| প্রচ্ছদ

আমাদের মা জননী-১০

ভেঙে যাওয়া হৃদয়ের কথাগুলো [২য় পর্ব]

জুবাইর হাসান মোহাম্মদ জুলফিকার আলী
পঠিত হয়েছে ১০৩ বার। প্রকাশ: ০১ জুন ২০১৯ ।

[গতকালের পর থেকে পড়তে হবে] 
এবার আমরা তিনটি ভেঙে যাওয়া হৃদয়ের কথা বলবো। প্রথমেই চলুন পেছনে ফিরে দেখি সেই মহান ব্যক্তি হযরত আবু বকর সিদ্দিক রা: এর অবস্থা। তাঁর ব্যক্তিত্ব, তাঁর সামাজিক মর্যাদা, তাঁর ব্যক্তিগত দৃষ্টান্তমূলক পরহেযগারী- এসব সম্পূর্ণরূপে অসাধারণ। এমন নজরকাড়া ব্যক্তিও ব্যথার দংশনে জর্জরিত। তাঁর মান-সম্ভ্রমের ওপর এ যে এক প্রচণ্ড আঘাত। মোহাম্মদ সা:-এর স্ত্রী তথা তাঁর কন্যার ওপর এই রটনা। মোহাম্মদ সা: শুধু কি তাঁর জামাই? তিনি তো তাঁর পরম প্রিয় বন্ধুও। মোহাম্মদ সা: তাঁকে কত ভালোবাসেন, তিনিও হৃদয়মন দিয়ে সে মহামানবকে ভালোবাসেন। নিজ কন্যার ওপর অপবাদের ঘটনাটি যে তাঁর এ পবিত্র ভালোবাসার ওপর অশনিপাত। তিনি তো শুধু তাঁর পরম প্রিয় বন্ধুই নন, তিনি যে আল্লাহর সেই মহান নবী, যাকে তিনি সর্বান্তকরণে বিশ্বাস করেছেন, যাকে তাঁর হৃদয়ের সকল আবেগ দিয়ে সত্য বলে জেনেছেন, যার জন্যে তিনি বাইরের কোনো প্রমাণের অপেক্ষা করেননি। সর্বপ্রথমেই ঈমানের দাওয়াত গ্রহণ করেছেন। সর্বপ্রথমেই মিরাজের ঘটনা বিশ্বাস করেছেন। হায়! সেই হযরত আবু বকর রা: এর কথাতেও তাঁর মর্মব্যথা কী নিদারুণভাবে পরিস্ফুট। এই প্রচণ্ড ব্যথার দুঃসহ জ্বালায় কত ধৈর্য্যশীল তিনি। কত কঠিনভাবে তিনি আত্ম সমালোচনায় ব্রতী। এমনই কঠিন মানসিক পেরেশানির মধ্যে তিনি স্বগতোক্তি করছেন, বলছেন- “হায়! আল্লাহর কসম জাহেলিয়াতের আমলেও তো কেউ এমন বদনাম দিতে পারেনি। আজ ইসলাম গ্রহণ করার পর নিছক কল্পনা করে আমার পরিবারের ওপর এমন দুর্নাম রটানো হলো।” এতো এমন এক কথা যা অনবরত যেন মাথার ওপর আঘাতের পর আঘাত হেনে চলেছে। এমনই এক কঠিক সময় তাঁর কলিজার টুকরা অসুস্থ রুগ্ন মেয়েটি, মর্ম জ্বালায় দিবানিশি যার ঘুম হারাম হয়ে গেছে, সেই মেয়েটি তাঁকে তার পক্ষ হয়ে রাসূল সা: এর কথার উত্তর দিতে বলছে। কিন্তু রাসূ: সা: কে তিনি কী বলবেন? হৃদয় তাঁর শুকিয়ে গেছে, ভাষা তার গতিপথ হারিয়ে ফেলেছে, বুদ্ধি তাঁর কাজ করছে না। ডুকরে কেঁদে উঠে তিনি শ্রান্তক্লান্তভাবে বারবার বলছেন, আল্লাহর কসম! আমি জানি না যে, রাসূল সা: কে আমি কী বলবো।
এবার বলা যাক সিদ্দীকে আকবার হযরত আবু বকর রা:-এর স্ত্রী উম্মে রূমানের অবস্থা। তিনি তো হযরত আয়েশা রা: এর মাতা। তাঁর হৃদয় ভাংগার কাহিনীও যে নিদারুণ করুণ। তিনি এই দুঃখ জর্জরিত অসুস্থ কন্যার সামনে সবকিছু ব্যাপারেই বাহ্যিক দৃঢ়তা দেখাচ্ছিলেন সত্য, কিন্তু যখন তাঁর মনে হচ্ছিলো, মেয়েটা যেভাবে অনবরত রাতদিন কেঁদে চলেছে তাতে সে যেকোনো সময় তার কলিজা ফেটে যাবে। এমনই এক নাজুক মুহূর্তে তিনি তাঁর মেয়ে আয়েশা রা: কে  সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন, “মা! আমার ওপর একটু দয়া করো। ব্যাপারটাকে এভাবে একটু সহজ করে দেখো, ‘আল্লাহর কসম! পৃথিবীর এমন দৃষ্টান্ত বহু আছে, যখনই কোনো নারী স্বামীর কাছে বিশেষভাবে আদর মহব্বত পেয়েছে এবং তোমার মতো এমন সৌভাগ্যবতী হয়েছে, উপরন্তু তাদের কয়েকজন সতীন থেকেছে, সে অবস্থাটা তাদের পক্ষে সহ্য করা মুশকিল হয়ে গেছে; তারা অবশ্যই কিছু বাড়াবাড়ি করে বসেছে।” কিন্তু এই দৃঢ়তা এবং ধৈর্য্য তিনি সেই মুহূর্তে আর ধরে রাখতে পারলেন না যখন মেয়ে আয়েশা বললেন, “মা! আমার পক্ষ থেকে আপনিই রাসূল সা: এর কথার জবাব দিন না।” তখন তিনি কাতর কণ্ঠে বললেন সেই একই কথা যা তাঁর স্বামী একটু আগে বলেছিলেন। অর্থাৎ আয়েশা রা:-এর মাতা রূমানও বললেন, “আল্লাহর কসম! রাসূল সাঃ কে আমি কী যে বলবো তা তো বুঝতে পারছি না।” 
