| প্রচ্ছদ

আমাদের মা জননী-১৪

অপবাদ-ঘটনা মা-বোনদের জন্যে কল্যাণকরই হয়েছে

জুবাইর হাসান মোহাম্মদ জুলফিকার আলী
পঠিত হয়েছে ৫৯ বার। প্রকাশ: ১৯ জুন ২০১৯ ।

[আগের লেখার পর থেকে পড়তে হবে] 
হযরত আয়েশা রা: এর ওপর চারিত্রিক অপবাদ দেয়ার প্রতিবাদে আল্লাহ তায়ালা আল কোরআনের (সূরা আন নূর- এর ১১-২০ নং পর্যন্ত দশটি) আয়াত নাযিল করার মাধ্যমে মানুষকে যেসব শিক্ষা দীক্ষা দিয়েছেন আমরা সেসব নিয়ে আলোচনা করছি। এবারের প্রসঙ্গ- অপবাদ-ঘটনা মা-বোনদের জন্যে কল্যাণকরই হয়েছে।
আল্লাহ বলেছেন-
“যারা (নবী পরিবার সম্পর্কে) মিথ্যা অপবাদ নিয়ে এসেছে, তারা (ছিলো) তোমাদেরই একটি (ক্ষুদ্র) দল; এ (বিষয়টি)-কে তোমরা তোমাদের জন্যে খারাপ ভেবো না; বরং (তা) তোমাদের জন্য (একান্ত) কল্যাণকর, ------। -সূরা আন নূরঃ ১১।”
মদিনার মুসলমানরা সেই সময় নৈতিকতা ও চারিত্রিক পবিত্রতার দিক দিয়ে ছিলো অগ্রগণ্য এবং এর দরুণই তাঁরা প্রতিদ্বন্দ্বিদের ওপর প্রাধান্য লাভ করেছিলো। এ কারণে মোনাফেকরা লক্ষ নির্ধারণ করলো যে, মুসলমানদেরকে এই চারিত্রিক পবিত্রতার দিকেই আঘাত করতে হবে। মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্বের আসল জায়গাই হলো অতি উচ্চমানের নৈতিকতা ও চারিত্রিক পবিত্রতা। মোনাফেকরা মনে করলো যদি এই জায়গায় মুসলমানদেরকে ঘায়েল করা যায় তবেই তারা সমূলে উৎপাটিত হবে। তাই মদিনার মোনাফেকরা এমন উদ্দেশ্য পূরণের জন্যেই হযরত আয়েশা রা: এর চরিত্রের ওপর কালিমা লেপনের অপচেষ্টা করলো। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা অভিপ্রায় তো কেউ ব্যর্থ করে দিতে পারে না। তাই আল্লাহ তায়ালা এই অপবাদ দেয়ার ঘটনাটিকে মুসলমানদের জন্যে কল্যাণেরই বিষয়বস্তু বানিয়ে দিলেন। আল্লাহ বলছেন:
“যারা (নবী পরিবার সম্পর্কে) মিথ্যা অপবাদ নিয়ে এসেছে, তারা (ছিলো) তোমাদেরই একটি (ক্ষুদ্র) দল; এ (বিষয়টি)-কে তোমরা তোমাদের জন্যে খারাপ ভেবো না; বরং (তা) তোমাদের জন্য (একান্ত) কল্যাণকর, ------। -সূরা আন নূরঃ ১১।”
এখন আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, কিভাবে এই ঘটনা মুসলমানদের জন্যে কল্যাণকর হলো? এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া যায় এভাবে-
প্রথমতঃ এটা হযরত আয়েশা রা: এর জন্যে কল্যাণকরই হয়েছে। বাহ্যত এটা দুঃখজনক ঘটনা হলেও তিনি ধৈর্য্য ধরার কারণে সবর করার সওয়াব পেয়েছেন। তাঁর ওপর আরোপিত অপবাদকে উড়িয়ে দিয়ে আল্লাহ তায়ালা দশটি আয়াত নাযিল করে তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করেছেন। এতে করে হযরত আয়েশা রা: এর মর্যাদা পূর্বের চাইতে বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ পবিত্র কোরআনের দশটি আয়াতের মাধ্যমে তাঁর পবিত্রতা, নির্দোষিতা ও নিষ্কলুষতার সাক্ষ্য স্বয়ং মহান আল্লাহ তায়ালা দিয়েছেন এবং এই দশটি আয়াত কেয়ামত পর্যন্ত পঠিত হতে থাকবে। এর চেয়ে বড় গৌরব, বড় মঙ্গলজনক বিষয় আর কী হতে পারে? এই অপবাদ সংক্রান্ত দুর্ঘটনা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য হযরত আয়েশা রা: সেই দুঃসময়ে যে ধৈর্য্য, আল্লাহ ভীতি ও আল্লাহ ভরসার নমুনা দেখিয়েছেন, সেটাও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসাবে রয়ে গেছে। সকল পরীক্ষায় তিনি নারী জাতির মধ্যে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকার মতো করে উত্তীর্ণ হয়েছেন। এসব কারণে তিনি দুনিয়ায় যেমন মর্যাদাবান হয়ে থাকবেন, তেমনি আখিরাতেও উচ্চ মর্যাদা লাভ করবেন।
