| প্রচ্ছদ

আমাদের মা জননী-১৩

মোনাফেকরা মুসলমান ঘরের মধ্যেই তাদের সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি করে

জুবাইর হাসান মোহাম্মদ জুলফিকার আলী
পঠিত হয়েছে ৭৪ বার। প্রকাশ: ১৩ জুন ২০১৯ ।

[গতকালের পর থেকে পড়তে হবে] 
হযরত আয়েশা রা: এর ওপর চারিত্রিক অপবাদ দেয়ার প্রতিবাদে আল্লাহ তায়ালা আল কোরআনের (সূরা আন নূর- এর ১১-২০ নং পর্যন্ত দশটি) আয়াত নাযিল করার মাধ্যমে মানুষকে যেসব শিক্ষা দীক্ষা দিয়েছেন আমরা এখন সেসব নিয়ে কয়েকটি পর্বে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করবো। আমাদের আজকের প্রসঙ্গ- মোনাফেকরা মুসলমান ঘরের মধ্যেই তাদের সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি করে।
মোনাফেকদের দ্বারা হযরত আয়েশা রা:-এর ওপর চারিত্রিক অপবাদ রটনার বিরুদ্ধে আল্লাহ তায়ালা কোরআনের আয়াত নাযিল করে সত্য প্রকাশ করে দিলেন। সেই সত্য প্রকাশের সময় আল্লাহ তায়ালা সর্বপ্রথমেই অপবাদ রটনাকারীদের পরিচয় তুলে ধরলেন। মহান আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ
“যারা (নবী পরিবার সম্পর্কে) মিথ্যা অপবাদ নিয়ে এসেছে, তারা (ছিলো) তোমাদেরই একটি (ক্ষুদ্র) দল; ------------- । -সূরা নূর:১১।”
আল্লাহ তায়ালার ওপরের কথা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, মিথ্যা অপবাদ রটনাকারীরা শুধুমাত্র কোনো একজন ব্যক্তি বা কয়েকজন বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত ব্যক্তির সংখ্যার সমষ্টি নয়; বরং তারা হচ্ছে এক বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সংগঠিত একটি দল। এতে জড়িত শুধু এক আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই নয়, তার পতাকাতলে সমবেত হয়েছিলো আরো কিছু সংখ্যক মানুষ।
আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ছিলো এই কুচক্রী দলের প্রধান। তারই নেতৃত্বে সদ্য গড়ে ওঠা গোটা মুসলিম সংগঠন ও জনশক্তিকে ভেঙে চুরমার করে দেয়ার জন্য ষড়যন্ত্র হয়েছিলো। সেই মোনাফেক নেতাই পারস্পরিক অবিশ্বাস সৃষ্টি করার মাধ্যমে রাসূল সা: এর দ্বারা নবগঠিত ও সুসংহত মুসলিম দলটির মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। সে পরস্পরের মধ্যে হিংসা বিদ্বেষ ও ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি করে এবং একের বিরুদ্ধে অপরকে লেলিয়ে দিয়ে গোটা মুসলিম জাতিকে বিপর্যন্ত করতে চেয়েছিলো। মোনাফেক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের প্ররোচণায় তৈরি হওয়া ঐ কুচক্রী দলটি প্রকাশ্য যুদ্ধে মুসলমানদেরকে হারাতে না পেরে গোপনে এক মাসের মধ্যে অপবাদের এই মহা পরিকল্পনা তৈরি করে ফেলেছিল। পর্দার আড়ালে থেকে তারা কয়েকজন নিষ্ঠাবান মুসলমানকেও কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছিলো। মোনাফেকরা মুসলমান সমাজেই বাস করতো। তারা এত অন্তরঙ্গ অভিনয় পূর্বক আচরণ করতো যে, না জানি কতই না পেয়ারা বন্ধু! তাই এমন কৌশলগত আচরণের কাছে বিভ্রান্ত হয়ে পড়া বিচিত্র কিছু নয়।
হযরত আয়েশা রা: এর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটনার ঘটনাটি ছিলো ইসলামকে ধ্বংস করার নানান চক্রান্তসমূহের মধ্যে এক বিরাট ধ্বংসাত্মক ষড়যন্ত্র। এ ঘটনায় যে আবহ তৈরি করা হয়েছিল তাতে করে তারা ইসলামের মূল কেন্দ্র স্বয়ং নবী সা: এর ঘরেই আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। যে মহা মানবের পরিচালনায় বিশ্বব্যাপী ইসলামের চূড়ান্ত অভিযান পরিচালিত হচ্ছিলো সেই মহানায়ককে, মহা বিপ্লবী বীরকে হতবল করার উদ্দেশ্যে তাঁর হৃদয়কে ভেঙে চুরমার করে দিতে