আরো একজন ব্যক্তির ভেঙ্গে যাওয়া হৃদয়ের কথা কম বেদনার নয়। তিনিও আঘাত পেয়েছেন, বেদনাহত হয়েছেন। তাঁর ভেঙ্গে যাওয়া হৃদয়ের কথাও বড়ই যন্ত্রণাময়। সেই ব্যক্তি হলেন হযরত সাফওয়ান ইবনে মোয়াত্তাল রা:, যিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বিশিষ্ট সাহাবি, আল্লাহ ভীরু ব্যক্তি, রাসূল সা: এর প্রিয় এবং সর্বোপরি সৎ চরিত্রের অধিকারী। হায়! এমন ব্যক্তিকেই বেছে নেয়া হয়েছে আয়েশা রা: এর চরিত্রে কালিমা লেপনের জন্য। তাঁকে দোষ দেয়া হয়েছে তাঁর নবীর স্ত্রীর আমানতের খেয়ানত করার। হযরত সাফওয়ান ইবনে মোয়াত্তাল রা: ইসলাম গ্রহণের পর, রাব্বুল আলামীনের কাছে নিজেকে যখন পরিপূর্ণভাবে সোপর্দ করে দিয়েছেন, তারপর তাঁকে অপবাদ দেয়া হচ্ছে, তাঁর আমানতদারীর ওপর আঘাত আনা হচ্ছে, তাঁর মর্যাদা, তাঁর আভিজাত্যবোধ এবং যেসব মহৎ গুণের কারণে একজন সাহাবিকে সম্মানিত করা হয়- সেসব কিছুর ওপর চরমভাবে আঘাত হানা হচ্ছে। অথচ এসব কিছুর উর্দ্ধে ছিলো তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তাঁকে জড়িয়ে এই যে মারাত্মক অপবাদ রটানো হয়েছিল, সে কথা হঠাৎ করে তিনি জানতে পারলেন, অথচ তিনি এমনই আল্লাহভীরু নির্মল চরিত্রের অধিকারী ছিলেন যে, তাঁর কল্পনাতেও এমন মারাত্মক কথা কখনো স্থান পায়নি। আমরা যদি একটু চিন্তা করে দেখি, যে পরিস্থিতিতে তিনি তাঁর উটটি বসিয়ে আয়েশা রা: কে সেটার ওপর বসালেন এবং নিজে দড়ি ধরে এগিয়ে গিয়ে মূল কাফেলার সাথে দিনে দুপুরে মিলিত হলেন, সে অবস্থায় তিনি এর বাইরে আর কী করতে পারতেন? তাছাড়া যে ইসলামী দলটা আল্লাহ ভীতির ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল, আল্লাহর ভয়ে নিয়ন্ত্রিত হতো যাদের গোটা জীবন, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যে জীবন উৎসর্গ করার ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যারা নবী সা: এর নিরাপত্তার জন্যে নিজেদের বুককে ঢাল বানিয়ে দিয়েছেন, সেই মহা পুণ্যবান মানুষদের সম্পর্কে এমন জঘন্য চিন্তা করতে পারে একমাত্র তারা- যাদের অন্তর চরমভাবে ব্যধিগ্রস্থ! এ অপবাদের কথা কানে আসার সাথে সাথে হযরত সাফওয়ান রা: এর মুখ দিয়ে উচ্চারিত হলো, “সোবহানাল্লাহ! “কোনো মেয়ের গায়ের কাপড় আমি কোনো দিন সরাইনি।” এ সময় যখন তিনি জানতে পারলেন যে, তাঁর সম্পর্কে হাসসান ইবনে সাবেত অপবাদ ছড়িয়ে কবিতা লিখেছে, তখন তিনি নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছিলেন না। তিনি তরবারি দিয়ে তার গর্দান উড়িয়ে দেয়ার জন্যে এগিয়ে গিয়েছিলেন। এমন সময় তাঁর মনে পড়লো, একজন মুসলমানকে তরবারি দিয়ে আঘাত করা নিষিদ্ধ। এই চিন্তা তাঁকে থামিয়ে দিল বটে, কিন্তু অপমানের বেদনা তিনি সহ্য করতে পারছিলেন না, তাঁর ধৈর্য্যরে বাধ ভেঙ্গে যাচ্ছিলো।

[পরবর্তী অংশ আগামীকাল]
 

মন্তব্য