| প্রচ্ছদ

আমাদের মা জননী-৯

ভেঙে যাওয়া হৃদয়ের কথাগুলো [১ম পর্ব]

জুবাইর হাসান মোহাম্মদ জুলফিকার আলী
পঠিত হয়েছে ৭৯ বার। প্রকাশ: ৩১ মে ২০১৯ ।

[গতকালের পর থেকে পড়তে হবে] 
হযরত আয়েশা রাঃ এর চরিত্রের ওপর অপবাদ দেয়ার ঘটনা (ইফ্ক-এর ঘটনা) দীর্ঘ একমাস ধরে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় মদিনার আকাশে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। এক চরম অস্থির অবস্থায় রাসূল সা:, তাঁর পরিবার ও তাঁর স্ত্রী হযরত আয়েশা রা: দিন কাটিয়েছেন। সীমাহীন উদ্বেগ-উৎকন্ঠায় দিন কাটিয়েছেন হযরত আয়েশা রা: এর পিতা তথা রাসূল সা: এর বন্ধু হযরত আবু বক্কর রা: ও তাঁর স্ত্রী উম্মে রূমান রা:। সেই সময়কালে নিদারুণ বেদনায় জীবন কাটিয়েছেন বদর যুদ্ধের জানবাজ সৈনিক, আল্লাহ ভীরু, রাসূল প্রিয় বিশিষ্ট সাহাবি হযরত সাফওয়ান ইবনে মোয়াত্তাল রা:। কেননা তাঁকে ঘিরেই হযরত আয়েশা রা: এর ওপর চারিত্রিক কালিমা লেপনের চেষ্টা করা হয়। সেই সাথে ব্যথিত হৃদয়ে দিন কাটিয়েছেন মদিনার তৎকালীন সাধারণ মুসলমানরাও। রটনার আকস্মিকতায়, অপপ্রচারের ভয়াবহতায় এরা সবাই হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন। তাঁদের কচি কোমল হৃদয়গুলো ভেঙে খান খান হয়ে গিয়েছিলো। তাঁদের সেই ভেঙ্গে যাওয়া হৃদয়ের কথাগুলো না বলে তো আর পারা যায় না। সেই সমস্ত মন ভাঙ্গানো মূর্ছনার সত্যিকারের গল্পগুলো না বললে তো বোঝা যাবে না, কেন আল্লাহ তায়ালা সূরা আন নূরে ১১নং আয়াত হতে প্রায় দুই রুকু জুড়ে এতগুলো আয়াত নাযিল করলেন। এসব ভগ্ন হৃদয়ের কথা না জানলে আল্লাহর ঐ সব আয়াতের মর্মকথাই বা আমরা বুঝবো কী করে ? আমরা এখন ইফ্ক-এর ঘটনায় ভেঙে যাওয়া সেসব হৃদয়ের কথাগুলোর বিবরণ তুলে ধরবো ।
প্রথমেই বলা যাক মোমেনকুলের মা হযরত আয়েশা রা:-এর ভেঙে যাওয়া হৃদয়ের কথা। সেই মিথ্যা বানোয়াট ও সম্পূর্ণ কাল্পনিক এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর জীবনে কী নিদারুণ এক দু:সহ জ্বালা টেনে আনা হয়েছিল। এ ঘটনার জেরে মাসাধিকাল ধরে মা আয়েশার বেদনা-বিধুর চেহারা যখন কেউ কল্পনা নেত্রে দেখতে থাকে তখন যেকোনো পাষাণ হৃদয়ও বিগলিত হয়ে হাহাকার করে ওঠে; প্রশ্ন জাগে কেন এমন হলো, কেন আল্লাহ সোবহানাহু তায়ালা তাঁর রাসূলকে নিয়ে এমন করুণ নাটকের অবতারণা করলেন যে, তাঁর এই প্রিয় স্ত্রীর কপালে এমন কলংক কালিমা অংকিত হলো! কেন এই ক্ষীনদেহী, আবেগময়ী, লাজুক অল্প বয়সী মেয়েটির ওপর এতো হৃদয়হীনভাবে এমন কদর্য কাদা ছোড়া হলো ? কী বীভৎস আনন্দে মেতে উঠলো মোনাফেক নরপশুর দল! কেন নিছক মিথ্যা কল্পনার ওপর ভর করে তারা ফুলের মতো নির্মল কোমল শতদলের ওপর এমন নিষ্ঠুর কষাঘাত হানলো ? 