চেয়েছিলো তারা! রাসূল সা: এর কাছের মানুষদেরও তারা কাজে লাগানোর জন্যে মাঠে নামিয়েছিলো। বস্তুত মোনাফেকদের কৌশলটাই এমন যে তারা মুসলমানদের ঘরের মধ্যেই তাদের সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি করে। রাসুল সা: এর একান্ত ঘরের মানুষ ছিলেন হামনা বিনতে জাহাশ (যিনি রাসূল সা: এর স্ত্রী হযরত যয়নব রা: এর বোন), রাসুল সা: এর গুনমুগ্ধ ও বিশ্বস্ত কবি ছিলেন হাসসান বিন সাবেত, তাঁর নিজ গোষ্ঠীর মানুষ ছিলেন বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মোহাজের মিস্তাহ ইবনে উসাসা-এই তিনজন নিষ্ঠাবান সরলমনা মুসলমানদেরকেও ঐ মোনাফেক নেতা ঘৃন্য ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িয়ে ফেলেছিলা। যার ফলে এই তিনজন মুসলমানও রটনা সম্পর্কে কিছু দায়িত্ব জ্ঞানহীন মন্তব্য করে বসেছিলেন। [স্মরণ রাখা আবশ্যক যে এই তিনজন মুসলমান, ইসলামী আইন অনুযায়ী দুর্নাম রটানোর জন্যে চরম শাস্তি ভোগ করেছিলেন। তবে তারা তাওবা করার কারণে আল্লাহ তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় সে ব্যাপারেও সতর্ক করে দিয়েছেন। হযরত আয়েশা রা: এবং হযরত আবু বকর রা: এই দুজনেই তাদেরকে ক্ষমা করেছিলেন। যার ফলে আয়েশা রা: পরবর্তী কোনো সময়েই তাঁদের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করেননি। এ সংক্রান্ত আলোচনা পরবর্তী অধ্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে।]
যাহোক, মূল ষড়যন্ত্রের হোতা কিন্তু মদিনার মোনাফেক সরদার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই নিজেই। তার নেতৃত্বেই পরিচালিত হচ্ছিলো ঐ সংঘবদ্ধ কুচক্রী দল। তবে মূল নেতা ঐ আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই প্রকাশ্য দৃশ্যে না এসে, পর্দার আড়ালে থেকে এমন নিপুণভাবে তার হৃতরাজ্য হারানোর প্রতিশোধ নিতে চাইছিলো যে তাকে কিছুতেই ধরা যাচ্ছিলো না। প্রকাশ্যে এমন কোনো কথা তার মুখ দিয়ে বেরোয়নি যার দ্বারা তার দোষ প্রমাণিত হতে পারে এবং তাকে পাকড়াও করা যায়। এই ভয়ংকর মোনাফেক সরদার তার একান্ত বিশ্বস্ত বন্ধু, পরিবার-পরিজন ও পারিষদের সাথে গোপন পরামর্শের মাধ্যমে তার ইপ্সিত চক্রান্তের জাল বিছিয়ে দিয়েছিলো। সেই কুচক্রী দলের ওপর তার পুরো আস্থা ছিল এবং সে নিশ্চিত ছিলো যে, দলের মধ্যে থেকে কেউ তার মুখোশ খুলে দিবে না, তার বিরুদ্ধে যাবে না অথবা তার বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষ্যও দিবে না। এতো দক্ষতা ও কূট কৌশলের মাধ্যমে এই মহা মোনাফেক তার পরিকল্পনা তৈরি করেছিলো যে, পূর্ণ একমাস ধরে গোটা মদিনা ব্যথা, বেদনা ও মর্মজ্বালায় প্রকম্পিত হচ্ছিলো। এতোদিন ধরে এমন অবস্থা চলার কারণ হলো, এই রটনার মাধ্যমে বড়ই মুখোরোচক এক কাহিনী মানুষের মুখে তুলে দেয়া গেছে, যার ফলে সাধারণভাবেই এর চর্চা অব্যাহত থেকেছে। এই কূটকৌশলটাকে মোনাফেকরা তাদের অর্জন হিসাবে দেখতে চেয়েছিলো। তারা ভেবে বসেছিলো, এই কূটকৌশলটা হলো সবচেয়ে পবিত্রতম এবং সব থেকে আল্লাহ ভীরু ঘরের পরিবেশকে বিষিয়ে তোলার এক মোক্ষম হাতিয়ার।” এতদিন ধরে হিংসার আগুনে জ্বলে পুড়ে মরতে থাকা কুচক্রী মোনাফেক দল ভাবলো, এ যেন এক মহা বিজয়!
আর এজন্যেই আল্লাহ তায়ালা আয়াত নাযিল করলেন যাতে করে সেই মহা ষড়যন্ত্রের রহস্য জাল ছিন্ন করা যায় এবং মানুষকে জানানো যায় যে, এর মূল শেকড় কোথায়, কত গভীরে তা লুকিয়ে আছে। আর যাতে এটাও প্রকাশ করা যায় যে, সেই সংঘবদ্ধ কুচক্রী দল ইসলাম ও মুসলমানদের সর্বনাশ সাধনে কি রকমের বদ্ধ পরিকর এবং তারা কত সুক্ষ্ম ও সুগভীর সন্তর্পনে এগিয়ে চলছিলো।

[পরবর্তী অংশ আগামীকাল]  

মন্তব্য