| প্রচ্ছদ

আমাদের মা জননী-১

ইতিহাসের একটি জঘন্যতম অপবাদ

জুবাইর হাসান মোহাম্মদ জুলফিকার আলী
পঠিত হয়েছে ৬৩ বার

মদিনার মোনাফেকরা মাঝে মধ্যেই সুযোগ বুঝে মুসলমানদের বিরুদ্ধে তীব্র অপপ্রচার চালাতো। এমনকি তারা একবার সকল মুসলমানদের মা খ্যাত আমাদের প্রিয় মা জননী হযরত আয়েশা সিদ্দিকা তাহেরা (রা:) এর বিরুদ্ধেও মারাত্মক অপপ্রচার চালালো। তাঁর ওপর ইতিহাসের একটি জঘন্যতম অপবাদ দেয়ার প্রচেষ্টা চালানো হলো। তাদের এই ঘৃণ্য কুৎসিত পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্য ছিল এই যে, যদি মুহম্মদ সা:, তাঁর বন্ধু আবু বকর রা: এবং রাসূল সা: স্ত্রী আয়েশা রা:- এই তিনজনকেই একত্রিতভাবে ষড়যন্ত্রের গ্যাঁড়াকলে ফেলে, চারিত্রিক অপবাদ দিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করা যায়- তবেই নব উত্থিত অতিক্ষুদ্র এই ইসলামী কাফেলাকে দুনিয়ার বুক থেকে উৎখাত করা যাবে। আমাদের এখনকার আলোচনার বিষয়বস্তু মদিনার মোনাফেক সরদার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের তৈরি করা ইতিহাসের সেই ভয়ংকর -বীভৎস- কুৎসিত ষড়যন্ত্র নিয়ে। 
কে এই আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই!
মদিনায় মুনাফেক সমাজের সরদার ছিলো আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই। রাসূল সাঃ এর সাথে তার বিশেষভাবে শত্রুতা ছিলো। মদিনায় রাসুল সাঃ এর আগমনের পূর্বে আওস ও খাযরাজ গোত্র তার নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল হয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। তার অভিষেকেরও আয়োজন করা হয়েছিল। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের মাথায় পরানোর জন্য মুকুট তৈরি করা হচ্ছিলো। এমনি সময় রাসুল সাঃ বিপ্লবী আলোর আভা নিয়ে মদিনায় আগমন করেন। এরফলে মদিনার সর্বস্তরের জনগণের দৃষ্টি আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের ওপর থেকে সরে যায়। এই ব্যক্তিটি অতপর ভাবতে শুরু করে যে, আল্লাহর রাসূলই বুঝি তার নিশ্চিত বাদশাহী কেড়ে নিয়েছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের জিঘাংসা ও ক্রোধের প্রকাশ রাসূল সাঃ এর হিজরতের পরপরই ঘটেছিলো। একদিন রাসূল সাঃ গাধার পিঠে চড়ে এক জনসমাবেশের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সে সমাবেশে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই উপস্থিত ছিলো। সে চাদরে নিজের নাক ঢেকে বললো, আমাদের উপর ধুলো উড়িও না। এরপর রাসূল সাঃ লোকদের উদ্দেশ্যে আল্লাহর পবিত্র কালাম তেলাওয়াত করছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই বললো আপনি নিজের ঘরে বসে থাকুন, আমাদের মজলিসে এসে বিরক্ত করবেন না। এইসব ঘটনা হচ্ছে তার লোক দেখানো ইসলাম গ্রহণের আগের কথা। বদরের যুদ্ধের পর বাতাসের গতিবেগ লক্ষ করে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইসলামের প্রতি বাহ্যিক আনুগত্য দেখায়। অর্থাৎ বর্ণচোরা মুসলমানের রূপ ধারণ করে। তার এই লোক দেখানো ইসলাম গ্রহণের পরও এই ঘৃণিত লোকটি ছিলো আল্লাহ তায়ালা, তাঁর প্রিয় রাসূল এবং মুসলমানদের শত্রু। ইসলামী সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি এবং ইসলামের আওয়াজ দুর্বল করার কাজে সে চেষ্টার কোনো ত্রুটি করেনি। সে একের পর এক ইসলাম বিরোধী কাজ চালিয়ে যায়। ইসলামের শত্রুদের সাথে তার আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। মুসলমানদের ভয়ানক দুর্যোগ-বিপদের দিনে সে সবসময় শত্রুপক্ষের সাথে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকতো। বনু কায়নুকা গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযান, ওহুদ যুদ্ধ, বনু নাযিরের অভিযান, খন্দকের যুদ্ধ ইত্যাদি ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিলো পুরোপুরি ইসলাম বিরোধী। তার কাজই ছিলো মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ, বিশৃঙ্খলা, হতাশা, নৈরাজ্য সৃষ্টির প্রাণপণ চেষ্টা করা। অথচ সে ওপরে ওপরে নিজেকে বড়ই রাসূল প্রেমিক বা ইসলাম প্রিয় হিাসবে দেখাতে চাইতো। বাহ্যিক ইসলাম গ্রহণের পর সে প্রতি শুক্রবার রাসূল সাঃ খুতবা দেওয়ার আগে উঠে দাঁড়িয়ে বলতো, “হে লোক সকল, তিনি তোমাদের মাঝে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ তায়ালা তাঁর মাধ্যমে তোমাদের মর্যাদা ও সম্মান প্রদর্শন করেছেন। কাজেই তাঁকে সাহায্য করো, তাঁর হাতকে শক্তিশালী করো, তাঁর কথা শোনো এবং মানো।”- এসব কথা বলে সে বসে পড়তো। এ ধরনের চরিত্রের নামই হলো মোনাফেক। মোনাফেকদের ধ্যান ধারনা, চিন্তা-ভাবনা, কাজকর্ম, মানসিক অবস্থা, স্বার্থপরতা, তাদের সুযোগ সন্ধানী চরিত্র ইত্যাদির আলোচনা পরবর্তীতে থাকবে, ইনশাল্লাহ। 
হযরত আয়েশা রা: এর প্রতি চারিত্রিক অপবাদ দেয়ার ষড়যন্ত্র কেন করা হল ? 

