| প্রচ্ছদ

আমাদের মা জননী-২

আয়েশা রা: এর প্রতি ইতিহাসের যে জঘন্যতম অপবাদ দেয়া হল

জুবাইর হাসান মোহাম্মদ জুলফিকার আলী
পঠিত হয়েছে ৬৫ বার। প্রকাশ: ২৩ মে ২০১৯ ।


[গতকালের পর থেকে পড়তে হবে]
হযরত আয়েশা রা: কে অপবাদ দেয়ার ঘটনাটি হিজরি ৫ম সালের (মতান্তরে ষষ্ঠ হিজরি) সময়কালের। রাসূল সা: এর নেতৃত্বে বনু মোস্তালিক অভিযান থেকে মদিনায় ফেরার সময় হযরত আয়েশা রা: কে ঘিরে স্বাভাবিক সাধারণ একটা বিষয়কে মোনাফেক সরদার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ফলাও করে প্রচার প্রোপাগান্ডা চালাতে থাকে। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের এই ষড়যন্ত্রের মায়াজালে কিছু সংখ্যক সরলমনা মুসলমানও জড়িয়ে পড়েছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের এই মারাত্মক মোনাফেকী কর্মকান্ডটি যদি রাসুল সা: এবং তাঁর সাহাবিরা ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও বিচক্ষণতার সাথে মোকাবেলা না করতেন, তাহলে মদিনার এই নবগঠিত মুসলমান সমাজ এক ভয়াবহ আত্মকলহ ও গৃহযুদ্ধে চুরমার হয়ে যেতো। 
যাহোক, হযরত আয়েশা রা: এর বিরুদ্ধে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই যে চারিত্রিক ত্র“টির অভিযোগ এনেছিলে, সেই মিথ্যা অভিযোগকে সত্যের বিপরীত কথা বলে স্বয়ং আল্লাহর তরফ থেকে অভিযোগ খণ্ডন করা হয়েছে। কোরআনের ভাষায় ইফ্ক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ইফ্ক শব্দের অর্থ মূল কথাকে উল্টিয়ে দেয়া, প্রকৃত সত্যের বিপরীত কথা বলা এবং বাস্তব ঘটনাকে বিকৃত করা। তাই ঐতিহাসিকভাবে আয়েশা রা: কে অপবাদ দেয়ার ঘটনাকে ইফ্ক এর ঘটনা বলে নামকরণ করা হয়েছে। রাসূল সা: এর জীবন চরিত সম্পর্কে বিভিন্ন সীরাত গ্রন্থেও এটাকে ইফ্ক এর ঘটনা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঘটনাটি বোখারি,মুসলিম, মোসনাদে আহমদসহ বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে বহু সংখ্যক হাদিস দ্বারা বর্ণিত হয়েছে। নিদারুণ সেই ব্যথা-বেদনার করুণ মর্মস্পর্শী কাহিনী মা আয়েশা রা:-এর নিজের জবানিতেই পূর্ণাঙ্গরূপে বর্ণিত হয়েছে। বিভিন্ন হাদীস ও সীরাত গ্রন্থে বর্ণিত বর্ণনার সংমিশ্রনে এই ঘটনা সম্পর্কে একটা পূর্ণ বিবরণ তুলে ধরা যাক:-
হযরত আয়েশা সিদ্দিকা তাহেরা রা: বলেন,
“রাসূল সা: যখনই কোনো সফরের মনোস্থির করতেন তখন যেকোনো স্ত্রীকে সাথে নিতেন। আর এজন্যে তাদের মধ্যে কখন কাকে নিবেন তা লটারি* দ্বারা নির্ধারন করে নিতেন। ৫ম হিজরিতে (মতান্তরে ষষ্ঠ হিজরিতে) অনুষ্ঠিত (যুদ্ধ) গাযওয়ায়ে বনু মোসতালিকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার সময়ে লটারিতে আমার নাম উঠলো। অতঃপর, তাঁর সাথে আমি রওয়ানা হই। 
এ সময়ে পর্দার আয়াত নাযিল হয়ে গিয়েছিলো। আর আমাকে উটের পিঠে রক্ষিত হাওদা-তে (পালকি-তে) তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো। এই হাওদা-তে (পালকি-তে) আমি নিজেই ওটা-নামা করতাম। এভাবেই আমরা এগিয়ে গেলাম। অবশেষে রাসূল সা: যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে মদিনার পথে আমাদেরকে নিয়ে রওয়ানা হলেন। পথে এক জায়গায় কাফেলা যাত্রা বিরতি করলো। আমরা তখন মদিনার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলাম। এমন সময় রাত্রিতে কাফেলাকে পুনরায় রওয়ানা হওয়ার ঘোষণা শুনানো হলো। যখন এই ঘোষণা দেয়া হচ্ছিলো, তখন আমি একটু প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে গিয়েছিলাম। প্রয়োজন সেরে আসার সময় বুকে হাত দিয়ে দেখলাম আমার হারটি নেই। বুঝলাম আমার নখে লেগে হারটি ছিঁড়ে পড়ে গেছে। ফিরে গেলাম হারটি খুঁজতে। খুঁজতে খুঁজতে বেশ কিছু সময় দেরী হয়ে গেলো। ইতিমধ্যে কাফেলা রওয়ানা হওয়ার সময় হয়ে গেছে। যারা আমার হাওদাটি (পালকি) উঠের পিটে উঠানো নামানোর দায়িত্বে ছিলো, হাওদাটির পর্দা নেমে থাকার কারণে তারা (চারজন মিলে) হাওদাটি উটের পিঠে তুলে বেঁধে দিলো। কিন্তু আমি যে ভেতরে নেই তা টেরও পেলো না। এ সময়ে আমি শারীরিক দিক দিয়ে খুব ক্ষীণ স্বাস্থের অধিকারী ছিলাম। কম খাদ্য গ্রহণের দরুণ আমরা মেয়েরা ছিলাম বড়ই হালকা-ভারহীন। এজন্যে তারা মনে করেছিল আমি ভেতরেই আছি। এভাবে তারা উটটিকে কাফেলার সাথে চালিয়ে দিলো।
আমি হারটি খুঁজে পেয়ে ফিরে এসে দেখি, সবাই বেশ অগ্রসর হয়ে গেছে। কেউ নেই, সবাই চলে গেছে। এজন্যে যেখানে ছিলাম সেখানেই বসে পড়লাম। আর ভাবলাম, কিছু দূরে গিয়ে অবশ্যই তারা আমার অনুপস্থিতি টের পেয়ে আমার খোঁজে ফিরে আসবে। আমি বসে থাকতে থাকতে প্রবল ঘুম পেলো। কাজেই আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। এ সময় সাফওয়ান ইবনে মোয়াত্তাল, যাকে পেছনে রেখে যাওয়া কোনো জিনিস কুড়িয়ে নিয়ে আসার জন্যে নিযুক্ত করে রাখা হয়েছিল, সেই ব্যক্তি সেখানে এসে হাজির হলো যেখানে আমি ছিলাম। সে দূর থেকে দেখতে পেলো এবং ঘুমাতে থাকা কোনো একজন ব্যক্তি মনে করে আমার কাছে এলো। সে আমাকে দেখে চিনে ফেললো। কারণ পর্দার আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্বে সে আমাকে দেখেছিল। সে বুঝে গেলো কিছু একটা দূর্ঘটনা ঘটেছে। এজন্যে বলে উঠলো, “ইন্না লিল্লাহে ওয়া-ইন্না ইলাইহি রাজেউন।” এ আওয়াজ শুনে আমি জেগে উঠলাম এবং চাদর দিয়ে আমার চেহারা ঢেকে ফেললাম। আল্লাহর কসম, সে আমার সাথে একটি কথাও বললো না। আমি তাঁর মুখে বিপদকালীন দোয়া “ইন্না লিল্লাহে ওয়া-ইন্না ইলাইহি রাজেউন” পড়া ছাড়া আর কোনো আওয়াজই শুনিনি।
সে ব্যক্তি (সাফওয়ান ইবনে মোয়াত্তাল) একটু চিন্তা করে তাঁর বাহন উটনীটাকে আমার সামনে বসিয়ে দিলেন, আর নিজে দূরে সরে দাঁড়ালেন। আমি উটনীর ওপর উঠে বসলাম। আর তিনি লাগাম ধরে হেঁটে রওয়ানা হলেন। প্রায় দুপুরের সময় আমরা কাফেলাকে ধরে ফেললাম, যখন তারা একস্থানে গিয়ে যাত্রা বিরতি করেছে মাত্র। আমি যে পেছনে পড়ে রয়ে গেছি, তখনও তা কেউ জানতে পারেনি। এ ঘটনার ওপর কুচক্রীরা মিথ্যা অপবাদ রটাতে থাকে এবং যারা এ ব্যাপারে অগ্রণী ছিলো, তার মধ্যে (মোনাফেক সরদার) আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ছিলো সকলের চাইতে অগ্রসর। কিন্তু আমার বিরুদ্ধে কী কী কথা বলা হচ্ছে, আমি সেটার কিছুই জানতে পারিনি।