কে এই নমনীয় কোমনীয়, নিষ্পাপ-নিরোপরাধ নাযুক রমনী, যার ওপর এমন কঠিন অশনিপাত হলো? হ্যাঁ, তিনি সেই মহীয়সী পবিত্র পরিচ্ছন্ন নারী যার পবিত্রতা ঘোষণায় আল কোরআনে আয়াত নাযিল হয়েছে। যার নির্দোষিতার কথা বলতে গিয়ে এবং নিষ্কলুষ অন্তরের কথা জানাতে গিয়ে এবং তাঁর চিন্তাধারার পরিচ্ছন্নতার সাক্ষ্য দিতে আল্লাহ তায়ালা নিজেই তাঁর কালাম নাযিল করেছেন। এমন সম্ভ্রমশীল মানুষের ইজ্জতের ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে হামলা করা হয়েছিলো, তাঁর সম্ভ্রমের ওপর কটাক্ষপাত করা হয়েছিল, অথচ মোনাফেক দল চিন্তা করেনি যে, তিনি কার মেয়ে, কার স্ত্রী, কার আমানত। হতভাগারা একটুও হিসাব করলো না যে, তিনি সিদ্দীকে আকবার হযরত আবু বক্কর রা:-এর স্নেহের ছায়ায় লালিত পালিত এক তনয়া, তিনি এমন এক পবিত্র পরিচ্ছন্ন মর্যাদাবান পরিবারের মেয়ে যার তুলনা বিরল। তিনি নবী সা: এর ঘরের বাতি হিসেবে যে আমানত রক্ষার দায়িত্ব পেয়েছিলেন সেটার ওপর হামলা করা হলো। তিনি নবী হাশেম কুল শিরোমনি মোহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ, শেষ নবী ও রাসূল সা: এর স্ত্রী। তাঁর গৌরব ও আত্মমর্যাদাবোধ কতো অধিক ছিলো তা দুনিয়ার সাধারণ কীটরা কী করে বুঝবে! তাঁর বিশ্বস্ততার ওপর এ হৃদয়হীন হামলা যারা করলো, তারা কি একটু হিসাব করলো না যে, বিশ্বের সেরা মানুষ, সর্বাধিক গুনান্বিত মানুষ, সব থেকে সুন্দর ও পবিত্র মানুষের হৃদয়ের রাণী, সরাসরি আল্লাহর ঈশারায় যার বিয়ে হয়েছিলো, তাঁর ওপর হামলা করা হয়েছে। আরো হামলা করা হয়েছে তাঁর ঈমানের ওপর। তিনি পরিপূর্ণ এক মুসলমান, পুরোপুরিভাবে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পনকারিণী, যার লালন পালন হয়েছিলো ইসলামের সূতিকাগৃহে, সেখানেই তাঁর জীবনের প্রথম চোখ খোলে, আর সর্বোপরি তিনি রাসূল সা: এর জীবন সংগিনী।
হ্যাঁ, এমন মহীয়সী নারী ওপর দুর্নামের তীক্ষ্ম তীর নিক্ষেপ করা হলো। তিনি পবিত্রতার তিলোত্তমা, তিনি সরল কিশোরী, কোনো ঝঞ্চাট-ঝামেলা তাঁকে কখনো জড়াতে পারেনি। তাঁর কোনো উচ্চাশাও ছিলো না। আল্লাহর কাছে চাওয়া পাওয়া ছাড়া তাঁর জীবনে আর কোনো স্বপ্নই ছিলো না। এতকিছু ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরেও তিনি অন্য কোনো বড় আশা না করে, শুধু অপেক্ষায় ছিলেন যে, অবশ্যই স্বপ্নের মধ্যে রাসূল সা: তাঁর পবিত্রতা সম্পর্কে এমন কিছু দেখবেন, যার দ্বারা তাঁর প্রতি যেসব কথা নিক্ষেপ করা হয়েছে সেটার থেকে তিনি মুক্তি পাবেন। কিন্তু এ সময়ে দীর্ঘ একমাস ব্যাপী ওহী আসা বন্ধ ছিলো এবং সেটা অবশ্যই ছিলো আল্লাহরই এক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ পরিকল্পনা। আল্লাহর নিজস্ব অভিপ্রায়েই মাসাধিকাল পর্যন্ত ওহী আসা বন্ধ ছিলো। এই ওহী না আসাটাও বিশেষ ভাবে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে তুলছিলো। 
