব্যবহার করেনি যা আমার কাছে অপছন্দ ঠেকেছে।” 


সেই নিদারুন দুঃসময়েও মুসলমানরা কিভাবে অটল অবিচল থাকতে সক্ষম হলেন? একথা ভেবে গভীর বোধশক্তি এবং অতিশক্ত মনের অধিকারী মানুষও অবাক হয়ে যায়। বড় বড় জ্ঞানী গুণীরা পর্যন্ত অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করেন, এমন কি কার্যকারণ ছিলো, যেগুলো মুসলমানদেরকে ধৈর্য্যরে এমন অলৌকিকতার সীমা পর্যন্ত অবিচল দৃঢ়পদ রেখেছিলো? এমন অত্যাচার নির্যাতনের মুখেও মুসলমানরা ধৈর্য্য সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছিলো; যা শুনে পশম দাঁড়িয়ে যায়, অন্তর কেঁপে ওঠে। এই প্রশ্নটিই বার বার মনের দরজায় করাঘাত করে এবং অন্তরের অন্তস্থলে প্রশ্ন জাগে কিভাবে মুসলমানরা এই বিপদে ধৈর্য্য ধরলো? ধৈর্য্য ধরার যেসব কার্যকারণ বলা যায় সেটার মধ্যে অন্যতম হলো: (১) ঈমানের সৌন্দর্য, (২) আকর্ষণীয় নেতৃত্ব (৩) দায়িত্ব সচেতনতা (৪) পরকালের ওপর বিশ্বাস (৫) কঠিন থেকে কঠিনতর অবস্থায় কোরআনের শিক্ষা (৬) কোরআনের আয়াতের মাধ্যমে সাফল্যের সুসংবাদ।

 চলবে...
    

 

মন্তব্য