| প্রচ্ছদ

আমাদের মা জননী-১৭

মুসলমান মুসলমানের প্রতি ভালো ধারণা পোষণ করবে

জুবাইর হাসান মোহাম্মদ জুলফিকার আলী
পঠিত হয়েছে ৭১ বার

[গতকালের পর থেকে পড়তে হবে] 
হযরত আয়েশা রা: এর ওপর চারিত্রিক অপবাদ দেয়ার প্রতিবাদে আল্লাহ তায়ালা আল কোরআনের (সূরা আন নূর- এর ১১-২০ নং পর্যন্ত দশটি) আয়াত নাযিল করার মাধ্যমে মানুষকে যেসব শিক্ষা দীক্ষা দিয়েছেন আমরা সেসব নিয়ে আলোচনা করছি। এবারের প্রসঙ্গ- মুসলমান মুসলমানের প্রতি ভালো ধারনা পোষণ করবে।
বিশ্বাসী পুরুষ ও স্ত্রী লোকদেরকে তাঁদের নিজেদের লোকদের সম্পর্কে ভালো ধারনা পোষণ করতে হবে। মুসলমান সমাজের সকল পারস্পরিক বিষয়ের ভিত্তি হতে হবে সুধারনার ওপর। কুধারনা কেবল তখনই পোষণ করা যেতে পারে যখন সেটার পক্ষে কোনো প্রামাণিক ভিত্তি পাওয়া যাবে। হযরত আয়েশা রা: এর ওপর চারিত্রিক অপবাদ দেওয়ার ঘটনার (ইফ্ক এর ঘটনার) প্রতিবাদে মহান আল্লাহ তায়ালা বলছেনঃ
“যদি সেই (মিথ্যা ঘটনা)-টি শোনার পর মোমেন পুরুষ ও মোমেন নারীরা নিজেদের ব্যাপারে একটা ভালো ধারনা পোষণ করতো! (কত ভালো হতো) যদি তারা একথা বলতো, এটা হচ্ছে এক নির্জলা অপবাদ মাত্র! -সূরা আন নূরঃ ১২।”
অর্থাৎ তোমরা যখনই এই অপবাদের সংবাদ শুনলে, তখন মুসলমান পুরুষ ও নারী নিজেদের সম্পর্কে অর্থাৎ মুসলমান ভাই-বোনদের সম্পর্কে সুধারনা পোষণ করলো না কেন এবং একথা বললো না কেন যে, এটা প্রকাশ্য মিথ্যা? এখানে আল কোরআন ইংগিত করছে- যে মুসলমান অন্য মুসলমানের দুর্নাম রটায় ও তাকে লাঞ্ছিত করে, সে প্রকৃতপক্ষে নিজেকেই লাঞ্ছিত করে। কারণ ইসলামের সম্পর্ক সবাইকে এক করে দিয়েছে। তবে হ্যাঁ, শরীয়ত সম্মত প্রমাণ দ্বারা যদি দোষ প্রমাণিত হয় তবে তা ভিন্ন কথা। 
‘মুসলমান মুসলমানের প্রতি সুধারনা পোষণ করবে’-এই নীতির বাস্তব প্রমাণ মদিনার তখনকার মুসলমানরা দেখিয়েছিলেন। দুটো উদাহারণ এখানে প্রণিধানযোগ্য। প্রথমতঃ হযরত আয়েশা রা: কে অপবাদ দেয়ার ঘটনা (ইফ্ক এর ঘটনা) যখন মদিনার আকাশে বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছিল তখনকার একটি উদাহারণ এই যে- রাসূল সাঃ এর একজন সাহাবি হযরত আবু আইউব আনসারী রা: কে তাঁর স্ত্রী উম্মে আইউব রা: জিজ্ঞাসা করেন, “আয়েশা রা: সম্পর্কে যেসব কথা বলা হচ্ছে তা কি আপনি শুনেছেন ?” উত্তরে হযরত আইউব রা: বলেন, “হ্যা (শুনেছি)! (তবে) এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন (কথা)।” (এরপর হযরত আবু আইউব রা: তাঁর স্ত্রীকে পাল্টা প্রশ্ন করেন,) হে উম্মে আইউব! তুমিই বলতো, তুমি কি কখনও এরূপ কাজ করতে পারো?” উত্তরে তাঁর স্ত্রী বলেন, “নাউযুবিল্লাহ! এ কাজ আমি কখনো করতে পারি না। এটা আমার জন্যে অসম্ভব”। তখন হযরত আবু আইউব রা: বলেন, “চিন্তা করে দেখো, আয়েশা রা: তো তোমার চেয়ে বহুগুণে উত্তম ও মর্যাদা সম্পন্না, তাহলে তাঁর দ্বারা এ কাজ কিভাবে সম্ভব হতে পারে?” এরপর উম্মে আইউব হযরত আবু আইউব রা: কে ফিরতি একটা প্রশ্ন করে বলেন, “আপনি যদি সাফওয়ানের স্থানে হতেন, তাহলে আপনি কি রাসূল সা: এর ইজ্জতের ওপর হামলা করার কথা চিন্তা করতে পারতেন? উত্তরে হযরত আবু আইউব রা: বললেন, “কখনো নয়। সাফওয়ানের স্থানে যদি আমি হতাম তাহলে আমি এমন কথা চিন্তাও করতে পারতাম না, (আর তুলনামূলক বিচারে) সাফওয়ান তো আমার চেয়ে অনেক ভালো মুসলমান। (সুতরাং তাঁর দ্বারা এ ধরনের ঘটনা ঘটানো কল্পনাতেও আসতে পারে না।)”