মিস্তাহ ইবনে উসাসা এর আম্মার কাছে বদনাম রটানোর বিস্তারিত কাহিনী শোনাটা তাঁর বুকে যেন বজ্রাঘাতের মতো করে বিঁধল। একে তো পূর্ব থেকেই মাসাধিকাল ধরে অসুস্থ থাকায় দেহ মন তাঁর অবসন্ন,জ্বরের উত্তাপে শরীর পুড়ে যাচ্ছে, মাথার যন্ত্রণায় তিনি অস্থিরভাবে কাতরাচ্ছেন, তারপর এই দুঃসংবাদ এসে শেলের মতো বিঁধল তাঁর কুসুম কোমল হৃদয়ে। রোগাক্লিষ্ট দেহ নিয়ে, ব্যথা জর্জরিত হৃদয়ে, অবর্ণনীয় কাতর কণ্ঠে চরম বিস্ময়ভরে তিনি মাকে বলছেন, সোবহানাল্লাহ! মানুষ সত্যিই কি এসব কথা বলাবলি করছে? হযরত আয়েশা রা: আশ্চার্যান্বিত হয়েছেন কারণ যারা এসব কথা বলাবলি করছে তারা কি সেইসব মানুষ নয়, যারা রাসূল সা:-এর জন্যে জীবন দিতে প্রস্তুত! (অপর এক বর্ণনা মতে,) তিনি বলে উঠলেন, আমার আব্বা কি এসব কথা জানতে পেরেছেন? (হযরত আয়েশা রা: মনে মনে ভাবছেন, ‘আহা! আমার আব্বা নিজেকে কত বড় ভাগ্যবান ভাবেন, আল্লাহর রাসূল সা:-কে জামাই বানাতে পেরে। নিজের কলিজার টুকরা, আদরের দুলালি এই মেয়েটাকে তাঁর হাতে তুলে দিতে পেরে কত গৌরবান্বিত তিনি। তিনি কিভাবে সহ্য করবেন এই দু:সহ জ্বালা?) তখন তাঁর মা উত্তর দিচ্ছেন, হ্যাঁ, মা।” তারপর মা আয়েশা রা: আবার জিজ্ঞাসা করছেন, “আর রাসূল সা:ও কি এসব কথা জানতে পেরেছেন? (আল্লাহর রাসুল সাঃ, তিনি তো তাঁর শুধু স্বামী নন, তিনি সমস্ত জাহানের মালিক আল্লাহর পরম প্রিয় রাসূল, সারা দুনিয়ার মধ্যে শ্রেষ্ঠ মানুষ- কত গভীরভাবে রাসূল সা: তাঁকে ভালোবাসেন! হায়, তিনি রাসূল সা: জেনে থাকলে তাঁর হৃদয়ে কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে!)।  আয়েশা রা:-এর এ প্রশ্নের জবাবেও অসহায়ভাবে তাঁর মা বললেন, “হ্যাঁ, হায় আল্লাহ! কী দুঃখ নেমে এলো তাঁর ভাগ্যে, কী দুঃখ-যাতনা নেমে এলো আল্লাহর রাসূলের জীবনে।”
এমন পরিস্থিতিতে হযরত আয়েশা রা: কী যে পেরেশানির মধ্যে পড়েছিলেন তা সহজেই অনুমেয়। তিনি নিজে তো তাঁর নিরোপরাধ হওয়ার ব্যাপারে সম্যকভাবে অবগত, কিন্তু এটা প্রমাণ করবার ক্ষমতাই তাঁর নেই। এ জন্যে তিনি অপবাদের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে দুঃসহ যন্ত্রণায় সকাল সন্ধ্যা কাটাচ্ছেন। আর ভাবছেন, হায়! সেই মহান হৃদয়বান ব্যক্তি হযরত মোহাম্মদ সা:, যিনি তাঁকে কত ভালোবাসেন, তাঁর কাছেও কি আজ এক অপবাদগ্রস্ত মানুষ বলে বিবেচিত হচ্ছেন? এমনই কঠিন সংকটাপূর্ণ মুহুর্তে তিনি দুঃখের সাগরে ভাসতে থাকলেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা তাঁর পবিত্রতার ব্যাপারে আয়াত নাযিল করলেন।

[পরবর্তী অংশ আগামীকাল]
 

মন্তব্য