| প্রচ্ছদ

বগুড়ায় আ’লীগের দখলে থাকা রাজপথ পুনর্দখলের চেষ্টা বিএনপি’রঃ উত্তপ্ত হচ্ছে মাঠ

পুণ্ড্রকথা রিপোর্টঃ
পঠিত হয়েছে ৩০৯ বার। প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ । আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ।

বগুড়ায় আওয়ামী লীগের দখলে থাকা রাজপথ দখলের চেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠেছে বিএনপি। দীর্ঘদিন নিস্ক্রিয় থাকার পর আসছে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি’র এই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় উত্তপ্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গন। এরই মধ্যে উভয় দলের নেতা-কর্মী এবং তাদের বাড়ি-গাড়ি লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনাও ঘটেছে।


এমন পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। তাদের শঙ্কা নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তথা আইন-শৃঙ্খলাও তত খারাপ হতে থাকবে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও এ আশঙ্কাকে অমূলক বলছেন না। তারা মনে করেন কোন পক্ষই যাতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য পুলিশকে এখন থেকেই সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে এসব উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথা উড়িয়ে দিয়ে বলা হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সব সময় তৎপর। প্রতিটি ঘটনাই পুলিশ তদন্ত করছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। কাজেই উদ্বিগ্ন হওয়ার কোন কারণ নেই।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৪ সালের পাঁচ জানুয়ারি নির্বাচনের পর বিএনপি’র বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মী মামলার জালে কারারুদ্ধ হন। আর যারা বাইরে ছিলেন তারা নিজেদের গুটিয়ে নেন। ফলে মাঠে শাসক দল আওয়ামী লীগের সামনে কোন প্রতিপক্ষ ছিল না। কিন্তু গেল ৪ বছরে কারারুদ্ধ বিএনপি এবং তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা জামিনে বেড়িয়ে এসে নানাভাবে রাজপথে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন।


সর্বশেষ গত ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর পূর্ব ঘোষিত সমাবেশের দিন সকাল থেকেই ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা দলীয় কার্যলয় এবং সংলগ্ন সাতমাথা চত্বরে অবস্থান নেওয়ায় শহর জুড়ে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। তবে ওইদিন বড় ধরনের কোন সহিংস ঘটনা না ঘটলেও সাতমাথার অদূরে যুবদল নেতা-কর্মীদের ধাওয় দিয়ে এক কর্মীকে ছুরিকাঘাত করা হয়। এছাড়া অপর দুই যুবদল কর্মীকে লাঠি পেটাও করা হয়। একইদিন একটি মোটর সাইকেলেও আগুন দেওয়া হয়। বিএনপির পক্ষ থেকে এসবের জন্য ছাত্রলীগকে দায়ী করা হয়েছে।


তার আগের দিন ৩১ আগস্ট শহরের মালতিনগর এলাকায় ১১নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হোসেন আলীর বাড়ি লক্ষ্য করে ককটেল হামলা করা হয়। এর প্রতিবাদে গত ৩ সেপ্টেম্বর দলের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করা হয়। ৩১ আগস্ট রাতে শহরের রহমাননগরে স্বেচ্ছাসেবক লীগ বগুড়া শহর কমিটির আহবায়ক শহিদুল ইসলাম বাপ্পির প্রাইভেট কার ভাংচুর করা হয়। তার এক সপ্তাহ আগে ২৩ আগস্ট জেলার নন্দীগ্রামে মোশাররফ হোসেন নামে বিএনপির সম্ভাব্য মনোনয়ন এক প্রত্যাশী এবং তার অনুসারীদের ওপর হামলা করেছে ছাত্রলীগ। ওই ঘটনায় ছাত্রলীগের দায়ের করা এক মামলায় পুলিশ স্থানীয় এক বিএনপি নেতাকে গ্রেফতার করেছে।


গত ২ সেপ্টেম্বর পুলিশ জেলার শাজাহানপুর উপজেলা বিএনপি অফিসের ভেতর থেকে ককটেলসহ বেশ কিছু ধারালো অস্ত্র এবং লাঠি-সোটা উদ্ধার করে। ওই ঘটনায় উপজেলা বিএনপির আহবায়ক খায়রুল বাশারসহ ৬০ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলাও করে পুলিশ। এছাড়া গত ৩ দিনে পুলিশ সদরের গোপুল ইউনিয়ন বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব খানসহ ৩নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করেছে।


বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনের পর বগুড়া জেলায় ২৪২টি মামলায় ওই দলটির প্রায় ১৪ হাজার নেতা-কর্মী গ্রেফতার হন। ২০ দলের অন্যতম শরীক জামায়াতেরও বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মী কারারুদ্ধ হন। তবে গেল চার বছরে বিএনপি এবং তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের ৯৯ শতাংশ নেতা-কর্মী জামিনে বেড়িয়ে এসেছেন। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, যেহেতু চলতি বছরের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কথা রয়েছে। তাই নেতা-কর্মীরা গা ছাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। ‘সহায়ক সরকারের অধীনে’ নির্বাচনের দাবিতে তারা আন্দোলনেরও প্রস্তুতি নিচ্ছে।


আন্দোলনকে বেগবান করার কৌশল হিসেবে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও মৎস্যজীবী দলের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। যে কারণে কেন্দ্র থেকে ঘোষিত প্রতিটি কর্মসূচীতেই নেতা-কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। দীর্ঘদিন পর তারা রাজপথে এভাবে সক্রিয় হওয়ায় শাসক দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। ফলে বিভিন্ন স্থানে সংঘাত ও সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে শুরু করেছে।


বগুড়া জেলা বিএনপি সভাপতি সাইফুল ইসলাম দাবি করেছেন, তাদের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর কর্মসূচীতে নেতা-কর্মীসহ সাধারণ মানুষের ঢল দেখে ক্ষমতাসীনরা বিচলিত হয়ে পড়েছে। তারা বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের আক্রমণের পথ বেছে নিয়েছে। পাশাপাশি পুলিশকেও ব্যবহার করছে। তিনি বলেন, ‘আমরা কোন ধরনের অরাজক পরিস্থিতি চাই না। আমরা শান্তিপূর্ণভাবেই সকল কর্মসূচী পালন করতে চাই। তবে বাধা দেওয়া হলে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। কারণ আমাদের নেতা-কর্মীদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তারা আর পিছু হঠবে না। এখন শুধু সামনেই এগুবে।’


বিএনপি এবং তার অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের মাঠে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা প্রসঙ্গে বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মমতাজ উদ্দিন বলেন, ‘শুনেছি তাদের নতুন নতুন কমিটি হচ্ছে। সে কারণেই হয়তো ওদের সমর্থকরা একটু চাঙ্গা হয়েছে। কিন্তু এটা বেশিদিন থাকবে না। বিএনপির প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর সমাবেশেই পাল্টাপাল্টি শ্লোগান হয়েছে। দলের মনোনয়ন নিয়ে সেই বিরোধ আরও দানা বাঁধবে।’ সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা হলে জনগণ বসে থাকবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা কারো সঙ্গে পায়ে পড়ে ঝগড়া করতে চাই না। কিন্তু কেউ যদি সেই চেষ্টা করে তাহলে জনগণ বসে থাকবে না।’


বগুড়ায় সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযানের (সুপ্র) সাধারণ সম্পদাক কেজিএম ফারুক মনে করেন, নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দলগুলো মাঠে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করবে-এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কোন পক্ষই যাতে জনগণের কিংবা জানমালের ক্ষতি করতে না পারে সে ব্যাপারে পুলিশকে তৎপর থাকতে হবে। তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। নিজ নিজ কর্মীরা যাতে সংযত থাকে সে ব্যাপারে তাদের উদ্যোগী হতে হবে।


জানতে চাইলে বগুড়ায় পুলিশের মিডিয়া বিভাগের প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সব সময়ই তৎপর। কেউ যেন তার কার্যকলাপ দ্বারা জনগণের জানমালের ক্ষতির কারণ না হয় সেজন্য আমরা সজাগ রয়েছি।  যে কোন নাশকতার চেষ্টা কঠোর হস্তে দমন করা হবে।’

মন্তব্য