উপরের এই ঘটনা থেকে মদিনার মুসলমানদের মানসিক পবিত্রতার উচ্চমান অনুমান করা যায়। মুসলমান মুসলমানের প্রতি সুধারনা পোষণ করার আরো একটি উদাহরণ দেয়া যায় এবং সেই উদাহরণ রাসূল সা: এর পরিবার থেকেই দেয়া যায়। তা হলো-
যখন হযরত আয়েশা রা: এর ওপর চারিত্রিক অপবাদ দেওয়ার ঘটনা নিয়ে মদিনায় কানাকানি ও চক্রান্ত চলছিলো, তখন কিন্তু রাসুল সা: এর অন্য বেগমদের মধ্যে কেউই সতীন আয়েশা রা: এর দুর্নাম করার কাজে বিন্দুমাত্র অংশ নিলেন না। এ বদনামী কাজের প্রতি তাঁদের কেউ সামাণ্যতমও আগ্রহ উৎসাহ দেখালেন না। এমন কথার স্বপক্ষে একটা প্রমাণ হলো- যখন রাসূল সা: হযরত আয়েশা রা: সম্পর্কে তাঁর অপর স্ত্রী হযরত যয়নব রা: কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তখন হযরত যয়নব রা: রাসূল সা: এর কাছে আয়েশা রা: সম্পর্কে ভালো মন্তব্যই করেছিলেন। এ সম্পর্কে হযরত আয়েশা রা: নিজেই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, “নবী সা: এর বেগমদের মধ্যে জয়নবের সাথেই ছিলো আমার সবচাইতে বেশি প্রতিযোগিতা। কিন্তু ইফ্ক -এর ঘটনা প্রসঙ্গে নবী করিম সা: যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, আয়েশা সম্পর্কে তুমি কী জানো? “তখন তিনি বললেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! আল্লাহর কসম, আমি তোর তাঁর মধ্যে ভালো ছাড়া আর কিছু আছে বলে জানি না।” [মুসনাদে আহমাদ ১/১৯৪, ফাতহুল বারী ৮/৩০৬, মুসলিম ৪/২১২৯, ইবনে হিশাম ৩/৩০৯; উদ্ধৃত: তাফসীরে ইবনে কাসীর, ১৫শ খন্ড, পৃষ্ঠা-১২৭।]
সুতরাং উপরের দুটো উদাহারণ থেকে বোঝা যায় যে, মদিনার মুসলমানরা তাদের বিবেকের ডাকে সাড়া দিয়ে আন্তরিকভাবে ইফ্ক এর ঘটনাটা বোঝার চেষ্টা করেছে। আয়েশা রা: এবং অপর একজন মুসলমান (হযরত সাফওয়ান রা:) সম্পর্কে যেসব অপপ্রচার চালানো হয়েছে, সেটা থেকে মদিনার মুসলমানরা নিজেদেরকে দূরে রেখেছে। সেই সাথে তাঁরা নিজেদেরকে দূরে রাখতে পেরেছে আল্লাহর না-ফরমানী করা থেকে এবং রাসূল সা: এর সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করা থেকে। মদিনার সেই সব মুসলমানরা লজ্জাকর পাপের চোরাবালির মধ্যে পতিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যাওয়া থেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়েছে। তাঁরা কখনোই শুধু সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কারো সম্পর্কে কোনো খারাপ মন্তব্য করেনি এবং কোনো আলোচনাতেই অংশ নেয়নি।
অতএব এসব উদাহরণ ঘটনাবলী আমাদেরকে স্মরণ করে দেয় যে, মদিনার একজন মুসলমান অপর একজন মুসলমানের প্রতি কত উচ্চমানের ধারণা পোষণ করতো, কত বড় মাপের শালীনতা ও সৌজন্যবোধ প্রদর্শন করতো। মুসলমান মুসলমানের প্রতি সুধারনা পোষণ করবে’ -এই বিষয়ের তাগিদ আরো একটি হাদীসের মাধ্যমে পেশ করা যায়। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমরা আল্লাহর বান্দাদের কষ্ট দিও না, তাদেরকে দোষারোপ করোনা এবং তাদের গোপনীয় দোষ অনুসন্ধান করো না। যে তার মুসলিম ভাইয়ের গোপনীয় দোষত্র“টি অনুসন্ধান করবে আল্লাহ তায়ালাও তার দোষত্র“টির পেছনে লাগবেন এবং তাকে লাঞ্ছিত করবেন, এমনকি সে নিজ গৃহে অবস্থান করলেও। [মুসনাদে আহম্মদ ৫/২৭৯; উদ্ধৃত: তাফসীরে ইবনে কাসীর, ১৫শ খন্ড, পৃষ্ঠা-১৩৫]

[পরবর্তী অংশ আগামীকাল]      
 

মন্তব্য