| প্রচ্ছদ

ছোট গল্প

প্রেম এমনও হয় !

মহল আরা
পঠিত হয়েছে ৯৯ বার। প্রকাশ: ১৩ জুন ২০১৯ ।

সজিব শহরের মেসে থেকে অনার্স পড়ছিল। গ্রীষ্মের ছুটিতে মায়ের সাথে সময় কাটাতে বাড়ির পথে রওনা হল সে। সামনে একটা লোকাল বাস পেয়ে সেটাতেই উঠে পড়ল। বাস ছাড়বার মুহূর্তে একজন মহিলা তড়িঘড়ি করে বাসে উঠল। ওর এক হাতে ব্যাগ  অন্য হাতে ফুটফুটে এক মেয়ে শিশু। খালি সিট পাওয়ার জন্য সে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল। 
- আসুন আমার সিটে বসুন।
-না না, আপনি থাকুন
-বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন কিভাবে। আসুন, বসুন।
-ধন্যবাদ।
- ঠিক আছে।
-আপনার মেয়েটি খুব কিউট।
-বাবার মত।
-কোথায় যাবেন?
-শ্বশুর বাড়ি।
-পরের স্টপেজে বাস থামতেই ও উঠে দাঁড়াল।
-আমি নামব।
-ও আচছা,আসুন। ব্যাগটা আমি নামিয়ে দিচ্ছি।
-ধন্যবাদ। ভাল থাকুন।
কুসুমের সাথে সজিবের সেই প্রথম দেখা, কিন্তু পরিচয় হয়নি। পরিচয় হয়েছিল বছর খানেক পর, একটা রেস্টুরেন্টে আকস্মিক ভাবে দেখা। সজিব ওকে অনুরোধ করল চা খেতে। এক সাথে বসে চা খেতে খেতে ওর স্বামীর কথা জানতে চাইল সে। হঠাৎ ওর সুন্দর মুখ খানি বিঃস্বাদে ছেয়ে গেল। একটা দীর্ঘস্বাস  বেড়িয়ে এলো ওর বুক চিরে।
-ও নেই! 
-নেই মানে! বিষ্ময়ের সাথে প্রশ্ন করল সজিব।
- দু'বছর আগে ও আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।
- কোথায়?
-পরলোকে।
-দুঃখিত,আপনাকে কষ্ট দিলাম।
-কষ্টের সাগরেইতো ভাসছি।নতুন করে কষ্ট পাবার কি আছে।
এরপর আরও কিছুক্ষণ কথা হল ওর সাথে। ওর স্বামী নোমান ছিল জাহাজের নেভিগেটর। অল্প বয়সে বিয়ে হয় কুসুমেব। সে তখন কেবল দশম শ্রেণীর ছাত্রী। দেখতে সুন্দর ছিল বলে নোমান ওকে পছন্দ করেছিল। কুসুমের বাবাও এমন 
পাত্র পেয়ে খুশী ছিলেন। অনেক ধুমধামে বিয়ে হল কুসুমের। এরপর সংসার, সংসারে এলো আদরের সন্তান শ্রেয়া। অনেক সুখী ছিল ওরা।
কিন্তুু হঠাৎ করেই ওর জীবনে নেমে এলো নিকষ কালো অন্ধকার। খবর এলো নোমান আর নেই। নোমানের জাহাজ সোমালিয়া জলদস্যদের কবলে পরে । 
ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে  জলদস্যুরা তাকে সাগরে নিক্ষেপ করে। এরপর আর তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। ভীষণ আঘাত পেয়েছিল কুসুম।
-সজিব সাহেব।
- বলুন। 
-আপনি অন্যমনষ্ক হয়ে পড়েছেন।
-আপনার কথা ভাবছিলাম। 
-কি ভাবছিলেন?
-এত অল্প বয়সে নিঃসঙ্গ জীবন।
-এটাতো আল্লাহর  ইচ্ছতেই হয়েছে, কিছু করবার নেই।
-কিন্তু ভাবলে কষ্ট হয়। আপনিতো লেখাপড়া
-করতে পারেননি?
-না।
-আবার শুরু করুন না।
-সব টুকু সময় শ্রেয়াকে দিতে চাই। নোমানের জাহাজ কোম্পানী থেকে  যে অর্থ পেয়েছি তাতে দু'টো জীবন চলে যাবে।
-বয়, আরও দু'কাপ চা দাও।
-আমি কিন্তু আর চা খাব না।
 -ঠিক আছে।
আজ শ্রেয়ার জন্মদিন। ছোট্ট একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। আপনি এলে খুশি হব।
-অবশ্যই যাব।
-সন্ধার পরই চলে আসবেন।
-আসব। শ্রেয়া, মা মনি জন্ম দিনে কি নেবে তুমি? 
-কিছু আনবেন না। ওকে দোওয়া করবেন।
-জন্মদিন উপলক্ষে মা মনিকেতো কিছু দিতেই হবে।
- চলুন, ওঠা যাক।
-চলুন।
সন্ধায় সজিব  এলো কুসুমদের বাসায়। জন্মদিন উপলক্ষে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে বাসাটা। কুসুম ওকে ড্রইং রুমে বসতে বলে ভেতরে চলে গেল।   