[পরবর্তী অংশ আগামীকাল]


[বিঃ দ্রঃ রাসূল সা: বনু মোস্তালিক যুদ্ধ অভিযানে যাওয়ার সময় তাঁর স্ত্রীদের মধ্য থেকে কোন্ স্ত্রী তাঁর সফর সঙ্গিনী হবেন, সে ব্যাপারে তিনি লটারি করে স্ত্রী নির্বাচন করেছিলেন। আমাদেরকে বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার এ লটারি প্রচলিত লটারির মতো নয়। আসলে তাঁর সব স্ত্রীরই অধিকার ছিলো সমান। কাউকেও অপর কারো ওপর অগ্রাধিকার দেওয়ার কোনো যুক্তি সংগত কারণ ছিলো না। এখন নবী করিম সাঃ নিজে যদি কাউকেও বাছাই করে নিতেন, তবে তাতে অন্যদের মনে কষ্ট হওয়ার আশংকা ছিলো। তাঁদের পরস্পরের মধ্যেও হিংসা জাগতে পারতো। এজন্যে তিনি লটারির মাধ্যমে এ ব্যাপারে ফয়সালা করতেন। শরীয়তে এসব ক্ষেত্রে লটারি প্রয়োগ করা বিধি সম্মত। কয়েকজন লোকের অধিকার যখন সমান, কাউকেও অন্য কারো ওপর অগ্রাধিকার দেওয়ার যখন কোনো যুক্তি সংগত কারণ থাকে না, অথচ সকলকেই সে অধিকার দেয়া যায় না, তখন লটারির সাহায্যে ফয়সালা করাই একমাত্র বৈধ উপায়।] 


 

মন্তব্য