দ্বিতীয়তঃ হযরত আয়েশা রা: এর ওপর অপবাদ দেয়ার ঘটনায় দ্বিতীয় প্রকারের কল্যাণের দিক হলো, এই ঘটনা সকল মা-বোনদের জন্যে কল্যাণকর হয়েছে। এই দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়া মা-বোনদের জন্যে উত্তম হয়েছে এই কারণে যে, এই উপলক্ষে এ ধরনের রটনা ছড়ানোর অপরাধ মোকাবেলা করার জন্যে মজবুত আইন করে দেয়া সম্ভব হয়েছে। মুসলমানদের জন্য মিথ্যা রটনাকে সম্পূর্ণ হারাম ঘোষণা করা হয়েছে এবং অপবাদ দানকারীদের ওপর শাস্তি প্রদান করার বিধান জারি করা হয়েছে। কারণ চারিত্রিক অপবাদের কথা যখন কানাকানি জানাজানি হতে থাকে তখন আমাদের মা-বোনেরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তাঁদেরকে আল্লাহ তায়ালা পয়দা করেছেন মায়া-মমতার প্রতীক হিসাবে, তাঁদের বিনয়-নম্রতা, শারীরিক নাজুকতা, হৃদয়াবেগ, কমনীয়তা-নমনীয়তা ও লাজুকতা সবই ভবিষ্যতের বংশধরদের জন্যে। তাঁদের সেসব গুণাবলী দ্বারাই সংসার ও শান্তির পরিবার গড়ে উঠে। তুচ্ছ কারণে বা নিছক সন্দেহের বশবর্তী হয়ে আমরা যদি যত্রতত্র এলোমেলোভাবে সমালোচনার পথ গ্রহণ করি অথবা আড্ডার হাসি ঠাট্টা তামাশার বিষয়বস্তু বানিয়ে মুখোরোচক গল্প তৈরি করে ফেলি, তাহলে সর্বনাশের কোনো সীমা থাকবে না এবং সমাজ সংসার ধ্বংসের অতল তলে তলিয়ে যাবে। এ জন্যেই দুর্নাম ছড়ানোর অপরাধকে ইসলাম অত্যন্ত কঠিন ও ধ্বংসাত্মক গণ্য করে এর জন্যে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করেছে। কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করেছে এ কারণে যে, কেউ যেন এ ধরণের অপরাধকে সহজভাবে না নেয়। তা না হলে, এই অপবাদ দিতে গিয়ে কারো কোনো মান সম্মানের তোয়াক্কা করা হবে না, এ বদনাম দেয়া থেকে কেউ কাউকেই বাদ দেবে না। তখন মানুষে মানুষে ভালোবাসাবাসি, কল্যাণ কামিতা ও শ্রদ্ধাবোধ শেষ হয়ে যাবে। কোনো লজ্জা শরম ও মানুষের প্রতি মানুষের দরদ ব্যথা থাকবে না।
তৃতীয়তঃ অপবাদ দেয়ার ঘটনা সাধারণ মুসলমানদের জন্যেও মঙ্গলজনক হয়েছে। তখনকার মদিনার মুসলমান এবং ভবিষ্যতের সারা দুনিয়ার মুসলমান- এই উভয় প্রকার মুসলমানদের জন্যেই মঙ্গলজনক হয়েছে। যেমন- একদিকে নবী করিম সা: এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় যে ধৈর্য্যশীলতা, শালীনতা, সুবিচারে প্রতি দৃঢ়তা, সততা, সদাচার দেখালেন তা ভবিষ্যতের মুসলমানদের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকলো। যেসব লোক রাসূল সা: এর ইজ্জতের ওপর হামলা চালিয়েছিলো, রাসূল সা: এর একটি মাত্র ইঙ্গিতই তাদের জীবন নাশের জন্য যথেষ্ট ছিলো; কিন্তু দীর্ঘ একমাস যাবত তিনি অপরিসীম সহ্য ও ধৈর্য্য সহকারে সবকিছু বরদাশত করতে লাগলেন। তেমনিভাবে হযরত আবু বক্কর রা: ও তাঁর পরিবারবর্গ এবং সাধারণ ঈমানদার মুসলমানরা এই অপবাদ ঘটনার সময় যে কর্মনীতি গ্রহণ করেছিলো তাতেও প্রমাণিত হলো যে, তারা কতখানি শালীন, ধৈর্য্যশীলতার অধিকারী, সৎ ও রুচিবান ভদ্রলোক ছিলেন। যারা ঈমানদার মুসলমান ছিলেন তাদের কেউই দুর্নাম বদনামী কাজের প্রতি সামাণ্যতম আগ্রহ-উৎসাহ দেখালেন না। তারাও এ ঘটনায় ব্যথিত হয়েছেন, দুঃখিত হয়েছে। ব্যথা ও দুঃখ পেয়ে উগ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করে তারা ধৈর্য্য ধরেছেন। ফলে সেটা তাদের জন্য যেমন সওয়াব বয়ে এনেছে, তেমনি ভবিষ্যত প্রজন্মের মুসলমানদের জন্য তা উত্তম দৃষ্টান্ত হয়ে থেকেছে।

[পরবর্তী অংশ আগামীকাল]  


 

মন্তব্য