ড্রইং রুমের দেয়ালে টাঙ্গানো ছবিগুলোর দিকে চোখ রাখল সজিব। স্বামীর সাথে অনিতার বিয়ের ছবি। বাবা মা''র সাথে শ্রেয়ার ছবি। সমুদ্র সৈকতে কুসুম আর ওর স্বামীর হাস্যজ্বল দৃশ্য।
স্বামীর সাথে কুসুম কত সুখী আর প্রাণবন্ত  মনে হচ্ছে।
- সজিব সাহেব, আসুন, ভেতরে আসুন, এইযে এখানে।
-আসছি। 
হাতেগোনা মাত্র ক'জন অতিথী। বাচ্চারা টেবিল ঘিরে দাঁড়িয়েছে।  ছোট্টো শ্রেয়া কেক কেটে একটা  টুকরো মায়ের মুখে পুরে দিল। কুসুমের  চোখের কোণ ভিজে উঠল। হয়তো এই আনন্দ ঘন দিনে স্বামীর কথা মনে পড়ছে।
অনুষ্ঠান শেষে অতিথীরা চলে গেল। সজিব বসেই ছিল। আজ কুসুমের জন্য মনের ভেতর কষ্ট অনুভব করল।  শ্রেয়াকে  আদর করে বিদায় নিল সে। 
মেসে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ল সজিব। বারবার মনে পড়ছিল কুসুমের কথা। এত অল্প বয়সে বিধবা হয়েছে। সামনে সারাটা জীবন পরে রয়েছে। মেয়ে শ্রেয়াকে নিয়ে বেচেঁ থাকবার স্বপ্ন দেখছে।
কসুমের সাথে একটা হৃদতা গড়ে উঠেছিল সজিবের। শ্রেয়াকে নিয়ে মাঝে মাঝে  এখানে ওখানে ঘুরতে বের হতো ওরা। কখনও রমনার সবুজ ঘাসে বসে কথা বলতো। স্বামীর স্মৃতিচারণ করতো কুসুম। কখনও ব্যাগে রাখা ছোট এ্যলবামটি ধরতো সজিবের সামনে।
-তুমি স্বামীকে খুব ভালবাসতে না?
-হ্যা, খুব।
-আর তিনি?
- ও আমায় ভীষণ ভালবাসত। কিন্তু ও হঠাৎ কোথায় হাঁরিয়ে গেল।
কসুমের দু'চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সেই প্রথম সজিবের হৃদয়ে কুসুমের জন্য ভালবাসা জন্ম নিল।  কুসুমকে সে অকুন্ঠ ভালবাসায় ভরিয়ে দিতে পারে। দূর করে দিতে পারে ওর সব কষ্ট। কিন্তু সজিব ওকে কিছুই বলতে পারলো না।
 ক'মাস পরের কথা। সজিব ভাল একটা চাকরি পেল। খুশীর খবরটা সে কুসুমকে জানাল। খুব খুশি হল কুসুম। বিকেলে একটা চাইনিজে এলো ওরা।
-সজিব, আজকের এই সুভ বিকেলে চাইনিজে আমি হোষ্ট, তুমি গেস্ট। 
-না, আজ আমি তোমাকে খাওয়াবো। কারণ চাকরিটা আমি পেয়েছি।
হেসে উঠল কুসুম। ওর এই প্রাণবন্ত হাসি আগে কখনও দেখিনি সজিব। অপলক  দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম ওর দিকে। হাসি থামিয়ে ও বলল, ঠিক আছে বাবা তুমি খাওয়াবে।
আজ  কসুম ওর হৃদয় মাঝারে ভালবাসার এক স্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে ওকে জীবন সঙ্গী করে কাছে পেতে চায়, আদর সোহাগে ভরিয়ে দিতে চায়। 
কিন্তু সজিবের মনের এই ব্যাকুলতা আর ইচ্ছার কথা আজও বলা হয়নি ওকে। সজিব সিদ্ধান্ত নেয় ওর ভালবাসার কথা অকপটে বলবে ওর ভালবাসার মানুষটিকে। 'কুসুম, তোমাকে আমি ভালবাসি, ভীষণ ভালবাসি। তুমি হ্যাঁ বললেই আমরা বিয়ে করে নেব। দেখ তোমাকে আমি সুখী দেখতে চাই। তুমি হবে আমার হৃদয়ের রাণী। আমার হৃদয় ভুবনে তুমি থাকবে চিরসাথী হয়ে। আমি জানি তুমি না বলতে পারবে না। শ্রেয়ার কথা ভেবনা।ওকে  পিতৃস্নেহ আর মমতা দিয়ে আগলে রাখব। বিয়ের পর আমরা দূরে  কোথাও বেড়াতে যাব।’
কিন্তু হঠাৎ করেই একটা বাস্তব সত্যের মুখোমুখি হল সে। এমন একটা খবর শুনে আনন্দিত হতে পারল না সজিব। বরং সে আহত হল। ওর লালিত সব অনুভূতি, সব ভালবাসা বিরাটকায় এক পাথরের আঘাতে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে পড়ল।
কুসুমের ফোন এলো।
- সজিব, আমার স্বামী বেঁচে আছে। ও ফিরে এসেছে।
নির্বাক সজিব। কিছুই বলতে পারলো না। নিজকে সামলে নেবার চেষ্টা করল। মোবাইলের পাতায় শুধু একটি কথা লিখে দিল-সুখে থেকো। 
    

মন্তব্য