ইসলামের সকল শত্রুরা একথা ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিল যে, ইসলামের বিজয়ের কারণ বস্তুগত শক্তি ও অস্ত্রশস্ত্রের আধিক্যের জোরে নয়। এই বিজয় প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর আনুগত্য ও চারিত্রিক মূল্যবোধের মধ্যে নিহিত। এর দ্বারা সমগ্র ইসলামী সমাজ এবং ইসলামের সাথে সম্পর্কিত সকল মানুষই সাফল্য লাভ করে। ইসলামের শত্রুরা একথাও জানতো যে, রাসূল সা: এর চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব হচ্ছে তুলানবিহীন আদর্শ এবং তার সেই চরিত্র ও ব্যক্তিত্বই মুসলমানদের সকল সাফল্যের উৎস। ইসলামের শত্রুরা রাসূল সা: এর হিজরতের পর থেকে একটানা পাঁচ বছর যাবত নানান চেষ্টা ও যুদ্ধ করার পর বুঝেছিলো যে, আল্লাহর দ্বীনের অনুসারীদের অস্ত্রের দ্বারা নাস্তানাবুদ করা সম্ভব নয়। তারা গত ৫ বছর একে একে বদর, ওহুদ, খন্দকের যুদ্ধসহ আরো ছোট-ছোট কতিপয় যুদ্ধ অভিযানে মুসলমানদের দৃঢ়তা, সাহসিকতা, আল্লাহ ভীরুতা, রাসূলপ্রিয়তা, সততা, নিষ্ঠা ইত্যাদি সবকিছুই প্রত্যক্ষ করেছিলো। ফলে তারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে, চারিত্রিক ক্ষেত্রে কলঙ্ক আরোপ করলে এবং সেটাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক মিথ্যা প্রচার প্রচারণা চালালে আল্লাহর দ্বীনের কাজ থামানো যাবে। এ উদ্দেশ্য পূরণের জন্য তারা আল্লাহর রাসূলকেই বেছে নিয়েছিলো। আর এ লক্ষকে সামনে রেখেই হযরত আয়েশা রা: এর প্রতি চারিত্রিক অপবাদ দেয়ার সকল মিথ্যা প্রচার প্রচারণার দায়িত্ব সেই মোনাফেক সরদার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই স্বয়ং নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলো। মোনাফেকরা যেহেতু মুসলমানদের মধ্যেই থাকতো, মদিনায় বসবাস করতো, তাই মুসলমানদের সাথে অনায়াসেই মেলামেশার সুযোগ পেতো। এ কারণে মুসলমানদের অনুভূতিতে তারা সহজেই আঘাত দিতে সক্ষম ছিলো।

[পরবর্তী অংশ আগামীকাল]
 

মন্তব্য